ভয়াবহ ভূমিকম্প কিংবা প্রচন্ড বেগের বৃষ্টি বাদলে, মেঘের গর্জনে আমাদের মনের ভিতর তুফান সৃষ্টি করে,তখন আমাদের সুপ্ত হৃদয়ে শুরু হয় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ, মন এদিক – সেদিক চায়, পরক্ষণেই ছুটে যাই নিরাপদ আশ্রয়ে। ক্ষনিকের বিশ্রাম, এর পরেই ছুটে চলা নতুনভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রামে।
কাল মেঘ যেমন আকাশ ঢেকে রাখে, তেমনি কিছু স্মৃতি, ঘটনা, নিয়ম – কানুন আমাদের মনকে ভাবিয়ে তোলে। কঠিন, বেদনাবিধুর জীবন বয়ে বেড়ান পতিতাবৃত্তের আবধ্যে বন্দী থাকা মানুষজন। এদের জীবনে থাকে কষ্ট ও সংগ্রাম, থাকে বুকের উপর চেপে বসা সামাজিক বঞ্চনা, অবহেলা এবং নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে অনি:শ্চিতা। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পতিতাবৃত্তি একটি বলপ্রয়োগমূলক অপরাধ, একটি অপ্রয়োগমূলক অপরাধ, একটি অপরাধকৃত কার্যকলাপ।
২০১১ সালের ফাউন্ডেশন স্কেলের একটি প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪২ মিলিয়ন পতিতা রয়েছে, যারা সারা বিশ্বে বসবাস করে। অনুমান অনুসারে বিশ্বব্যাপী পতিতাবৃত্ত থেকে উৎপন্ন বার্ষিক রাজস্ব ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশী।
বেশ্যারা দেয় ভোগেই শান্তি, মরিলেই দেয় সত্তসব অশান্তি! জীবিতকালে তাদের রূপের বন্দনায় ছুটে যাই গণীকালয়ে, নোংরা শরীরে লুটিয়ে পড়ি নির্লজ্জ্বতায়, ক্ষতবিক্ষত করি নর্দমার কাঁদাযুক্ত রাস্তাকে।
পতিতা সৃষ্টি একটি জটিল এবং বিতর্কিত বিষয়। এর কোন উৎস নেই। এর সৃষ্টি নিয়ে মানুষের মাঝে আদ্যিতম ধারনা থাকলেও তার কোন সঠিক ভিত্তি বাখ্যা নেই। উপরওয়ালা মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য, আমরা সৃষ্টি করেছি পতিতা আমাদের বিকৃত যৌবিক চাহিতা মেটানোর জন্য! পৃথিবীর যৌনপেশা সৃষ্টির একক কোন উৎস নেই, এইটি একান্তই ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারনের সংমিশ্রনে সৃষ্ট, মানুষের বিকৃত চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্র হিসেবে।
স্বামী-স্ত্রীর বৈধ শারীরিক সম্পর্ককে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় গণীকাবৃত্তে রূপান্তর করি। অর্থ উপার্জনের ফন্দি খুজি, পতিতাবৃত্তির ইতিহাসকে পূনরাবৃত্তি করতে ফ্রী সেক্স কালচারের ফন্দিফিকির করি।
কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা “পতিতা” আমরা অনেকেই পড়েছি।
“আগার তাহার বিভীষিকাভরা, জীবন মরনময়!
সমাজের বুকে অভিশাপ সে যে – সে যে ব্যাধি, সে যে ক্ষয়”
নি:স্পাপ হয়ে জন্মগ্রহন করেও নারী হয়েছে পাপী! ইতিহাসের পুরুনো পাপের বোঝা বহন করে যাচ্ছে পৃথিবীর অগনীত নারী, যারা সুন্দর স্বপ্ন দেখার সাহস করে না, আমাদের কাল কাপড়ে আবৃত পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালের কারনে। প্রাচীন পতিতাবৃত্তি রাজতন্ত্রের কালাকানুনে আটকে পড়া নারীদের নিয়ে উপন্যাস, কবিতা, গল্প রচিত হয় কিন্তুু তাদের জীবনময় অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার ইতিহাস রচনা হয় না।
কবির ভাষায়:
“সে যে মন্বন্তর, মৃত্যুর দূত, অপঘাত, মহামারী-
মানুষ তবু সে, তার চেয়ে বড় – সে যে নারী, সে যে নারী!”
প্রিয় পাঠক, কবিতার রেশ কাটার পূর্বেই গত পর্বের সেই মেয়েটির ঘরে ফিরে যাই…
সেদিন আমরা ঘরে দু’জন,
মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে,
আমি মেয়েটিকে বললাম- দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি আমার পাশে এসে শুয়ে পড়বে?
মেয়েটির অবাক হবার কথা নয়, কিন্তুু অবাক! এমনটি হবার কথা নয়! তার মাথার মধ্যে মনে হয় চিন্তার পোকা কামড় দিচ্ছে!
আমি বললাম: তুমি কাপড় খুলতে পারো, আবার না…ও খুলতে পার।
মেয়েটি এবার অনেকটা ঠোঁট বাকিয়ে বলল: ঐ মিয়া, সত্যি করে কন ত, আপনে কি সত্যি সত্যিই বইতে আইছেন?
এবার আমার অবাক হবার পালা! বল কি? বসতে আসব কেন?
মেয়েটি: তাহলে কাপড় খুলতে কন ক্যা?
আচ্ছা, কাপড় খুলতে না চাইলে দরকার নেই, তবুও বস।
হা হা হা…মেয়েটি হেসে উঠল, ঐ মিয়া? কাপড় না খুললে বসব ক্যামনে?
এবার আমি অনেকটাই অবাক হয়ে বলাম: তোমাদের এখানে বসতে হলে কাপড় খুলে বসতে হয় নাকি?
হা হা হা…ধুর মিয়া, মসকরা করেন? অন্য কেহ হলে তো, এরই মধ্যে এক হিট মেরে দিত… হা হা হা
আমি তো তোমার কথা বুঝতেছিনা, হিট-মিট কি কও?
আরে মিয়া, হিট বোঝেন না? চো…আইছেন?
আমি একটু হেসে বললাম, বুঝিনা বলেইত এসেছি, বুঝিয়ে বল!
মেয়েটির উত্তর: হিট হচ্ছে মিলনের স্থায়ীত্বকাল, প্রতি হিট আমি নেই একশ টাকা, প্রতি হিট দশ মিনিটের বেশি বাড়তে দেইনা, টেকনিক আছে।
আর বসার ব্যপারটা?
আরে মিয়া, “বসা” মানে মিলিত হওয়া। আপনে কি বইবেন? মানে মিলিত হবেন?
ও…আচ্ছা! বুঝলাম!
এরই মধ্যে মামুন ভাই ঘরের দরজায় চলে আসল, মেহেদী ভাই চলেন নার্গিস আপার সঙ্গে পরিচয় করে দেই আপনাকে। আমি পকেট থেকে পাঁচশত টাকা বের করে মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে যেতে থাকলাম ঘর থেকে,
মেয়েটি বলল: বন্ধু আবার এসো, তোমার কাছে টাকা চাইনা তুমি এমনিতেই এসো
আমি মামুন ভাইকে নিয়ে নার্গিস আপার ঘরে গেলাম। নার্গিস আপা এই পতিতাপল্লীর নেত্রী কিংবা বলতে পারেন সর্দারনী। তবে নেত্রী ও সর্দারনী শব্দের ব্যবহার পতিতাপল্লীভেদে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে মোট পতিতাপল্লীর সংখ্যা ছিল ১৩টি, বর্তমানে কয়েকটি উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কান্দাপট্টি দেশের ২য় বৃহত্তম পতিতাপল্লী। এখানের মোট পতিতার সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার, বর্তমানের হিসাব অজানা। দেশের সর্ববৃহৎ পতিতাপল্লী হচ্ছে রাজবাড়ি জেলার দৌলতদিয়া ঘাট পতিতাপল্লী, এখানকার পতিতার সংখ্যা ছিল প্রায় তিন হাজার, সেই পল্লী নিয়ে বিষদভাবে লিখব পরে।
পতিতাপল্লীতে থাকেন অজস্র বাড়িওয়ালী, তাদেরকেই সাধারণত সর্দারনী বলা হয়ে থাকে। তাদের নিয়ন্ত্রণে অনেকগুলো ঘর থাকে। সেই ঘরগুলোতে যতগুলো মেয়ে থাকে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে বাড়ীওয়ালী। কালের বিবর্তনের কারণে বাড়ীওয়ালা কর্তৃক পতিতারা নির্যাতিত হবার কারণে প্রতিটা পতিতাপল্লীতে নির্বাচনের মাধ্যমে নেত্রী নির্বাচন করা হয়ে থাকে। নার্গিস আপা কান্দাপট্টির নির্বাচিত নেত্রী। চা খেতে খেতে নার্গিস আপার সঙ্গে কথা বলছি, উনি প্রোগ্রামের বিষয়ে আমার কাছ থেকে বিষদভাবে জেনে নিচ্ছেন। ওনার আবদার, ওনাদেরকে নিয়ে যেন আমরা পজেটিভ কোন কাজ করি। আমি ওনাকে আস্বস্ত করলাম, আমার দ্বারা ওনার বা ওনাদের কোন ক্ষতি হবে না। উনিও আমাকে পল্লীর ভেতরে কাজ করার অনুমতি দিলেন।এরপর উনি আমাদেরকে ওনার ছোট বোন শিউলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেলেন।
আমরা শিউলির ঘরে গিয়ে বসলাম। শিউলির ঘরটা অনেকটা পরিপাটি, সুন্দর বিছানা, বিছানার পাশেই ড্রেসিংটেবিল, আমি বিছানায় গিয়ে বসলাম,
সে বসল, বলল: কি খাবেন?
বাসায় গিয়ে খাব, আপাতত তোমাকে একটু দেখি!
আমাকে দেখার কিছু নেই, আমি ত বেশ্যা।
কেন! বেশ্যা বলে কি দেখতে নাই?
না…তা…না, সবাই তো বইতেই আসে।
তুমি কি নিজেকে খুব ঘৃণা করো?
না…ঘৃণা করি আমার কাজকে, আর ঘৃণা করি যে আমাকে এই পেশাতে নিয়ে এসেছে।
তোমাকে কে নিয়ে এসেছে?
না…আমি বলতে পারব না।
আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার বাবা/মা?
ওনারা নেই।
তোমাদের বাড়ী কোথায়?
ঐ মিয়া, এত প্রশ্ন চো…ক্যাঁ?
আমি ত মাত্র দুটা প্রশ্ন করলাম।
লাউ….কথা কন, আমি পড়ালেখা জানি না?
পড়া-লেখা জানো নাকি!!
জানি মানে! আমি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি।
তারপর?
তারপর থেকে এখানে চো…দিচ্ছি!
তুমি কি সব সময়ই এভাবে খারাপ কথা বলো?
চুত….মত কথা কইয়েন না, আমি কি আপনার লগে একটাও খারাপ কথা কইছি?
না…তো, এমনিই বললাম, তুমি এত সুন্দর কেন?
আমি আবার সুন্দর হলাম কিভাবে!!
কি যে বল, আমার তো তোমার সঙ্গে প্রেম করতে ইচ্ছে করছে।
প্রেম চো…, মাগীপাড়া আইছেন ক্যাঁ?
কেন, এখানে কেউ প্রেম করে না?
আরে মিয়া, কাপড় খোলার টাইম পাইনা আবার প্রেম চো….।
না না, তুমি মনে হচ্ছে! আমার কাছে কিছু লুকাচ্ছো, তোমার প্রেমিক আছে?
হ…আছে।
কে?
তুমি।
আমি!!!!!!
হ।
মসকরা করো?
তোমারে অনেক চ….ইচ্ছে করতাছে।
হা হা হা…কথার মাঝে এসব কি? তোমার ঠোঁট সুন্দর।
ঐ মিয়া, ঠোঁট ছাড়া অন্য কিছু দ্যাহেন না?
দেখি ত…দুডা হাত, দুডা পা.. (চলবে)

