বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ নওগাঁ জেলা। এই জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর মহাবিহার শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপাল দেব অষ্টম শতকের শেষে বা নবম শতকের শুরুতে এই বিশাল বিহারটি নির্মাণ করেন। ১৮৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এটি আবিষ্কার করেন এবং ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান (World Heritage Site) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
১. পাহাড়পুর: বৌদ্ধ বিশ্ব মানচিত্রে ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের স্থাপত্যশৈলী অনবদ্য। প্রায় ২৭ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই বিহারটি চতুষ্কোণ আকৃতির। এর কেন্দ্রস্থলে ক্রুশাকার প্রধান মন্দির এবং চারপাশে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য ১৭৭টি কক্ষ রয়েছে। এটিকে অনেকে প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবেও অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং কৌশল:
পাহাড়পুরকে কেন্দ্র করে বদলগাছীকে একটি প্রথম সারির আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডিং কৌশল:
বৌদ্ধ সার্কিট (Buddhist Circuit) তৈরি: চীন, জাপান, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার এবং ভিয়েতনামের মতো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা। তাদের ট্যুর অপারেটরদের কাছে পাহাড়পুরের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরে বিশেষ প্যাকেজ চালু করা।
আন্তর্জাতিক প্রচার:
ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর মাধ্যমে পাহাড়পুরের গুরুত্ব তুলে ধরে তথ্যচিত্র ও প্রকাশনা তৈরি করে বিশ্বব্যাপী প্রচার করা।
ধর্মীয় উৎসব আয়োজন: প্রতি বছর বৌদ্ধ পূর্ণিমা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তিথিতে পাহাড়পুরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।
সহায়ক অবকাঠামো:
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য উন্নত মানের আবাসন, রেস্টুরেন্ট, গাইড সার্ভিস (বিশেষ করে ম্যান্ডারিন, জাপানিজ ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ) এবং মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
২. আধা-শহুরে পর্যটন: সহযোগী পুরাকীর্তি ও স্থানীয় আকর্ষণ
শুধুমাত্র পাহাড়পুর নয়, বদলগাছী ও তার আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকেও মূল পর্যটন সার্কিটে যুক্ত করতে হবে:
ঐতিহাসিক ‘হলুদ বিহার’: বদলগাছি উপজেলার বিলাশবাড়ী ইউনিয়নে অবস্থিত এই বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষটি পাহাড়পুরের সমসাময়িক হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এটিকে সংস্কার ও সংরক্ষণ করে পাহাড়পুর-হলুদবিহারের একটি যৌথ প্রত্নতাত্ত্বিক ভ্রমণ পথ তৈরি করা যেতে পারে।
দিবর দিঘী ও কুসুম্বা মসজিদ: বদলগাছির পার্শ্ববর্তী স্থানে অবস্থিত দিবর দিঘী (১১ শতকের কৈবর্ত রাজা দিব্যকের স্মৃতিবাহী) এবং মান্দা উপজেলার কুসুম্বা মসজিদ (সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন, যা ৫ টাকার নোটে মুদ্রিত) এই পর্যটন সার্কিটের ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য যোগ করবে।
আমের নতুন রাজধানী সাপাহারের আম্রকাননের সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য যাওয়ার রাস্তা হতে পারে বদলগাছী।
চাপাই নবাবগঞ্জ থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত যাবার আঞ্চলিক হাইওয়ে রাস্তা বদলগাছীর উপর দিয়ে যাওয়ার কারনে আবার আমের নতুন রাজধানীতে যাবার জন্য বদলগাছী একটা হাব সেন্টার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এমন কি ধানের ক্ষেতের অপার সৌন্দর্য, নবান্ন উৎসব উপভোগ করার জন্য সারা বাংলাদেশের মানুষ বদলগাছীর উপর দিয়েই যেতে হবে। এই সুযোগ টা কাজে লাগিয়ে এলাকার উন্নয়ন করার সুযোগ আছে।
৩. আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে বদলগাছী
নওগাঁ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক বিশেষত্বকে কাজে লাগিয়ে বদলগাছীকে শুধু পর্যটন নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজনেস সেন্টার হিসেবেও গড়ে তোলার সুযোগ আছে।
ধানের রাজধানী ও আমের নতুন রাজধানী: কৃষি-পর্যটন (Agri-Tourism) ধানের রাজধানী নওগাঁ: নওগাঁ জেলা বাংলাদেশের ‘ধানের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। কৃষিপণ্য ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা প্রদর্শনের জন্য বদলগাছীতে বিশেষ ‘অ্যাগ্রি-ট্যুরিজম ভিলেজ’ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটকরা ধান চাষের পদ্ধতি, চাল উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় গ্রামীণ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে।
আমের রাজধানী সাপাহারকে যুক্তকরণ: নওগাঁর সাপাহার উপজেলা এখন আমের নতুন রাজধানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমের মৌসুমে (ম্যাংগো ট্যুরিজম) সাপাহারের বিশাল আমের হাট এবং আমবাগান পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বদলগাছীকে আমের এই বাণিজ্যিক রুটের একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে পর্যটকদের জন্য আরামদায়ক বিরতিস্থল ও আমের বাজারজাতকরণের সুযোগ থাকবে।
বিপণন কেন্দ্র (Business Hub):
বদলগাছী উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়কের সংযোগস্থলে অবস্থিত। একে কেন্দ্র করে পর্যটন পণ্য (স্মারক), আম ও চালের মানসম্মত প্যাকেটজাত পণ্য বিক্রির জন্য আধুনিক ‘বিজনেস আউটলেট’ বা ‘পর্যটন মল’ তৈরি করা যেতে পারে, যা ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি কেন্দ্রবিন্দু হবে।
এছাড়া এই বদলগাছীর সবজি সারাদেশের সনামধন্য পণ্য। সবজির সংরক্ষণাগার করতেও এটাকে ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত করা যায়।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের আশেপাশে প্রাইভেট পিকনিক স্পট গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় পর্যটকদের সহ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আনন্দ উপভোগ করিয়ে আকর্ষন করানো যেতে পারে। কারন পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারে সারাদিন কাটানোর মত কোন আয়োজন নেই।
৪. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
পর্যটন ও ব্যবসা প্রসারের জন্য নিম্নলিখিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি:
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি: বদলগাছী থেকে পাহাড়পুর ও অন্যান্য পুরাকীর্তিগুলির সড়ক যোগাযোগ আরও মসৃণ ও দ্রুত করতে হবে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য মানসম্মত পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা।
নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা: ইউনেস্কো সাইট এবং এর আশেপাশের এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানিক বিনিয়োগ: স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট এবং মানসম্মত হস্তশিল্পের দোকান স্থাপনে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
উপসংহার: নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার তার ঐতিহাসিক মর্যাদার কারণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে, সাপাহারের আম, কুসুম্বা মসজিদ, হলুদবিহার এবং ধানের প্রাচুর্যকে সমন্বিত পর্যটন ও কৃষি-বাণিজ্যের প্যাকেজ হিসেবে তুলে ধরতে পারলে বদলগাছী অদূর ভবিষ্যতে উত্তরবঙ্গের একটি অন্যতম উন্নত ব্যবসায়িক কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এটি শুধু নওগাঁ জেলার নয়, সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
ইঞ্জি: তাহির ইবনে মোহাম্মাদ (নয়ন): লেখক ও প্রকাশক: মাহ্ভীন পাবলিকেশন

