সেন্টার ফর দ্যা রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্যা প্যারালাইজড, সংক্ষেপে-সিআরপি। এটি একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান। মহাত্মা ভ্যালেরি আন টেইলর এর প্রতিষ্ঠাতা। সিআরপি’র বর্তমান হেডকোয়ার্টার ঢাকার কাছে সাভারের চাপাইনে অবস্থিত। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক টেইলর ১৯৭৯ সালের ১১ ডিসেম্বর সিআরপি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দু’টি পরিত্যক্ত রুমে মাত্র চারজন রোগী নিয়ে সংস্থাটি যাত্রা শুরু করে। তারপর দীর্ঘ ১১ বছর বিভিন্ন স্থানে সরকারী-বেসরকারী সাহায্যের মাধ্যমে দুর্গতদের সেবাদানের পর ১৯৯০ সালে এটি সাভারে স্থানান্তরিত হয়। এখন সিআরপি একটি হাসপাতাল এবং পক্ষাঘাতগ্রস্তদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এখানে সকল স্তরের (ধনী-গরীব) রোগীদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা হয়।
সিআরপি তাদের আউটরিচ কম্যুনিকেশন জোরদার করার জন্য মাঝেমধ্যে বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। তাদের প্রথম সিনেমা ছিল ‘বিহঙ্গ (The Birds)’ নির্মাণ করেছিলেন প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন।
‘বিহঙ্গ (The Birds)’ সিনেমাটি ‘মনি’ নামের একজন গ্রাম্য মেয়ের গল্প বলে। সে এক দুর্ঘটনার পর মেরুদণ্ডের আঘাতের কারণে টেট্রাপ্লেজিক (ঘাড়ের নীচে পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হয়ে পড়ে। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর পুনর্বাসন করা হয়। সে মুখে পেন্সিল বা রঙতুলি নিয়ে ছবি আঁকতে চেষ্টা করে এবং একসময় তাতে দারুণভাবে সফলও হয়। তার নানাবিধ সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে আমদের সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কারগুলিও এই সিনেমায় চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মনি নিজ চেষ্টায় সবকিছু জয় করে। তার সৃজনশীলতা স্বীকৃতি পায়। ‘বিহঙ্গ’ সিনেমাটি আমাদেরকে এই মেসেজ দেয় যে সমাজের সবাই যদি প্রতিবন্ধী মানুষগুলিকে একটুখানি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবে তারাও অনেক কিছু অর্জন করতে পারে। এই চলচ্চিত্রের গল্পটি লিখেছেন ব্রিটিশ লেখক, প্রযোজক, পরিচালক ও মানবাধিকার কর্মী এলসপেথ ওয়েলডি। তিনি মানুষের বিভিন্ন ধরনের স্নায়বিক রোগ সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে চিত্রনাট্য লিখেন এবং সেগুলি প্রযোজনাও করেন। এ্যানিওয়ে, ‘বিহঙ্গ’ চলচিত্রের ‘মনি’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন রুমানা রশিদ ইশিতা। তিনি ছাড়াও এ চলচ্চিত্রে আরও আছেন শহীদুজ্জামান সেলিম, শমী কায়সার, জাহিদ হাসান, ফজলুর রহমান বাবু, ফেরদৌসি মজুমদার, শহিদুল আলম সাচ্চুসহ আরও অনেকে।

বিহঙ্গ (The Birds)’ এর পর সেন্টার ফর দ্যা রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্যা প্যারালাইজড (সিআরপি) টেলিভিশনের জন্য ‘রেডিও ভাই’ প্রযোজনা করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার সিআরপি’র অর্থায়নে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ‘মানুষটিকে দেখ (See the Person)’ যেটি পরিচালনা করছেন আরেক নন্দিত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা গাজী রাকায়েত। ‘সি দ্যা পার্সন’ এর চিত্রনাট্যও লিখেছেন এলসপেথ ওয়েলডি। সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ‘সেরিব্রাল পালসি’ নিয়ে এই গল্পটি লিখেছেন। এতে দেখা যায় ফরিদা আহমেদ নামের প্রধান চরিত্রটি সেরিব্রাল পালসি-তে আক্রান্ত। সে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে মেধাবী হলেও শারীরিকভাবে অক্ষম, হুইলচেয়ারে চলা-ফেরা করে। মানুষ তাকে কটু কথা শোনায়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তবুও সে দমে যায় না। সে সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত সব মানুষের মানবিক অধিকারটুকু অর্জনের জন্য লড়াই করে। এ কাজে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে ফিরোজ মালমুদ। সে কাজ করে পথশিশুদের নিয়ে। একসাথে পথ চলতে চলতে ফিরোজ ও ফরিদার মধ্যে একটি প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। তাদের সেই সম্পর্কে বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় ফিরোজের বড়লোক বাবা মিস্টার মালমুদ। তারপর গল্প মোড় নেয় অন্য দিকে।
সিআরপি’র মূল লক্ষ্য হলো পক্ষাঘাতগ্রস্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং প্রতিবন্ধীদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। তারা নিয়মিতভাবে রোগীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিষেবা প্রদান করে। সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর ও মূলধারায় প্রতিবন্ধীদের একীভূত করাও সিআরপির একটি লক্ষ্য। সন্দেহাতীতভাবেই ‘মানুষটিকে দেখ’ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে সিপি আক্রান্ত মানুষদের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের এক অনবদ্য দলিল হয়ে থাকবে। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন: রাশনা শারমিন কেমি, তাহমিদ আরেফিন হক, তারিক আনাম খান, মিলি বাশার, মামুনুর রশীদ, রহমত আলী, গাজী রাকায়েত, শতাব্দী ওয়াদুদ, লারা লোটাস, এহসানুর রহমান, ইকবাল, কাজী নওশাবা, রাজীব সালেহীন, শর্মীমালা, হুমায়ূন ফরিদ, মৃণাল দত্ত, আনন্দ খালেদ, তাহমিনা মোনা, আদনান বাঙালী, মিজানুর রহমান, নমিতা দাস, মীর বরকত, অনিক খান, হোসনে আরা, রিয়াদ, আরিফ, মোহন ও আরও অনেকে। ‘মানুষটিকে দেখ (See the Person)’ সিনেমায় অন্যদের সাথে মহাত্মা ভ্যালেরি আন টেইলর নিজেও অভিনয় করেছেন! সবকিছু ঠিক থাকলে আসছে ডিসেম্বরেই সিনেমাটি দেশের প্রধান প্রধান প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে।
সিনেমায় জীবনের, বিশেষ করে অচ্ছুৎ জীবনের গল্প বলার যে চেষ্টাটা সিআরপি করে যাচ্ছে তা সত্যিই অসাধারণ। তাদের সমাজ ও মানুষকে বদলে দেয়ার আন্তরিক চেষ্টা অব্যহত থাকুক। প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বপ্নগুলি সেলুলয়েডে ধরা পড়ুক!
নির্মাতা, অনুবাদক ও চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষক
