পরের দিন, ঘড়ির কাঁটা অবিনশ্বর বিশ্বেশ্বরকে জানিয়ে দিল সকাল ছ’টা’র গোপন কথা
আর রাসেলকে সাবিত্রী’র কথা। ওহো সেই আংটি! ফুৎকারে উড়ে গেল তার নিশিঘ্রাণ।
বিছানা থেকে তড়াক করে উঠল সে। তড়িঘড়ি ছুটে গেল রেসকোর্স ময়দানে। নিবিড়
অনুসন্ধান শেষে ফিরে এল রুমে।
দশটার আগেভাগে হঠাৎ পিটিস পিটিস বৃষ্টি। প্রস্তুতিপর্ব সেরে অপেক্ষার দোলনায়
চেপে বসল। কিছুক্ষণ বাদে আকবরি পোলাও খাওয়া মানুষের মতো আকাশ স্বস্তির ঢেঁকুর
তুললে হল থেকে বেরিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল সে
এবং আবারো অপেক্ষার দোলনায় চেপে বসল তার প্যান্টের পকেটে দু’হাত জমা রেখে।
সাবিত্রী তখনো এসে পৌঁছেনি।
দালানের কর্নারে একটা নিমগাছ ছিল এবং সেই গাছে ছিল বিচিত্র পাখিদের
আনাগোনা। তাদের মধ্যে ঢাপ্পুস সাইজের একটা রহস্যময় পুরুষ পাখি, প্রায় প্রতিদিন,
ঠিক এই সময়ে বলিষ্ঠ স্বরে ডাকত। যে-সমস্ত ছাত্র এই পাখির ডাক শুনে অভ্যস্ত তারা
এই ডাক উপভোগ করত নতুন মাত্রায়। কিন্তু, সেদিন সেই রহস্যময় পাখি, দুর্ভাগ্যবশত,
সেখানে ছিল না। ভেসে আসছিল না চিরচেনা সেই ডাকটি। কর্ণকুহরে ছিল না প্রতিধ্বনির
যন্ত্রণা। ফলে, বিক্ষিপ্ত এবং প্রসারিত অস্থিতিশীলতা তার মধ্যে প্রবেশের চেষ্টা করছিল
বিরামহীন।
একটু পরে, সাবিত্রী সেখানে এল। তার কাঁধে ছিল উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের ভ্যানিটি
ব্যাগ। একটু হলেও বিষন্ন ছিল সে। তার চোখের নিচে কালো দাগ। চুল ছিল অবিন্যস্ত।
একটা বিধ্বস্তভাব তার মধ্যে, যেন ঝড় অতিক্রম করে আসা কোনো পলাতক মেয়ে।
তাকে দেখামাত্র এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো স্বস্তির ছোঁয়া লাগল রাসেলের মনে। নিমিষেই
কেটে গেল তার অস্থিতিশীলতা। কিন্তু সাবিত্রীকে অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তার মন্তব্য,
“তোমাকে দেখেই অসুখী মেয়ে মনে হচ্ছে।”
“এ পৃথিবীতে একমাত্র তারাই সুখী যারা অশিক্ষিত আর বর্বর,” ঝাঁঝিয়ে উঠল
সাবিত্রী, “সংবেদনশীল মানুষদের কাছে সুখ সোনার হরিণ। কারণ, দুঃখটা তাদেরকে
ভালো বোঝে।”
“তাই! হতে পারে।” রাসেল তার অস্বস্তি কাটিয়ে আবার বলল, “তোমাকে দুঃখ
দেওয়ার জন্য কথাটা বলিনি, সরি!”
“তোমার কথায় দুঃখ পাইনি, পেয়েছি মা’র কথায়,” বলল সাবিত্রী বিষাদের সহিত,
“আত্মীয়স্বজনের সামনে মা আমাকে বকেছে। আমার মাসি থাকেন কলকাতায়। মেসো ও
তার ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন তিনি।”
“যদি তুমি উদাসীন না হতে, এটা হারাতে না,” রাসেল তিরস্কারের সুরে বলল।
“আসলে আমি যখন—ভয়ে দৌড়াচ্ছিলাম—গাছের নিচ থেকে,” সাবিত্রী বিড়বিড়
করছিল। পরক্ষণে গলা চড়িয়ে বলল, “দুর্ঘটনাও ঘটতে পারত। নিশ্চয় খুশি হতে।”
“খুশি হওয়ার কারণ কী?”
“কারণ একটাই দায়িত্ব এড়াতে পারতে।”
“দায়িত্ব এড়ানোর মতো মানুষ আমি নই।”
“প্রমাণ?”
রাসেল তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে সোনার দুল বের করে আনল এবং সাবিত্রী’র চোখের
সামনে তুলে ধরে মজা করে বলল, “এটাই তার প্রমাণ?”
“কোথায় পেয়েছ?” সাবিত্রী উত্তেজিত।
“যেখানে ফেলে এসেছ।” রাসেল সত্যটা প্রকাশ করল বিনয়ের সঙ্গে ও সততার
সঙ্গে। “খুব সকালে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। যা খুঁজছিলাম তা হঠাৎ পেয়ে যাই।
বলতে দ্বিধা নেই কোনো জিনিস দরদ দিয়ে খুঁজলে হয়ত তা পাওয়া যায়।”
“তুমি কি দরদ দিয়ে খুঁজেছ?” সাবিত্রী’র চোখে-মুখে এক ধরনের দুষ্টামি।
“শুধু দরদ না, ভালোবাসা দিয়েও খুঁজেছি,” হাসল রাসেল। তার গালে একটা
লাজুক ধরনের ভঙ্গিমা তৈরি হলো। সেই ভঙ্গিমার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বলল
সে, “ভালোবাসার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, জানো তো!”
সাবিত্রী’র মধ্যে এমন বিভ্রম তৈরি হলো তার দুলের কথা প্রায় ভুলেই গিয়ে জিজ্ঞেস
করল সে, “কী রকম?”
“বেশ বলছি!” গলা ঝেড়ে গাঢ় স্বরে বলল রাসেল, “ভালোবাসার ক্ষমতা এরকম
অন্ধকেও পথ চিনিয়ে দেয়, কাছে টেনে আনে দূরের অমরাবতী, আর বৈদর্ভ নগর থেকে
চোখে চোখ রেখে কথা বলার নীলকান্তমণি। ভালোবাসা জীবনকে দেয় নিরাপত্তা, তৈরি
করে সামাজিক বন্ধন।”
এবার আর কথার খই না ফুটিয়ে সাবিত্রীকে দুল হস্তান্তর করল সে।
সাবিত্রী এটা ধ্যানস্থ দৃষ্টিতে দেখল; তারপর তীক্ষস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, “পেয়েছি! এটাই
তো সেই!” রাসেলকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিতে সামান্য কসুর করল না। এতক্ষণ হতাশার
যে-লটকান তার মনবৃক্ষে লটকাচ্ছিল তা আশার পৃষ্ঠে পতিত হলে তার মুখাবয়ব
অবিশ্বাস্যরকম উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাসিমুখে বলল, “লেটস মুভ!”
তারা চলে এল, আস্তে আস্তে, মধু’র ক্যান্টিনের সামনে—যেখানে তোফায়েল
আহমেদ, আবেগোদ্দীপ্ত চরিত্রের মানুষ এবং উদ্দাম, জুনিয়র ছাত্রনেতা ও পাতিনেতাদের
দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে ছিলেন, পূর্ব থেকে।
তোফায়েল আহমেদ, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সেক্রেটারি, কথা
বলছিলেন সতর্কভাবে, “বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের পর আমাদের পিছিয়ে যাওয়ার সময় নেই।
যে-কোনো সমস্যা মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। পাকিস্তান সরকার
তাকে বন্দি করতে পারে। কিন্তু আমরা থামব না, সামনে এগিয়ে যাব। ভয় ও আতঙ্কের
দেয়ালের পেছনে আমাদের স্বাধীনতা অপেক্ষা করছে। এটা ঠিক মানসিক ভাষা; আমরা
সেই দেয়াল অবশ্যই টপকাব এবং কোনো একদিন আমরা সেই গন্তব্যে পৌঁছুব!”
তারপর তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার দুটো লাইন উদাস চিত্তে আবৃত্তি
করলেন—
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর।
কী উদ্দেশ্যে, সাবিত্রী হঠাৎ আবদারের সুরে বলল, “লিডার, আমরা ঠিক এক্ষুনি আমাদের
মহান নেতার বাড়িতে যেতে চাই। আপনার সহযোগিতা কাম্য।”
তোফায়েল আহমেদ প্রথম রাজি হলেন না। “উফ! এটা খুব কঠিন কাজ।” একটু
বিরতি দিয়ে, শেষ পর্যন্ত, তাদের সঙ্গে পিতৃসুলভ আচরণ করলেন তিনি। “আচ্ছা,
আমাকে ভাবতে দাও!”
দুপুরের বাতাস ঠিক স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আত্মগর্বী সূর্য হয়ত বেখেয়াল হয়ে সিঁড়ি
ভেঙে কিছুটা নিচে নেমে এসেছিল, ফলে তার তাপ ছিল অন্যদিনের চাইতে প্রখর।
যে-সমস্ত পাখিরা স্বর্গসুখ খুঁজছিল তারা বার্চবৃক্ষের শাখায় বসে তাদের ডানা ঝাপটাচ্ছিল।
রোদে পথচারী ও ফেরিঅলাদের বলিষ্ঠ বলিরেখায় ঘাম জেঁকে বসার ইঙ্গিত ছিল।
সে-সমস্ত জীবন্ত চিত্রপট যেন অভিজ্ঞ দলপতির দেহাবয়ব ধারণ করে লিডারকে ইন্ধন
জোগাচ্ছিল—এগিয়ে যাও!
তাদের মধ্যে এক পাতিনেতা যে-কিনা বিজনেস ম্যাগনেটের পুত্র, জলপাই রঙের
একটা জিপ গাড়িতে যাতায়াত করত, সেই গাড়িতে সবাই চাপাচাপি করে বসল। গাড়ি
এঁকেবেঁকে ছুটল। প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে বত্রিশে পৌঁছে গেল তারা। দক্ষিণমুখি বাড়িটি ছিল আড়াই-তলাবিশিষ্ট। গাছ ও লতাপাতার ছায়াঘেরা সাধারণ বাড়ির
মতো। সৌন্দর্যের কোনো বালাই ছিল না। সাদা চুনাপাথরের দেয়াল ঘেরা বাড়িটি ছিল
অলৌকিক ক্ষমতার প্রতীক। দরজার সামনে কয়েকজন সশস্ত্র পাহারাদার দাঁড়িয়েছিল
বটে, তবে তারা ঢিলেঢালাভাবে পাহারা দিচ্ছিল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল যৎপরোনাস্তি দুর্বল। সীমানা প্রাচীর ততটা পুরু ও উঁচু ছিল না,
যতটা থাকার কথা ছিল। কোনো পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল না। এমন কি, শত্রুকে চেনার
জন্য সেখানে কোনো স্লুথ হাউন্ড ছিল না।
তারা বাড়িতে প্রবেশ করল দক্ষিণ দরজা দিয়ে। তোফায়েল আহমেদ তাদের
গেস্টরুম পর্যন্ত নিয়ে গেলেন; তারপর অপেরা দলের কর্মাধ্যক্ষের মতো বললেন, “তোমরা
সবাই এখানে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করো। নাটক এখন মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে। আমাদের
সেরা পারফর্মার, খুব সম্ভবত, উপরতলায়। আমি তাকে ডাকছি।”
তিনি ঘরের বাইরে গেলেন।
ঘরে পুরনো ধাঁচের কাঠের সোফাসেট এবং গদি বিছানো একটা স্নাগ উইন্ডসর ছাড়া
তেমন কোনো আসবাবপত্র ছিল না। তারা কেউ সেখানে বসার চেষ্টা করল না; অপেক্ষার
ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকল এবং “হৈচৈ” এর গলা টিপে সবাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায়
রাখল।
প্রথম তলায় ডাইনিং রুম-কাম-হাইপোথেটিক্যালি সাধারণ ড্রয়িং রুম। ঘরের কোণে
কাঠের কালো স্ট্যান্ডের উপর সিটিজেন ব্র্যান্ডের পুরনো টেলিভিশন এবং তার উপর ‘Aunt Sally’, সুবিন্যস্তভাবে। স্ট্যান্ডের পাশে মাঝারি আকারের tabouret;তার উপর
কিছু ইংরেজি পত্রিকা রাখা ছিল। ঘরের মধ্যে বিরাজ করছিল শান্ত পরিবেশ; কারণ,
বঙ্গবন্ধু ছাড়া সেখানে কেউ ছিল না। সে-সময় বেগম মুজিব ছিলেন কিচেনে। তিনি
রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন। কালো ফ্রেমের বাইফোকাল চশমা পরে অলস ভঙ্গিতে তিনি পত্রিকা
পড়ছিলেন এবং কালো পাইপে তার প্রিয় erinemoreতামাক খাচ্ছিলেন। তোফায়েলকে
দেখে, একটু চমকে উঠলেন তিনি, “এই! তুমি! কী ব্যাপার?”
বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ তুই বা তুমি করে সম্বোধন করতেন। কারণ, পূর্ব পাকিস্তানের সব
মানুষকে বড্ড আপন মনে করতেন।
রহস্য উন্মোচিত না করে, বিনয়ের সঙ্গে তোফায়েল আহমেদ বললেন, “লিডার,
নিচে নামুন, প্লিজ!”
বঙ্গবন্ধু ঘরে থাকলে আপাদ-মস্তক সাধারণ মানুষ এবং সাধারণ পোশাকে থাকতেই
স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বাঙালিদের প্রিয় পোশাক লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরে থাকতেন। সেদিনও
তাই ছিলেন। পোশাক পরিবর্তন না করে, প্রিয় পাইপ টানতে টানতে, একান্ত বিশ্বস্ত
তোফায়েলকে অনুসরণ করলেন। তারা বাইরের সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামলেন এবং সিঁড়ি
সংলগ্ন গেস্টরুমে প্রবেশ করলেন। পাঁচ/ছয় জনের একটা দল খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে
ফিজিক্যালি দেখার পর তাদের উত্তেজনার পারদ দ্রুত ওঠানামা করছিল। কারো জ্ঞান
হারাবার উপক্রম। কয়েক সেকেন্ড পর তারা স্বাভাবিক হলেও তাদের স্নায়বিক দুর্বলাবস্থা
কাটছিল না কিছুতেই।
বঙ্গবন্ধু তাদের পালস বুঝে তাদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। “ডোন্ট ওরি!
বসো তোমরা!” দুঃখ প্রকাশ করে, আবার বললেন তিনি, “অবশ্য তোমাদের সকলের
বসার মতো এরেঞ্জমেন্ট নেই। যাই হোক, আমিও তোমাদের মতো ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র
ছিলাম। তোমরা জানো?”
১৯৪৮ সালে, শেখ মুজিব ঢাকা ভার্সিটির ল ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছিলেন। ২৬ মার্চ,
১৯৪৯ সাল, তৎকালীন ঢাকা ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা তাঁদের
দাবি-দাওয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে যে ধর্মঘট ডাকে, তাতে সমর্থন দেওয়ার অপরাধে তাকে
এবং আরো চারজন ছাত্রকে বহিষ্কার করেন। যদিও, পরে, উট কর্তৃপক্ষ সামান্য অর্থদণ্ড
ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে ভালো ব্যবহারের মুচলেকা নিয়ে বহিষ্কৃত ছাত্রদের
ক্ষমার সুযোগ করে দেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত, শেখ মুজিব পড়াশুনা আর চালিয়ে যাননি।
তোফায়েল আহমেদ প্রথম রাসেল আহমেদকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তার দিকে
অঙ্গুলি নির্দেশ করে, “এই হলো রাসেল, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র।”
“জাস্ট রাসেল? না বার্ট্রান্ড রাসেল? কোনটা?” বঙ্গবন্ধুর রহস্যময় হাসি।
“সাহস করে বলতে পারি ওর সার্টিফিকেট নাম রাসেল আহমেদ,” তোফায়েল
আহমেদ হাসলেন এবং রাসেলের দিকে মজার দৃষ্টিতে তাকালেন।
“জ্বি, অবশ্যই।” রাসেল তার মাথা দোলাল, যৌবনের ক্ষিপ্রতা নিয়ে।
“কী বিস্ময়! তোমার নাম আর আমার ছোট ছেলের নাম প্রায় একই—শেখ রাসেল
ও রাসেল আহমেদ।” বঙ্গবন্ধু মৃদু হাসির ঝড় তুললেন। সেই হাসির গহীনে লুকিয়ে
ছিল পিতৃসুলভ অহঙ্কার। “কাজেই তুমি আমার ছেলের মতো আর আমি তোমার বাবার
মতো। তুমি যদি আমাকে তোমার বাবার মতো মান্য করো। বলতে চাই, তোমার
জন্য আমার একটা সদুপদেশ আছে।” তিনি সর্বদা তার লক্ষ্যে যেমন অবিচল থাকতেন
তেমনি রাজনীতি সম্পর্কে খুঁতখুঁতে। হৃদয়গ্রাহী রূপে পুনরায়, “জীবনে, তুমি কখনো
আদর্শচ্যুত হবে না। আদর্শচ্যুত হওয়া মানে এক ধরনের মৃত্যু। আর তা হবে কঙ্কালের
সঙ্গে বসবাস।”
তার আন্তরিকতা ও মাধুর্যমণ্ডিত আচরণ রাসেলকে মুগ্ধ করল।
“কিন্তু এটা আরো ইন্টারেস্টিং সে আপনার পাঁড় ফ্যান,” বললেন শ্রদ্ধেয় তোফায়েল।
“কী ধরনের পাঁড় ফ্যান?” ভ্রু কোঁচকালেন তিনি।
“সে তার বাহুতে আপনার উপাধি ‘বঙ্গবন্ধু’ ট্যাটু করে রেখেছে,” শ্রদ্ধেয় তোফায়েল
আহমেদ তাঁর মুখ উজ্জ্বল করে বললেন এবং তৎক্ষণাৎ রাসেলকে তা দেখানোর নির্দেশ
দিলেন তিনি।
প্রত্যেকেই রাসেলের দিকে রুদ্ধশ্বাসে তাকাচ্ছিল। এমনকি, বঙ্গবন্ধুও! প্রত্যেকে
ভয়ঙ্কর উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল যেন এইমাত্র কোনো অলৌকিক জাদুর খেলা আরম্ভ হতে
যাচ্ছে। রাসেল ইতস্ততভাবে তার সুতি শার্ট খুলে বঙ্গবন্ধুকে তার ট্যাটু দেখাল। তার
পাগলামি কিছুক্ষণের জন্য বঙ্গবন্ধুকে স্তম্ভিত করল এবং হঠাৎ সারা ঘরে কয়েক সেকেন্ডের
জন্য নেমে এল মোহন নিস্তব্ধতা।
বঙ্গবন্ধু তার কপালে চুমু দিয়ে আদরের চিহ্ন এঁকে দিলেন। তারপর জিজ্ঞাসা
করলেন, “এই ট্যাটু কে এঁকে দিয়েছে? আমাদের দেশে এ ধরনের শিল্পী আছে?”
“না, লন্ডনে গিয়ে আঁকিয়ে এনেছি। আমাদের আত্মীয়স্বজন থাকেন সেখানে।
বেড়াতে গিয়েছিলাম,” রাসেল উত্তর দিল।
“লন্ডন মানেই এক চিলতে সিলেট,” বঙ্গবন্ধু হাসলেন।
“কোন হলে থাকো?”
“ইকবাল হল।”
“বাহ! আরো একটা বিস্ময়! স্টুডেন্ট লাইফে আমি সেখানে থাকতাম।” আবারো
হাসলেন। তার হাসি মানেই নাটোরের কাঁচাগোল্লার মতো মিষ্টি। যিনি বা যারা একবার
শুনেছেন, কখনই ভুলতে পারেন না।
কথা বলার ফাঁকে পাইপটা নিভে গিয়েছিল, পুনরায় আগুন ধরালেন তিনি এবং খুব
আগ্রহ নিয়ে সাবিত্রী’র দিকে তাকালেন, “এবার তুমি বলো।”
সাবিত্রী এবার নীরবতার খোলস ভেঙে বেরিয়ে এল। হাসিখুশিকে আশ্রয় করে তার
পরিচয় প্রকাশ করল সে। “আমার নাম সাবিত্রী চ্যাটার্জী। আমার সাবজেক্ট ইংলিশ।
লালবাগ ভাস্কো-দা-গামা রোডে থাকি। বাবার নাম নিত্যানন্দ চ্যাটার্জী। আমরা দুই
বোন। অ্যাভাব অল, বঙ্গবন্ধু—যার মন আকাশের সমান; তিনি আমার আদর্শ এবং সত্যি
বলতে অনেক কিছু।”
বঙ্গবন্ধু এবার লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, “জানতাম না তোমরা আমাকে এত
ভালোবাসো।” সাবিত্রীকে লক্ষ করে আবার বললেন, “তোমার মধ্যে আগুন দেখছি।
আমি নারী জাগরণকে শ্রদ্ধা করি। বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক
তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। এ শুধু বিদ্রোহী কবির কথা নয়, এটা আমার
এবং আমাদের সকলের কথা। এক্কেবারে ধানী মরিচের মতো খাঁটি কথা। প্রীতিলতা
ওয়াদ্দেদার ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সংগ্রাম
করেছেন, বেগম রোকেয়া মুসলিম নারী জাগরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, আর
ইলা মিত্র তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আর তোমাকে কী ভূমিকায় দেখব?”
“ভবিষ্যত বড় নির্মম। কাকে ফুলের মালা পরাবে কাকে জুতার মালা বলা মুশকিল!
তবে লক্ষ্য আছে ব্যতিক্রম কিছু একটা করার। আশীর্বাদ করবেন লিডার,” সাবিত্রী বলল
বিনয় সহকারে।
বঙ্গবন্ধু গম্ভীর হলেন। জনগণের জন্য কিছু করার প্রবল বাসনা তাঁর মন আচ্ছন্ন
করল। তার নিজের swept-backচুলে হাত বুলিয়ে, বললেন তিনি, “তোমরা সবাই
আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসা দিয়েছ, তোমরাই আমাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বানিয়েছ। এখন আমার
পালা তোমাদেরকে একটা স্বপ্নের দেশ উপহার দেওয়া—যেখানে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য
থাকবে না, সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ যুক্তিহীনভাবে থাকবে না। নতুন সামাজিক ব্যবস্থা
চালু হবে—“গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা” হবে মূল মন্ত্র। শিশুরা শান্তিতে ঘুমাবে, বৃদ্ধরা
বিনা খরচে চিকিৎসা পাবেন এবং তরুণরা চাকরির সুযোগ পাবে। গুণ্ডামি ও ষণ্ডামি এই
সমাজ থেকে বিতাড়িত হবে। এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা সব সময় নিপীড়িতদের
পক্ষে থাকব।”
এবার তিনি তোফায়েল আহমেদের দিকে তাকালেন।
তোফায়েল আহমেদ এক এক করে অবশিষ্ট ছাত্রদের পরিচয় করিয়ে দিলেন, এবং
তারপর বিনীত কণ্ঠে বললেন, “লিডার, আমরা এখন বিদায়ের জন্য অনুমতি প্রার্থনা
করছি।”
বঙ্গবন্ধু দেয়ালে টাঙানো কারুকার্যময় ঘড়িটির দিকে তাকালেন। মোঘল আমলের
নকশা ত্রিভূজ ঘড়ি। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যখন লন্ডনে ক্লারিজ
হোটেলে অবস্থান করছিলেন তখন এক বৃটিশ সাংবাদিক তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসে
তাঁকে ঘড়িটি উপহার দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু যেমন ঘড়িটা সযত্নে রেখে দিয়েছেন তেমনি
সযত্নে বললেন, “তোমরা না খেয়ে যেতে পারো না। তাছাড়া, এই সমস্ত ছেলেমেয়ে
প্রথমবারের মতো আমার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। তোমার ভাবীকে খবর পাঠাও
তোমাদের খাবার দিতে।”
অপেক্ষা না করে, তিনি এবার নিজেই বেগম মুজিবকে খবর পাঠালেন। তারপর
তাদেরকে নিয়ে গেলেন তাঁর কম্পাউন্ডের উত্তর-পূর্ব কোণে, খোলা জায়গায়। সেখানে
তিন স্তর বিশিষ্ট কবুতরের খাঁচা ছিল। তার পেছনে ছিল খোসপাঁচড়ায় অভিগ্রস্ত ডাব
গাছ—যেন উপমহাদেশীয় ইতিহাস শিরে ধারণ করে ঠায় দাঁড়িয়েছিল। কী মনে করে
তিনি গাছের উপরের দিকে তাকালেন, পরক্ষণে দৃষ্টি নিজের কাছে ফেরালেন। অতঃপর
বলিষ্ঠ আঙুলে ঠোকা দিলেন খাঁচায়। কৌতুক করে কবুতরের নাম ধরে ডাকলেন। একটা
লাল দাগবিশিষ্ট কবুতর খাঁচা থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল, যেন মালিকের কণ্ঠস্বর তার
অতি পরিচিত।
বঙ্গবন্ধু হাসতে হাসতে বললেন, “এর নাম রেখেছি শের-ই-বাংলা। তোমরা কি
তাঁর সম্পর্কে কিছু জানো?” তিনি গভীর জ্ঞানের দৃষ্টিতে শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালেন।
যদিও তারা শেরে-ই-বাংলা সম্পর্কে কম-বেশি জানত, তবে তারা চুপ করে থাকতে
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিল।
হঠাৎ করেই কে যেন তাঁর মস্তিষ্কে ঠোকা দিয়ে জ্ঞানের দরজা খুলে দিল। বাতাসের
মতো হু হু করে বেরুলো ইতিহাসের মূল্যবান সব কথা—“মি. হক প্রথম ঢাকা থেকে
বঙ্গীয় আইন পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯১৩ সালে। তিনি বঙ্গীয় আইন সভার
নির্বাচিত সদস্য ছিলেন—যেখানে তিনি ৬ বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং হাউস নেতা
ছিলেন।”
কিছুক্ষণ পর তিনি একই কাজ করলেন। যেন দক্ষ জাদুকরের মোহনীয় ডাকে
এবার সবুজ দাগবিশিষ্ট কবুতর খাঁচা থেকে বেরিয়ে এল। বললেন, “এর নাম রেখেছি
সোহরাওয়ার্দী। তিনি মেয়র চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে স্বরাজ পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।
মুসলিম লীগের বেঙ্গল অধ্যায়ের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হয়েছিলেন।”
তোফায়েল আহমেদ এবং শিক্ষার্থীরা তার কথা নিষ্ঠার সাথে শুনছিলেন। এ জাতীয়
আলোচনা কেবল শুনতে হয়, বলতে হয় না, ঠিক এ-রকম অনুভূতি নিয়ে।
তৃতীয়বার তিনি খাঁচায় ঠোকা দিলেন এবং সুর করে ডাকলেন। একটি কালো
দাগবিশিষ্ট কবুতর বেরিয়ে এল। বললেন, “এর নাম রেখেছি গান্ধী। ব্রিটিশ শাসন থেকে
ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের আগে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে নোয়াখালি জেলায় দাঙ্গা
হয়েছিল। সেই দাঙ্গার পরে গান্ধী নোয়াখালিতে এসেছিলেন এবং ক্ষতিগ্রস্থ হিন্দুদের
জন্য সেখানে একটি ত্রাণশিবির স্থাপন করেছিলেন। এখন এটি ‘গান্ধী আশ্রম’ হিসাবে
পরিচিত।”
তিনি এর থেকে অনেক বড় বক্তৃতা দিয়েছিলেন, কখনো তৃষ্ণার্ত বোধ করেননি,
তবে এই দিনে। তোফায়েল এবং উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তার তীক্ষ্মস্মৃতিশক্তি মালুম করে
অত্যাশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। চতুর্থবার খাঁচায় ঠোকা দেয়ার আগে ঢোক গিললেন। হলুদ
রঙের একটা কবুতর বেরিয়ে এল। হাসতে হাসতে বললেন এবার, “এর নাম ভাসানী।
তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যা পরবর্তীকালে আওয়ামী
লীগে পরিণত হয়েছে।”
তারপর তিনি তোফায়েল আহমেদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন, “তোফায়েল,
তোমার প্রতিক্রিয়া কী?”
তোফায়েল আহমেদ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন এবং পরে বললেন, ‘লিডার, আপনার
সম্পর্কে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই যত সুন্দরভাবে ইতিহাস তুলে ধরলেন। এমনকি,
এই বয়সে এসে! এটি কল্পনাও করা যায় না। ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য—এই
ছয়টি ভগ যার আছে তিনি হলেন ভগবান। আমার কাছে মনে হয় আপনি ভগবান না
হলেও একটি জীবন্ত ‘মানব উইকিপিডিয়া’। আপনি যাই মনে করেন না কেন বলতে দ্বিধা
নেই আলোচিত চারজনের চেয়ে আপনিই জিনিয়াস।”
বঙ্গবন্ধু যেন লজ্জা পেয়ে জিভ কাটলেন এবং একজন মহান নেতার মতো বললেন,
“শোনো, যদি এই মানুষগুলো এই পৃথিবীতে জন্ম না নিতেন, ধরো মানুষ হিসেবে আমার
জন্ম হয়েছে, কিন্তু রাজনীতিক হিসেবে এতদূর আসতে পারতাম না। তাদের গুরুত্বপূর্ণ
জীবন ধারা, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আমাকে রাজনীতিবিদ বানিয়েছে।
এই ব্যক্তিগুলোর জন্য, আমি এখানে আছি, তোমাদের সামনে। আমি বলতে পারি আমার
মাতৃভাষা এবং নিপীড়িত বাঙালির পক্ষে দাঁড়াতে পারি। কিছু মানুষ এই পৃথিবীতে আসেন
যারা তাদের নিজেদের জন্য কাজ করেন, তবে তাদের দুর্দান্ত কাজগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে
আমাদের সকলকে সংযুক্ত করে। তারা সেই ধরনের মানুষ, উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো।
বললে হয়ত বেশিই শোনাবে, তবুও বলতে চাই, মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তল আছে, কিন্তু
এদের হৃদয়ের কোনো তল নেই। কেউ তাদের ক্ষুদ্র ফ্রেমে বাঁধতে পারে না।”
খাদ্যের অভাবে বঙ্গবন্ধু’র পেটের গ্যাস্ট্রো এন্টারইটিস বেড়ে গিয়েছিল। তিনি
এটি অনুভব করলেন এবং তাদের টেনে নিয়ে গেলেন খাবার টেবিলে। আঁটোসাঁটো
ডাইনিংরুম; কোনোরকমে তারা খেতে বসল। খাবার মুখে দিয়ে, বঙ্গবন্ধু প্রত্যয়ের সুরে
বললেন, “বিপদ আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধূলিস্যাৎ করতে এগিয়ে আসছে! প্রস্তুত
হও!”
“যুদ্ধ কি আসন্ন?” রাসেল জিজ্ঞাসা করল, নির্ভয়ে।
“আমি তাই মনে করি!” তিনি সমুদ্রপ্রবাহী কণ্ঠে উত্তর দিলেন। “কিন্তু তোমরা
অলস, দুর্বল, কপট এবং ছিঁচকাঁদুনে হবে না। বাস্তববাদী হও! সমস্ত বাধা অতিক্রম করে
সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কেউ আমাদের স্বাধীনতা এনে দেবে না। আমাদের যাত্রা শুরু
হয়েছে ঐতিহাসিক আবেগ দিয়ে; এখন সেই যাত্রা শেষ করার জন্য আমাদের বাস্তববাদী
না হয়ে বিকল্প নেই। মনে রাখবে, শত্রুর বিরুদ্ধে তোমাদের স্পষ্ট কণ্ঠস্বর থাকা চাই।’’
“যুদ্ধ কি অনিবার্য?” রাসেল পুনরায় জিজ্ঞাসা করল।
“অবশ্যই,” বললেন তিনি, রূঢ় স্বরে, “পাকিস্তান শাসকদের ছত্রছায়ায় মহাজনদের
লাগামহীন শোষণে নিম্নবর্গীয় মানুষদের নাভিস্বাস উঠেছে। ধর্মের ঠুলি পরিয়ে বাংলার
কৃষক-জনতাকে বোকা বানানো হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করে পশ্চিম
পাকিস্তানকে সম্পদশালী করা হচ্ছে। রাজনীতি রোমান্টিকতা বোঝে না, বোঝে রূঢ়
বাস্তবতা। রোমান্টিকতা কাটিয়ে বাংলার কৃষক-জনতা জেগে উঠছে। কাজেই যুদ্ধ
অনিবার্য।”
পরক্ষণে বললেন, “কৃষক-জনতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তোমরাও প্রতিবাদী হও।
বত্রিশ থেকে বঙ্গোপসাগর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া ছড়িয়ে দাও সেই প্রতিবাদের
দুর্দমনীয় ভাষা। মনে রেখো, প্রতিবাদীর মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা
প্রতিনিয়ত জন্মগ্রহণ করে।”
তুমুল ভুঁড়িভোজনের পর ছাত্ররা প্রসন্ন মুখে বিদায় নিল, শুধু তোফায়েল আহমেদ
বঙ্গবন্ধু’র সঙ্গে রয়ে গেলেন।
যে জিপে করে তারা এসেছিল, সেই জিপে উঠল না রাসেল ও সাবিত্রী। তারা প্রধান
সড়ক ধরে হাঁটতে লাগল।
বিকেলের উদ্দেশ্যহীন উপস্থিতি নীরবে শুরু হয়েছিল তারা অনুমান করতে পারেনি।
তবে শহরের রাস্তাগুলো তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল, সোনা-ঝরা বিকেলটি তার পূর্ণ
যৌবনের সাথে ফিরে এসেছে। মানুষের হৈচৈ, ভবঘুরেদের সমাগম, অতিরিক্ত মেকাপ
করা দেহোপজীবিনীদের চলাফেরা, জটাচুলের বিবস্ত্র সাধুর সদম্ভ পদচারণা (যিনি ভাবেন
তাকে বাদ দিয়ে এ শহরের সবাই একেকটা নরক), অতিসংবেদনশীল কুকুরছানা এবং
সতর্ক নেড়িকুত্তাদের বিচরণ, বৈদ্যুতিক তারের উপর ঝাঁক ঝাঁক কাকের কানফাটা
চিৎকার, রং-বেরঙের পালকওয়ালা পাখিদের ওড়াউড়ি—সেগুলোই ছিল সেই দুর্দান্ত
বিকেলের আংশিক চিত্র।
বিকেলের পর সন্ধ্যাবাবু ঢিমেতালে এসে হাজির। হেঁটে আর কতক্ষণ! তারা রিক্সা ধরল।
অতঃপর ইকবাল হলে পৌঁছুল।
রাসেলের রুমটা দোতলায়। বারান্দা থেকে সামান্য দূরে পরিষ্কার জলের পুকুর।
পুকুরের প্রায় চারপাশে ঝোপঝাড় এবং কোথাও শানবাঁধা ঘাট।
মধ্যরাতে, যখন রাসেলের ঘুম ভেঙে যেত, তখন সে চেয়ার টেনে বারান্দায়
বসত—উপভোগ করত প্রকৃতির রূপ-রস-সুধা, আবৃত্তি করত কবিতা এবং মাঝেমাঝে
আচ্ছন্ন হত অতীত চিন্তা-ভাবনায়। সেই অতীত দিনে, যখন তার বয়স মাত্র দশ, তার
বড় ভাইয়ের নির্মম মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছিল তিল তিল অসহায় যন্ত্রণায়। তারা দুই ভাই এবং
তাদের বয়সের ব্যবধান ছিল বিস্তর—প্রায় দশ বছরের। সে কারণে, তার একটি বাড়তি
সুবিধা ছিল; তার ভাইয়ের কাছ থেকে সমস্ত স্নেহ ও সমর্থন আদায় করে নিতে পেরেছিল।
তার বড়ভাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঝাঁকড়া চুলের সাহসী যুবক। কখনো
ঝর্ণার মতো উচ্ছল! কখনো শরতের মতো স্নিগ্ধ! তার অস্থির মন কখনো বিপ্লবী চে’
গুয়েভারা হতে চাইত, কখনো স্বপ্নের শেখ মুজিব! আহা, স্বপ্নভরা চোখ! চলাফেরায়
যেমন প্রাণবন্ত ছিল কথাবার্তায় তেমন চটপটে। এছাড়া, স্থানীয় ক্লাবে একজন নিবন্ধিত
গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার ছিল সে। একদিন, দু’ভাই সাইকেল নিয়ে বাজারে যাচ্ছিল ফুটবল
কিনতে। তার বড়ভাই ছিল ড্রাইভিং সিটে আর সে ছিল তার পেছনে। যখন তারা একটি
চত্ত্বরে পৌঁছুল, ঠিক তখুনি একজন উর্দুভাষী উদ্ধত পুলিশ সদস্য তাদের থামার নির্দেশ
দিয়েছিল। কিন্তু, তার বড়ভাই, জেনে বা না জেনে, না বয়সের দোষে, চরমভাবে উপেক্ষা
করেছিল তাকে। ফলে, পুলিশ সদস্য ভীষণ রেগে গিয়ে তাকে ধাওয়া করে। দীর্ঘ ধাওয়া
করার পরে, যখন সে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছিল, ঠিক তখনই সে সাইক্লিস্টের অধমাঙ্গ লক্ষ করে
গুলি ছোঁড়ে; আর গুলিটা অদৃশ্য গতিতে এসে তার পা ফুটো করে হাওয়ায় আত্মগোপন
করে। এবং তারপর ঘটে চকিত দুর্ঘটনা। সে তার সাইকেল ও ছোটভাইকে নিয়ে রাস্তা
থেকে ছিটকে পড়ে এক গভীর খাদে।
রাসেল সামান্য আঘাত পেলেও তার ভাইকে হাসপাতালে নিতে হয়। অস্ত্রোপচারের
মাধ্যমে তার গুলিবিদ্ধ পা কেটে ফেলতে হয়, এবং তাকে প্রায় তিন মাস বিছানাগত
থাকতে হয়।
হাঁটতে পারত না, পারত না খেলতে। সারাক্ষণ মন খারাপ করে থাকত, নাওয়া
খাওয়া প্রায় ভুলে গিয়েছিল এবং যখন ফুটবল দেখত, তখন গুমরে গুমরে কাঁদত সে।
দু’গণ্ড বেয়ে অশ্রুধারা নামত। তার অশ্রুসিক্ত মায়াবী মুখ যে-কাউকে কাঁদাত। রাসেলও
কাঁদত। সেই ছোট্ট বয়সে আল্লাহ’র কাছে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করত, হে আল্লাহ, আমার
ভাইকে ভালো করে দাও! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, তার ক্ষত শুকায়নি। বছরখানেকের মধ্যে
মারাত্মক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিল সে। এটি খুব দ্রুত সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল
এবং তাকে নিঃশব্দে খেয়ে ফেলে।
রাসেল কখনো ভুলতে পারেনি তার ভাইকে, তার অব্যক্ত কষ্টকে এবং ঠুকরে-খাওয়া
যন্ত্রণাকে। সাবিত্রী তার পাশেই বসে আছে, তবুও অনাড়ম্বর শবযাত্রার মতো ’হাহাকার’
হেঁটে গেল তার বুকের পাশ দিয়ে। টুপ করে খসে পড়ল অশ্রু।
“তুমি কাঁদছ?” সাবিত্রী অবাক হলো।
“হ্যাঁ, এ কান্না আমার কপালের তিলক!” বলতে বলতে গলা ধরে আসে তার।
সন্ধ্যাবাবুকে ব্যাগবন্দি করে তখন নিশিমশাই সশরীরে হাজির। তার আশকারায়
দেখতে না দেখতে আকাশের তারাগুলো আলোকিত হয়ে উঠল। শীতল সময় ফিরে
এসেছিল চরম ক্লান্ত নীলিমায়। চাঁদ ছিল লাজুক এবং গভীর মনোনিবেশে পাঠ করছিল
সূর্যের পাঠানো সংকেত লিপি।
দু’জন তখনো বারান্দায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে, সাবিত্রী হঠাৎ আনমনা হলো,
“চাঁদ কত সুন্দর, তাই না?”
“চাঁদ শুধু সুন্দর না, আমাদের অভিভাবকও বটে।” রাসেল স্বাভাবিক হয়ে এল।
“কীভাবে, বুঝিয়ে বলো?” সাবিত্রী’র আনমনা ভাবের মৃত্যু হলো।
“মহাকাশের সুচিন্তিত ও অদ্ভুত বিন্যাস খেয়াল করলেই টের পাওয়া যায় একজন
মহান কারিগরের অস্তিত্ব।” রাসেল এবার ভাবুক হলো, “সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে চাঁদ
না থাকলে জোয়ার-ভাটা হত না। আর জোয়ার-ভাটা না থাকলে জাহাজ শিল্পের বিকাশ
ঘটত না।”
“কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বলে থাকেন পৃথিবীর সঙ্গে ‘থিয়া’ নামক এক গ্রহাণুর
ধাক্কার ফলে চাঁদের সৃষ্টি হয়েছে, কতটা সত্য?”
“মহাকাশের জটিল রহস্য উন্মোচন করা বা ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে সাদা চোখে যা দেখি তাতে তাদের ধারণা ভুল বলে আমি মনে করি। কারণ,
পৃথিবীর আছে মাত্র একটি চাঁদ; আর শনি গ্রহের রয়েছে অর্ধ শতকের উপর উপগ্রহ বা
চাঁদ। তারা কীসের ধাক্কায় সৃষ্ট?”
রাসেল ভালো বোধ করছিল না। ঘরে ঢুকে, বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল।
সাবিত্রী তার পিছু পিছু ঢুকল, এবং হঠাৎ বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে ফিরে এল, “বঙ্গবন্ধুর মতো
কিংবদন্তি রাতারাতি আসেননি। তিনি আমাদের সময়ের নেতা হতে জন্মগ্রহণ করেছেন।
তিনি তোমার কপালে চুমু খেয়েছেন। সুতরাং তুমি ভাগ্যবান। বিদায় নেবার আগে তোমার
কপাল স্পর্শ করতে চাই।”
“অবশ্যই,” ম্লানমুখে হাসল সে, “তবে বঙ্গবন্ধু তোমার সম্পর্কে যা বলেছেন সত্যিই
বলেছেন। সেই আগুনে আমার কপাল পোড়াবে না তো?”
সাবিত্রীও হাসল, তবে হৃষ্টচিত্তে। তার নরম মোহনীয় হাত রাসেলের কপালে ছোঁয়াল
সে, এবং বলল, “শুভরাত্রি!”
“শুভরাত্রি!” সে-ও বলল এবং তারপর চোখ বন্ধ করল।
সাবিত্রী চলে গেল, কিন্তু তার কপালে রেখে গেল কী এক যাদুকরী স্পর্শ! অনুচিন্তন ভেসে
উঠল তার মনে। অনেকদিন আগে, যখন তার আদর পাওয়ার বয়স ছিল; বর্ষণ মুখর
সন্ধ্যায় বা বিষণ্ন সন্ধ্যায় জ্বর হলে মা নিখুঁত আবেশের সাথে তার কপালে হাত বুলিয়ে
দিতেন। দীর্ঘদিন পরে সেরকম আবেশ অনুভব করল সে; এবং অদ্ভুতভাবে সময় লাগল
তার সেই আবেশ কাটিয়ে উঠতে।
দরজা হাট করে খোলা ছিল। ফুলের গন্ধে ভরপুর স্নিগ্ধ বাতাস পুকুরের পাশ থেকে
এসে ঘরে ঢুকল এবং তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। (চলবে)

