সাখাওয়াত হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
নওগাঁ-৩ হল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৩০০টি নির্বাচনী এলাকার একটি। এটি নওগাঁ জেলায় অবস্থিত। জাতীয় সংসদের ৪৮ নং আসন। এই আসনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫,১৫,২০২ জন, মোট ভোটার ৪,২০,৯০৭জন (ডিসেম্বর ২০২৩), যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২,০৯,৬৯৪জন এবং নারী ভোটার ২,১১,২১৩ জন।
গত ৬ আগষ্ট – ২০২৪ সাল থেকে এই আসনটি শূন্য রয়েছে। ১৯৮৪ সালে রাজশাহী নির্বাচনী এলাকা থেকে এই নির্বাচনী এলাকাটি তৈরি করা হয়েছিল। এই নির্বাচনী এলাকাটি বদলগাছী এবং মহাদেবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। বদলগাছী উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২০২২ সালের তথ্য মতে প্রায় ২,০৬,৫৫ জন, এবং মহাদেবপুরের জনসংখ্যা ৩,০৮,৬৬৬ জন।
এই আসনে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ বাইতুল্লাহ, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত হন মো: সুজাউদ্দৌলাহ, ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে আখতার হামিদ সিদ্দিকী নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি পরের নির্বাচনগুলিতেও বিজয়ী হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন মো: আকরাম হোসেন চৌধুরী, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন মো: সেলিম উদ্দিন তরফদার যদিও তিনি তার প্রথম নির্বাচনে স্বতন্ত্র হয়ে বিজয়ী হযেছিলেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হন সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি পেয়েছিল ৮৫,৭৮৫ ভোট, আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৬৪,৯৬৬ ভোট এবং জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশ পেয়েছিল ১৫,৫৩৮ ভোট।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ১,০৫,২২৫ ভোট, আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৮০,৫৩৬ ভোট, জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ৭,৯৭৩ ভোট এবং জামাত-ই-ইসলামী বাংলাদেশ পেয়েছিল ৭,৯১৪ ভোট।
২০০১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি পেয়েছিল মোট ১,৩৫,২৫০ ভোট, আওয়ামী লীগ পেয়েছিল মোট ১,১০,৯২৭ ভোট।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১,৭৬,৫৬২ ভোট এবং বিএনপি পেয়েছিল ১,১৫,৭৪০ ভোট।
এই আসনে ১৯৮৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়েছিল ৫(পাঁচ) বার, বিএনপি নির্বাচিত হয়েছিল ৩(তিন) বার এবং জাতীয় পার্টি নির্বাচিত হয়েছিল ১(এক) বার।
তবে ১৯৮৬-২০০৮ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলেও ২০০৮ সালের পর এদেশের জাতীয় নির্বাচন থেকে বিএনপি দুরে ছিল অর্থাৎ নির্বাচনগুলো বর্জন করেছিল। সেই হিসাবে দেখলে, ১৯৮৬-২০০৮ পর্যন্ত যতগুলি সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছিল তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়েছিল ৩(তিন)বার, আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়েছিল ২(দুই) বার এবং জাতীয় পার্টি নির্বাচিত হয়েছিল ১(এক) বার।
দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার বঞ্চিত সাধারণ মানুষদের এখন আলোচনার প্রথম ও প্রধান বিষয় আগামী জাতীয় “নির্বাচন ও ভোট”। ৫ আগষ্টের পর আওয়ামী লীগ যেহেতু গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পলাতক রয়েছে সেহেতু আওয়ামী লীগ বিহীন আগামী নির্বাচন কেমন হবে সেইটিও মানুষের ভাবনার মধ্যে চেপে বসে আছে।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আগামী জাতীয় নির্বাচনে যে কেউ, যেন-তেন ভাবে ভোট করে বিজয়ী হবে তেমনটি হবার সম্ভাবনা খুবই কম। গত প্রায় ১৭ বছর ধরে যেসব ভোটার কোন ভাবেই নিজেদের ভোট ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দিয়ে আসতে পারেনি, তারা এবার ভোট দেবার জন্য মুখিয়ে আছেন। এবারের নির্বাচনে নতুন ও তরুন ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাবে, বিড়ি ও অর্থ দিয়ে ভোট কেনার রীতিতে অনেকটায় ভাঁটা পড়বে। আগামী নির্বাচনে প্রতিযোগীদের জিততে হলে প্রচুর গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে হবে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৪৮ নওগাঁ-৩ (বদলগাছী-মহাদেবপুর) আসনে প্রধান দলগুলো তাদের একক প্রার্থী দেওয়ার সকল কার্য সম্পন্ন করে ফেলেছেন, এ কারনেই স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। এই আসনে বিএনপি থেকে নমিনেশন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম-সম্পাদক, বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি জনাব ফজলে হুদা বাবুল। ফজলে হুদা বাবুল দীর্ঘদিন ধরে কৃষক দলের কেন্দ্রীয় ও এলাকার স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি গত ১৭ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েও দলের নেতাকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে, কর্মীদের দুঃসময়ে তাদের কাছে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর কর্মীবান্ধব চরিত্র, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, মিডিয়া বান্ধব, টিভি টকশোতে নিজ দল ও দেশের পক্ষে বাকবিতন্ডায় পটু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্র নেতা, শিক্ষিত, মার্জিত হবার কারনে তাঁকে দলের হাইকমান্ড ও স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের কাছে তিনি নিজেকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করে তুলেছেন।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেন, দীর্ঘদিন পর এ আসনে বিএনপির শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে দলের কর্মীদের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। কর্মীরা বিশ্বাস করেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনের ভিতর ঐক্য ও সংহতি বজায় থাকলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষের বিজয় অর্থাৎ ফজলে হুদা বাবুলের বিজয় সুনিশ্চিত হবে।
তবে প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক নেতা-কমীরাই বিশ্বাস করেন, এই আসনে যাঁরা মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন তাঁদেরকে সম্মান দেখিয়ে, তাদের অনুগত নেতাকর্মীদের মুল দলে একত্রিভুত করতে পারলে তবেই এই আসনে জনগনের ভোটে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হতে পারে অন্যথায় নয়।
দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বিএনপি প্রার্থী ছুটে যাচ্ছেন স্থানীয় কর্মী ও ভোটারদের বাড়ি-বাড়ি, তেমনি জামায়াতের প্রার্থীও ছুটে যাচ্ছেন ভোটারদের দোরগোড়ায়।
আগামী নির্বাচনে ৪৮ নওগাঁ-৩ (বদলগাছী-মহাদেবপুর) আসনের জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি জনাব মাওলানা মো: মাহফুজুর রহমান। (চলবে)

