সমুদ্রের গর্জন শুনতে আমরা ছুটে যাই সমুদ্রে, নারীর কন্ঠের আর্তনাদের সুর শুনতে ছুটে যাই পতিতালয়ে। পতিতা শব্দটি ‘পতিত’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘পতনোম্মুখ’, ‘ভ্রষ্ট’ বা পাপী। এই শব্দটি একটি স্ত্রীলিঙ্গ রূপ যা সাধারনত একজন ভ্রষ্টা, কুলটা বা বেশ্যাকে বুঝায়।
পতিতাবৃত্তির ইতিহাস প্রাচীন কাল থেকে শুরু যা বিভিন্ন সভ্যতা ও যুগে বিদ্যমান ছিল। প্রাচীন নিকট প্রাচ্য, গ্রীস, রোম, ইসলামী বিশ্ব এবং পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এর অস্তিত্ব ছিল। বিভিন্ন সময়ে এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম পেশা বলা হলেও এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে। বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে পতিতাবৃত্তি এবং পতিতাদের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং তারা সমাজে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল।
বর্তমান আধুনিক যুগেও এই পেশাটি বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন পরিবেশে দেখা যায়, যার বৈধতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন নিয়েও বিতর্ক আছে। আমরা মানুষ জাতি সর্বদা বিতর্কের মধ্যে পড়তে বেশী পছন্দ করি, সমালোচনা করতে পছন্দ করি, আলোচনা করতে পছন্দ করি, ফেসবুকে ভাইরাল হতে পছন্দ করি। বর্তমানের আকাশ সংস্কৃতির উদারতার কারনে আমরা বিবেকহীন হয়ে পড়ি, নিজেকে বা নিজেদের জনসম্মুখে প্রকাশ করতে গিয়ে অশ্লীলতার চরান্ত মাত্রাকে অতিক্রম করে ফেলি।
নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষদের দুর্বলতা চিরাচরিত। বেশ্যা কোন ভিনজগতের প্রাণী নয়, এরা মানুষ, আমাদের মতো রক্তে গড়া মানুষদের মতোই একজন। এর পরও এরা বেশ্যা। বর্তমানে বেশ্যা বলাটা অন্যায়, তাদেরকে আপনি দেহব্যবসায়ী বলতে পারেন। এটি আমাদের মতো মুসলিম প্রধান দেশে নিষিদ্ধ হলেও, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে একজন প্রাপ্ত বয়স্কা মহিলা এই পেশাটি সাদরে গ্রহণ করতে পারেন। তার একটি আইডি কার্ডও থাকবে, পুলিশ কিংবা অন্যকেও তাকে ঐ ব্যবসা করতে নিষেধ করতে পারবে না, এইটি তাদের অধিকার। এটি বহু আদ্যিকাল থেকে ধারাবাহিক ভাবে চলমান একটি আদ্যিপেশা।
আমরা দিনের আলোতে ওদের যতনা ঘৃণা করি, রাতের অন্ধকারে ওদেরকে ততটাই পছন্দ করি। ঘরে বউ আছে সমস্যা কি! মাস্তি কম হবে কেন! গণীকাবৃিত্ত, দেহপ্রসারনী, প্রসট্টিউট, পতিতা, বেশ্যা, দেহকর্মী, দেহব্যবসায়ী, বাজারের মেয়ে, নিষিকুটুম যে নামেই ডাকি না কেন, তাতেও জানি আমাদের তৃপ্তি মেটে না, আরও নতুন নতুন নামে আমরা তাদের ডাকতে চাই…কাছে পেতে চাই। আমরা মানবাধিকার বুঝি কিন্তু তাদের প্রাণের আকুতি বুঝিনা। না বুঝার কারণ একটাই, তারা(বেশ্যা) আমাদের দ্বারাই সৃষ্ট ঘৃৃণিত জাতি।
রসময় গুপ্তের চটি পড়ছি, জানছি তাদের রসের গল্প। পত্রিকায় দেখেছি/দেখছি তাদেরও বাস্তব করুন কাহিনী। আমরা বর্তমানের ডিজিট্যাল সমাজে বিকৃত মস্তিষ্কের শয়তানিক পুতুলে রূপান্তর হয়েছি। আমাদের কোন ভিশন নেই! আমাদের কোন যাবার শেষ গন্তব্য নেই!
ধর্ম-কর্ম শিকেই তুলে রেখে আমরা ছুটছি দিন-রাত ব্রথেল-লজিক/ব্রথেলজিক এর পিছনে। এই বিশ্বের সমগ্র পরিমন্ডলে আদ্যিকাল থেকে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা ব্রথেলজিক অশ্লীলতা ও বিকৃত যৌবিক চাহিদা আমরা মনের অজান্তেই গ্রহণ করছি স্যোসিয়াল মিডিয়া দেখে। যৌনতা এখন আর একান্ত ব্যক্তিগত কিংবা গোপনীয় কিছু বিষয় নয়, এইটি হচ্ছে বর্তমানের আধুনিক নেট দুনিয়ার সস্তা জনপ্রিয়তার প্রধান উপকরণ।
আমি গত ২৬ বছর যাবত বাংলাদেশের টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাথে যক্ত, এখনও কাজ করে যাচ্ছি। আমি গত ২০০৬ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত টানা ১০ বছর বাংলাদেশের নিষিদ্ধপল্লীর মানুষদের নিয়ে কাজ করেছি। নিষিদ্ধপল্লীর মানুষদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাদের শিশুদের মানবাধিকারের বিষয়ে ডকুমেন্টরি ‘অবস্কিউর এক্সপোস” মেকিং করেছিলাম ২০০৬-৭ এর দিকে। এরপরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ নিষিদ্ধপল্লীর মানুষদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে নির্মাণ করেছিলাম ডকুড্রামা ‘আনড্রিম্প্ট অফ ড্রিম” ২০১০-১১ সালে, এরপরে তাদেরকে নিয়ে করেছি বহু তথ্যচিত্র। সেই সুবাদেই চলুল আমরা টাঙ্গাইল কান্দাপট্টি নিষিদ্ধপল্লী থেকে ঘুরে আসি…
“টাঙ্গাইল কান্দাপট্টি নিষিদ্ধপল্ল” টাঙ্গাইল মূল শহরের খুব নিকটেই অবস্থিত, রাউন্ড শেপ মূল পাকা রাস্তা ঘেষেই এর অবস্থান। পল্লীটি রাস্তা ঘেষা হওয়ায়, মেয়েরা রং-বেরঙ্গের গাড় মেকাপ নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যায় খদ্দের ধরার জন্য। রাস্তা দিয়ে পুরুষ মানুষ দেখলেই তারা হাত ইশারা করে কাছে ডাকে, কেউ চোখ মারে, কেউবা টিপনি কাটে, কেউবা শরীরের বিভিন্ন ভাঁজ দেখিয়ে খদ্দেরদের আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করে। আমি সেখানকার স্থানীয় একটি এনজিও থেকে আমাকে গাইড করার জন আমার সঙ্গে দেওয়া বন্ধুবর মামুন ভাইকে সাথে নিয়ে সেখানে যাই। আমরা রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি পল্লীর সামনের রাস্তায়। একটি মেয়ে মুচকি হেঁসে আমাকে তার ঘরে যাবার জন্য আমন্ত্রণ করল কিন্তু মামুন ভাইকে আমার পাশে দেখে কিছুটা দিধাগ্রস্থ হয়ে গেল, মেয়েটি ভাবছে! আর লজ্জা মুখে হাসছে! এমতবস্থায় আমি কিছুটা আগ্রহ দেখিয়ে মেয়েটিকে বললাম:
চল, আমি তোমার ঘরে যাব।
না না, যাব না, আমার এখন খদ্দের ধরতে হবে।
বল কি! আমি তো তোমার খদ্দের হয়েই যাব, পেমেন্ট করব।
না না, আপনে এনজিওর লোক।
না…না আমি এনজিওর লোক নয়, মামুন আমার বন্ধু, আমি তোমার সঙ্গে সময় কাটানোর জন্যই এসেছি
মেয়েটি কথা না বলে চুপ করে থাকে!
মামুন ভাই বলল: আরে যা, যা… ঢাকা থেকে আমার বন্ধু আসছে তোর সঙ্গে একটু মাস্তি করবে, যা।
মেয়েটি কি করবে ভেবে পাচ্ছে না, কিন্তু মামুন ভাই এর কথা শুনে মেয়েটি এবার কিছুটা আস্থা পেয়ে আমাকে নিয়ে তার ছোট্ট টিনশেডের ঘুপরি ঘরে নিয়ে গেল। যেতে যেতে চোখে পড়ল অজস্র প্রকৃতির নারী ও পুরুষ। পতিতাপল্লীতে শুধু নারীরা থাকবে, এখানে এত পুরুষ মানুষদের আনাগোনা কেন! ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ব্রথেলজিক আনন্দ মেলা বসেছে! মেলার দোকানে মিষ্টির পসরা বসিয়ে দাড়িয়ে আছে অসংখ্য বিভিন্ন বয়সী মেয়ে ও নারী। সারা বাংলাদেশের অগনতি খদ্দের এসেছে এখানে মিষ্টি খেতে। এখানে বসবাসকারী নারীদের জন্মস্থান কোথায়? এদের পিতা-মাতা কোথায়? এরা কেন এখানে বসবাস করছে? কে এদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে? কেন নারীরা এই পল্লী ছেড়ে বাহিরের সভ্য সমাজে ফিরে যাচ্ছে না? এমন অসংখ্য প্রশ্ন মাথায় নিয়ে মেয়েটির সাথে তার ঘরের ভিতরে ঢুকে আমার কেন জানি মনে হল! আমি অন্যকোন গ্রহের মধ্যে প্রবেশ করতে চলেছি, শুধুই নারী-পুরুষের মিলন-মেলা। মেয়েটির ঘরে প্রবেশ করলাম, ছোট্ট একটি ঘর। ঘরের একটি কোনে একটি পুরুনো কাঁঠের চৌকি বসানো রয়েছে, ঘরটির মধ্যে প্রচণ্ড নোংরা ও অগোছালো পরিবেশ বিরাজ করছে, বিছানোর চাঁদর পরিপাটি করে গোছানো দেখলেও মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেও এই বিছানায় বসে খদ্দেরা মিষ্টি খেয়ে গেছে। মিষ্টির রসের দাগ অস্পষ্ট মনে হলেও আমার মনের মধ্যে ঘীনঘীনে ভাবটা কাজ করছে। মানুষ শুধুই কামের জন্য এখানে আসে, কাজের জন্য আসে না তা ঘরের পরিবেশ দেখেই বুঝা যায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকব নাকি চৌকিতে গিয়ে বসব তা ভাবতে ভাবতেই আমি সরাসরি শুয়ে পড়লাম মেয়েটির বিছানায়। মেয়েটির বিছানার অপরিছন্ন বালিশ-বিছানার চাদর থেকে মৌ মৌ করে ভেসে আসছিল দম আটকানো কসমেটিকস এর গন্ধ। আমি দু-চোখ বন্ধ করে জোরে একটা নি:শ্বাস নিলাম, মামুন ভাই বলল:
ভাই গল্প করেন, আমি ঘুরে আসছি…(চলবে)

