ফেসবুকে ঘুরেফিরে ইদানিং একটা বিষয় নতুন করে সামনে আসছে। যে প্রশ্নের উত্তর ব্যবহারিক অর্থেই আমাদের সামনে, যে সংশয় থেকে মুক্তি পাওয়া অন্তত কয়েক দশক আগেই উচিত ছিল, সেটাই এখন চরম সংকট হয়ে নারীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘরের বাইরে নারীর ভূমিকা বা সমাজে কর্মজীবী নারীর অবদান এবং অবস্থান একটি মিমাংসিত বিষয় হলেও, এখন নতুন করে একটা শ্রেণি একটাই প্রশ্ন বারবার সামনে আনছে, নারী জন্য কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, ঘর সামলানো নাকি দাপ্তরিক কাজে মনোনিবেশ করা। আমার খুব সহজ এক কথার উত্তর: নারীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা কারণ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একজন নারী যেভাবে নির্ভার এবং নিঃসংকোচ হয়ে নিজের এবং পরিবারের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে, আর্থিকভাবে দূর্বল নারী সেটা পারে না বলে আমি মনে করি।
অনেকেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন: নারী ঘর গোছাবে নাকি দেশ গড়বে? আমার ধারণা এধরনের প্রশ্ন তখনই আমাদের মাথায় আসবে যখন পারিবারিক বা সামাজিকভাবে আমরা নারী এবং পুরুষের ভূমিকার জায়গাটা আলাদা করে ফেলব। এই প্রশ্নের পেছনে অবচেতনে একটাই উত্তর কাজ করে, সেটা হলো: নারী ঘর গোছাতে গেলে দেশ গড়ার কাজে তার কোন অবদান থাকবে না বা যে নারী দেশ গড়ার কাজে নেমে যাবেন তার ঘর থাকবে অগোছালো। অথচ, আমরাই বলি ঘর শান্তি তো বাইরের জগত সুন্দর। অর্থাৎ একজন নারী যদি দক্ষ হাতে নিজের সংসার সামলাতে পারেন, তবে সে সংসারের অন্যান্য সদস্যরা নিশ্চিন্তে বাইরের কাজে মনোযোগ দিতে পারে।

এসব প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে একদিকে যেমন ঘর-গৃহস্থি সামলানোর মতো ক্লান্তিকর এবং সময়সাপেক্ষ কাজকে অবমূল্যায়ন করা হয় অন্যদিকে নারীর সক্ষমতাকেও খাট করে দেখা হয়। আর সবচেয়ে বড় বিষয় যেটি উঠে আসে, তা হলো নারীর প্রতি বঞ্চনা। যে কাজগুলো নারীরা নিয়মিত ঘরে করছেন, তার স্বীকৃতি, মূল্যায়ন ও আর্থিক মূল্য কিছুই তারা পাচ্ছেন না। এই আধুনিক যুগে এসেও সন্তান লালন, পরিবারের প্রবীণ সদস্যের দেখভাল, ঘরের সমস্ত কাজ—সবই নারীর কাজ হিসেবেই বিবেচনা করা হয় এবং নারী গৃহিণী হোন বা কর্মজীবী এসব কাজের বোঝা সবটাই তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে। বিশ্বের ৬০৬ মিলিয়ন কর্মক্ষম নারী জানিয়েছেন, গৃহস্থালির কাজের চাপে ঘরের বাইরে তারা কোনো চাকরি করতে পারেন না। নারীর অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে গৃহস্থালির বেতনহীন কাজকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, নারী ঘর গোছাতে গিয়ে বাইরে কাজ করতে পারছেন না। আপাতদৃষ্টিতে এখান থেকে এই সমীকরণে আসা সহজ যে, নারী ঘর গোছাতে গেলে দেশ গড়তে সময় দিতে পারবেন না। কিন্তু, বিষয়টা অন্যভাবে দেখলে দেশ গড়তে নারীর অবদান কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ সেটা পরিস্কার হয়ে উঠে আসে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নারীর গৃহস্থালির কাজের হিসাবকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং তা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ, নারীর ঘরের কাজের মূল্য নির্ধারণ করলে জাতীয় উৎপাদনে নারীর অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে। সিপিডির একটি পরিসংখ্যানের দেখা গেছে, জাতীয় আয় হিসাবে (জিডিপি) অন্তর্ভুক্ত হয় না এমন কাজ, যা নারীরা করছেন তার আনুমানিক বার্ষিক মূল্য (২০১৩-১৪ অর্থবছর) জিডিপির প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশের সমপরিমাণ। ফলে দেখা যাচ্ছে, পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা কাজের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগের অবদান নারীর আর পুরুষের অবদান ৫ ভাগ। ২০১৪ সালে পরিচালিত ‘জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের অবদান নিরূপণ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ গবেষণার ফলাফল বলছে, নারী প্রতিদিন গড়ে ১২টির বেশি মজুরিবিহীন কাজ করেন, পুরুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজের সংখ্যা মাত্র ২ দশমিক ৭টি। নারীর এই মজুরিবিহীন কাজ গুলোকে মজুরির আওতায় আনলেই, দেশ গড়তে একজন গৃহে কাজ করা নারীর অর্থনৈতিক অবদানের বিষয়টা ভালোভাবে ফুটে উঠে।
এতো গেল দেশের অর্থনীতিতে গৃহে কাজ করা নারীদের অবদানের কথা। আর যেসব নারী দাপ্তরিক কাজ করে সংসার সামলাচ্ছেন, রাষ্ট্র গঠনে তাদের অবদান এবং সংগ্রাম দুটোকেই বড় করে দেখতে হবে। যে রাধে সে চুলও বাঁধে। যে নারী বাইরে কাজ করে সংসারের আর্থিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন, তিনিই কিন্তু আবার ঘরের মজুরিবিহীন কাজগুলোও করছেন। ফলে, দেশের অর্থনীতিতে তিনি একজন কর্মক্ষম পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ ভূমিকা রাখছেন। এটা কোন মনগড়া বা নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টিকারী বক্তব্য নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘টাইম ইউজড সার্ভে’ অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি বয়সী কর্মজীবীদের মধ্যে ঘরের বিভিন্ন কাজে পুরুষ দৈনিক ১ দশমিক ৪ ঘণ্টা এবং নারী ব্যয় করেন ৩ দশমিক ৬ ঘণ্টা। আবার, কর্মজীবী না হলে গড়ে নারীরা দিনে ৬ দশমিক ২ ঘণ্টা এবং পুরুষ ১ দশমিক ২ ঘণ্টা সংসারের কাজে ব্যয় করেন। ফলে ঘরের কাজের মূল্য নির্ধারণ করলে দেশের অর্থনীতিতে নারীর অবদানের বিষয়টা সুস্পষ্টভাবে উঠে আসে।
ফলে, নারী ঘর গোছাবে নাকি দেশ গড়বে সেই প্রশ্নটা যুক্তিতর্কের নিরিখে খুব স্থুল হয়ে উঠে। পরিসংখ্যানের তথ্য প্রমাণ করে দিচ্ছে গৃহস্থালির কাজ করা নারী যেমন পরিপাটি পরিবার গড়ার মাধ্যমে দেশ গড়তে অবদান রাখছেন, তেমন কর্মজীবী নারী নিজের কাঁধে দ্বিগুণ কাজের বোঝা তুলে নিয়ে সমান দক্ষতায় সবকিছু সামলাচ্ছেন।
আমাদের মতো সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রতিনিয়ত নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন, অপমানিত হচ্ছেন, বৈষম্য এবং অবমূল্যায়নের শিকার হচ্ছেন, সেখানেও কিন্তু তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘরে এবং বাইরে অবমাননা এবং প্রতিবন্ধকতার সাথে লড়াই করেই এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। আর এই লড়াই জারি রাখতে নারীকে কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে নিজের সক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ দায়িত্বের বোঝা। এই বোঝা নিয়েই নারী সামলাচ্ছেন ঘর, দপ্তর, সমাজ এবং রাষ্ট্র। নারীরা ঘরও গোছাচ্ছেন, বাইরেও সামলাচ্ছেন। এটা অনস্বীকার্য যে একজন নারী সফলভাবে এই কাজ তখনই করতে পারবেন যখন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।
‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এটাই চিরন্তন সত্য, সৃষ্টির আদিকাল থেকেই নারী তার কাজ করে চলেছেন এবং এই আধুনিক বিশ্ব গড়ে তুলতে পুরুষ সঙ্গীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে চলেছেন।
মারিয়া সালাম: লেখক ও সাংবাদিক
