৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

দূর নক্ষত্র পর্ব-০২

ইসমাইল হোসেন ইসমী

by sondeshbd.com
212 views

‘গোরস্থানের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে প্যান্ডেল তৈরি করা হবে। হ্যাজাক লাইট ওমাইক ভাড়া কোথায় কোথায় পাওয়া যায় খুঁজে বের কর। মাইক গতবারের চেয়ে বেশি নিতে হবে। শামিয়ানা, চেয়ারটেবিল বেশি করে নিবি। পালপুর ক্লাবে যাযা পাওয়া যায় তার একটা লিস্ট করে ফেলিস। এসব কাজ তুই ছাড়া হবে নাইয়েল।’
‘ঠিক আছে, লিস্ট করে ফেলব আজকালের মধ্যে।’
‘ভরসা পেলাম রে ইয়েল। তুই আছিস বলেই গ্রামের সব অনুষ্ঠান সঠিকভাবে হয়।’
গল্প করতে করতে তারা ইমরান ডাক্তারের বাড়ি পৌঁছে যায়। ডাক্তার কয়েকটা ঔষধ মিক্স করে দুই বোতল সিরাপ বানিয়ে দিলেন। বোতলগুলো নিয়ে সোজা রাস্তায় এসে পড়ে ইয়েল। সমস্ত রাস্তা ফাঁকা। রাস্তায় সে এখন একা। নিঝুম নিকষ কালো রাত। বৃষ্টির ফোঁটা চালের খড়ের মধ্য দিয়ে টপটপ করে পড়ছে। তার হৃদয় দিয়ে ঝরে চলছে অজানার বৃষ্টি। কী করবে তা নিয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে।ইলাদের বাড়ি যাবে, না তার মাকে বলে তারপর যাবে-এসব ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মাথায় কোনো বুদ্ধি কাজ করছে না। ইয়েল ব্যাকুল হয়ে পড়ে। সব চিন্তা বাদ দিয়ে এক পা দুই পা করে ইলাদের বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। ঘরে গিয়ে দেখেওর দাদি ওর কপালে পট্টি লাগিয়ে দিচ্ছে।
ইয়েলকে দেখে দাদি বলেন,‘জ্বর কিছুতেই কমছে না।’
‘এ সিরাপটা খাইয়ে দাও দাদি। দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে জ্বর কমে যাবে।’
বোতলগুলো দাদির হাতে দিয়ে জগ থেকে কাসার গেলাসে পানি ঢেলে দেয় ইয়েল। ইলাকে তুলে ধরে রাখতে পারে না দাদি। আবার শুইয়ে দেয়। ইয়েল তাকে তুলে বুকের ভেতর ধরে আর ওর দাদি ইলার মুখে সিরাপ দিয়ে দেয়। সিরাপ খেয়ে ইলা আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে।
ওর দাদি বলেন, ‘অনেক রাত হয়েছে। এবার বাড়ি যা ইয়েল। না হলে আবার তোর মা খুঁজতে আসবে। তুই আর থাকিস না। অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যা ভাই।’
‘কেন দাদি, মাকে কী বলেছ?’
‘বলেছি, ডাক্তারের বাড়ি ঔষুধ আনতে গেছ।’
‘ভালো বলেছ, না হলে আবার আসত।’
‘আসার দরকার নেই। তুই যা এখন।’
ইয়েল অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। ইলার দাদি যা এতক্ষণ বললেন তার কিছুই শোনেনি সে।
‘যা ইয়েল, নইলে তোর মা আবার আসবে।’
‘আমাকে পরভাবো কেন দাদি?’
‘না রে ভাই! তোর মা আবার এসে দেখলে কী ভাববে বল?’
‘ঠিক আছে, মা এলে বলবেআমি এখনও আসিনি।’
‘এটা কী করে হয়?’
‘ভয় পেয়ো না। আমি খাটের নিচে চলে যাবো।’
‘বড়ো হচ্ছিস আর দিনদিন পাগলামি বাড়ছে তোর।’
‘তোমার আঁচলের তলে লুকিয়ে থাকব।’
‘পাগল!’
ইলার দাদিকে জড়িয়ে ধরে ইয়েল বলে,‘লক্ষ্মী দাদি আমার। আজকে রাতটা থাকতে দাও। ঢাকার কোচিঙে ভর্তি হয়ে গেলে কবে আসব ঠিক নেই।তুমি একা-একা কী করে ওকে দেখবে বলো? জ্বর না কমলে জলপট্টি দিতেই হবে। রাত জেগে এসব করতে পারবে?তোমার বয়স হয়েছে। তুমি শুয়ে পড়ো দাদি। আমি আছি।’
‘তোর মতলবটা কী শুনি?’
‘তোমাদের দুজনের সেবা করা, যত্ন করা, দেখে রাখা।’
‘আর কী?’
‘মাথায় তুলে রাখা।’
‘আমি কিন্তু এখনও চোখে দেখি, মনে রাখিস।’
‘কী যে বলো না দাদি! চোখে দেখো ঠিকই তবে অন্তর দিয়ে অনুভব করো না।’
‘তোর দাদা মারা যাওয়ার পর আমার অন্তর যে কালা হয়ে গেছেরে। অন্তর জাগ্রত করি না। তোদের জন্য সচেতন হতে হবে। কথা দে আমার বংশের মর্যাদা রাখবি।’
‘এসব কী বলো দাদি! আমি কী সেরকম?’
‘তোরা এখন বড়ো হয়েছিস।’
‘আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারো দাদি।’
‘আগুনের কাছে মোমবাতি রাখতে নাই রে দাদুভাই। রাখলেই মোমবাতি অমনি নিজেই গলে যেতে থাকে।’
‘দাদি, বিশ্বাসের অমর্যাদা করব না কখনও। এটা মনে রেখো।’
‘সে বিশ্বাস তোর উপর আছে আমার।’
‘তুমি নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ো দাদি। আমি পট্টি দিয়েদিই।’
‘আচ্ছা, শুধু আজ রাতটা।’
‘লক্ষ্মী দাদি’, বলে জড়িয়ে ধরে ইয়েল।
ইলার কপালেসারারাত ধরে জলপট্টি দিয়ে থাকে সে। ইলার দাদি বিছানায় শুয়ে শুয়ে প্রগলভ হয়ে বলে যেতে লাগলেন,‘মা-মরা মেয়েটাকে যে কোথায় রেখে যাই! কারও জিম্মায় দিয়ে যেতে পারলে মরে শান্তি পেতাম।’
‘দাদি চিন্তা করো না।খোদা একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।’
‘তাই যেন হয় রে দাদুভাই, তাই যেন হয়’, বলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করেন তিনি।
ময়লা পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানি নেওয়ার জন্যে বের হয়েছে। হাঁটা শুরু করেছে এমন সময় শিয়ালের হাঁকডাক কানে ভেসে আসে। ভয়ে-ভয়ে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে গিয়ে বোলের পানিটা ফেলে আবার নতুন করে পানি নিয়ে ঘরে ফিরে আসে ইয়েল। নিশ্বাস ছেড়ে বুকে তিনটা ফুঁ দেয়। পকেট থেকে রুমাল বের করে ইলার কপালে জলপট্টি লাগাতে থাকে। পট্টি লাগাতে-লাগাতে কখন যেঝিমিয়ে পড়েছে ইয়েল টের পায়নি। ঘরে দুটো খাট পাতা রয়েছে। একটা খাটে দাদি, অন্যটাতেইলা। সে ইলার পায়ের কাছে মাথা রেখে ঝিমুচ্ছে। ইলার জ্বর কিছুটা ছেড়ে গেছে।এখন ইলা ঘুমাচ্ছে।মাইকে আজান দেওয়া শুরু হয়েছে।
মাইকের আজানে দাদির ঘুম ভেঙে যায়।দাদি ওর মাথায় হাত দিয়ে ডাকেন, ‘ইয়েল, উঠ এবার। অনেক হয়েছে, বাড়ি যা।’
ইয়েল চোখ ডলতে ডলতে উঠে দাঁড়ায়। ‘দাদি, তুমি নামাজ পড়ে নাও।’
‘আচ্ছা’, বলে দাদি অজু করতে ঘরের দরজা খুলে বাইরে গেলেন।
ইলার উপর চোখ চলে যায় ওর। ইলা চিত হয়ে শুয়ে আছে। মুখটা মলিন। চুলগুলো এলোমোল। দুচোখের নিচে কিছুটা কালি জমে গেছে। ঠোঁট দুটো শুকনো। নির্ভার হয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। কিছু চুল পেছনে আর কিছু বুকের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দুষ্ট ওড়নাটা বুক থেকে সরে গিয়ে গলার কাছে আটকে আছে। বক্ষযুগলকে দেখাচ্ছেফনা তোলা সাপের মতো। দ্রুত নিশ্বাস নেওয়ায় খরিস সাপের ফনার মতো ওঠানামা করছে ওর বুকটা। ইয়েলের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। ওর দুটো চোখ স্থির। ওর বিবেকবুদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেছে। তাকে রঙিন নেশায় ধরেছে।কাশফুলের মতো সাদা মেঘের ভেলায় উড়ে যাচ্ছে। শান্তিময় রঙিন প্রশান্তির স্বপ্নের রাজ্যে এসে পড়েছে সে।
দাদি নামাজ পড়া শেষ করে তসবি গোনা শুরু করেছেন। সেদিকে খেয়াল নেই তার। ইলার দাদি দেখে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে ইয়েল। মনে হচ্ছে কোনো মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।দাদি বলেন,‘ইয়েল, যা এবার।’
সে শুনতে পায়নি। দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
দাদি গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলেন,‘কী রে ইয়েল, যাস না কেন?’
দাদির ধাক্কায় বস্তবে ফিরে এসে বলে,‘ভোরের আলো এখনও ফোটেনি। একটু পরিষ্কার হলেই চলে যাবো দাদি।’
‘অনেক হয়েছে। অনেক থেকেছিস। পরে এসে দেখা করে যাস।’
ঘর থেকে বের হয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বাইরে আসে ইয়েল। মসজিদ থেকেকুরআন তেলায়াতের সুমধুর কণ্ঠ ভেসে আসে। সে সামনে এগিয়ে যায়। ভাবতে থাকে রাস্তা দিয়ে যাবে নাকি পুকুরপাড় দিয়ে যাবে। ভুল করে পুকুরপাড় দিয়ে যাওয়া শুরু করে। পুকুরপাড়ের দিকে যেতে দেখে ইলার বড়ো বোন কাজলা এগিয়ে আসে। ইয়েলের চোখ দুটো ছানাবড়া। বাড়ির পাশের জমি থেকে এক ডালি মুলা আর সরিষার শাক তুলে এদিকেই আসছে।তার সামনে দিয়েই হেঁটে চলে যায় ইয়েল। কাজলা পেছন ঘুরে তাকাতেই সে দ্রত হাঁটা শুরু করে। একটু এগোতেই দেখে গাছের আড়ালে বদি পাগলা দাঁড়িয়ে আছে।
‘কী রে বদি, কী করিস এখানে?’
‘তুমি যা করো আমিও তাই করি।’
‘আমি আবার কী করি?’
‘এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াও। আমি ছায়া হয়ে তোমার পেছন পেছন থাকি।’
‘অন্যকে অনুসরণ করা একদম ঠিক না।’
‘তোমার অনিষ্ট হোক সেটা আমি চাই না।’
‘আমার অনিষ্ট হবে? কীসব আবোলতাবোল বকছিস!’
‘আমি যা দেখি যা শুনি, তুমি তা দেখো না শোনো না। অদৃশ্য পঙ্গপাল আছে হে ভায়া।’
‘তোকে আমি চিনতেই পরিনি।’
‘যাও যাও, বাড়ি যাও। ঘুমঘুম চোখে আর বেশিক্ষণ থেকো না।’
বদি পাগলার কথা শুনে পুকুরপাড়ের নিচু জায়গা দিয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটা শুরু করে সে।

অগ্রহায়ণ মাসের শেষ সপ্তাহ। চারিদিকে ধান কাটার ধুম। গ্রামের সব বাড়িতে চলছে ধানকাটা নিয়ে ব্যস্ততা। প্রায় সব বাড়ির উঠোনে ধানের স্তূপ দেখা যায়। গ্রামের মানুষগুলোর এক খণ্ড ফুরসত নেইধানকাটা, সিদ্ধ করা, শুকানো এবং ধানের খড় গুছিয়ে রাখা। নতুন ধানের ঘ্রাণে গ্রামের বাতাসে ম-ম গন্ধ। নতুন যোগ হয়েছে ইসলামি মাহফিল। গ্রামের মানুষদের আনন্দে আরেক ধাপ যোগ হয়েছে। মাহফিল মানে প্রত্যেক বাড়িতে দূর-দূরান্ত থেকে মেহমানের আগমন। বাড়ির মেয়েদের নাইয়রে আসার সময়। এ সুযোগে কেউ আবার ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে ভাবিদের গাত্রদাহ হতে দ্বিধাবোধ করে না। বেড়াতে আসার এ সুযোগ কেউই হাতছাড়া করতে চায় না।ঘরে ঘরে মেহমানের আনাগোনা। মেহমান এলেই হরেক রকমের রান্নার ধুম পড়ে যায়। এমন কোনো বাড়ি নেই যে বাড়িতে মেহমান আসে না। উৎসব উৎসব ভাব গ্রামময়।
সকালবেলাশুয়ে আছে ইয়েল।বদি পাগলা হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে বলে,‘তোমারে ডাক্তার নানা ডাকে।’
ইয়েল বলে,‘কেন রে?’
বদি পাগলা বলে,‘তুমি গিয়ে বুঝো।’
‘যা ভাগ এখান থেকে, নইলেক্যালাব’, বলে আবার কাঁথা গায়ে দেয়।
বদি পাগলা একটু সামনে ঝুঁকে বলে, ‘তোমার হ্যাজাক লাইট জ্বলে না।’
কাঁথা থেকে মুখ বের করে বলে,‘কী বললি!’
‘তোমার হ্যাজাক লাইট জ্বলে না’, বলে হি-হি করে হাসতে থাকে পাগলা।
বিছানা ছেড়ে উঠে ইয়েল বলে,‘চল দেখি কী হয়েছে।’
তারা দুজনে ইমরান ডাক্তারের বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করে।রাস্তায় গিয়াস মুহুরির সাথে দেখা হলে বলেন,‘আয়োজনটা ভালো করে করতে হবেরে ইয়েল। গ্রামের সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে। আর হিটু,টিটু, বিপুকেও কাজে লাগা।’
‘জি চাচাজান। আজ রাতেই স্কুলমাঠে বসে সবার কাজ বুঝিয়ে দেবো।’
‘পোস্টার চলে এসেছে। তুই দায়িত্ব নিয়ে গ্রামের সব জায়গায় সেঁটে দেওয়ার ব্যবস্থা কর।’
‘জি চাচাজান।চাচা, আর কয়েকটা বাঁশ লাগবে।’
‘পুকুরপাড়ের ঝাড় থেকে কেটে নিস। তবে বেশি কাটিস না।’
‘কী যে বলেন চাচাজান, বেশি কেটে কী করব?’
‘আচ্ছা।’
‘ডাক্তার নানা ডেকে পাঠিয়েছেন, সেখানে যাচ্ছি।’
‘আচ্ছা।’
বদি পাগলা বলে,‘এত বাঁশ দিয়ে কীকরবা ইয়েল ভায়া?গতবার নানারবাঁশ দিয়ে জলিলের বাড়ির কাজ করে দিছে। এবার কার লাগি এত বাঁশ’, বলতেই ইয়েল চুপ চুপ বলে থামাতে যায় বদি পাগলাকে।
বদি পাগলা দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,‘কীসের চুপ!’
কোনো উপায়ান্তর না দেখে ইয়েল ওর মুখ চেপে ধরে।
বদি পাগলাবলে,‘চুপ থাকবার পারিতবে আমাকে এক প্যাকেট কেটু (কেটু সিগারেট)দিতে হবে। আর না হলে সব বলে দেবানি।’
‘তুই তো সেয়ানা পাগল রে। আগে মুখ বন্ধ কর, তারপর নিস। চল এখন।’
‘এই মুখ বন্ধ করলাম। কেটু দাও এখন।’
‘বলেছি দেবো। এদিকে না, সামনে চল।’
দুজনে আবার ইমরান ডাক্তারের বাড়ি দিকে যেতে আরম্ভ করে।
উঠোনে হ্যাজাক লাইটগুলো রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন ডাক্তার। পাঁচটার মধ্যে তিনটা জ্বলে না।ইয়েলকে দেখে ডাক্তার বলে ওঠেন,‘কী রে ইয়েল, তিনটা হ্যাজাক লাইট জ্বলছে না।’
‘ভালো করে দেখেছেন?’
‘হ্যাঁ রে, ভালো করেই দেখলাম। অনেকবার চেষ্টা করেও দেখলাম।’
‘আমাকে দেন। আমি দেখছি কী হয়েছে।’
এক-একটা করে হ্যাজাক লাইট নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে সে। একটা নিয়ে জোরে জোরে পাম্প করতে থাকে। তারপরও মেন্টলে আগুন ধরে না। অনেক কায়দা কৌশল করেওজ্বালাতে পারে না। অনেকক্ষণ ধরে পাম্প করে যেতে থাকে। মেন্টল যখন তেলে ভিজে ওঠে আগুন ধরালে শো-শো করে শব্দ হয় কিন্তুজ্বলে না।
‘বদি, একটু জিআই তার নিয়ে আয় তো।’
বদি পাগলা বলে,‘খুঁজে পেতে সময় লাগবে।’
‘তাড়াতাড়ি কর।’
‘বিনে পয়সায় বেশি খচখচ করো না।’
ইয়েল কোনো কথা না বলে জোরে জোরে পাম্প করতে থাকে। শো-শো শব্দ করে তেল বের হয়।বদি পাগলা কিছুক্ষণ পর তার নিয়ে ফিরেআসে।তারটা নিয়ে হ্যাজাক লাইটের যেখান থেকে তেল বের হয় সেসব ছিদ্র দিয়ে তারের কিছু অংশ ঢুকিয়ে দিয়ে ময়লা বের করার চেষ্টা করে ইয়েল। কিছুকিছু ময়লা বের হয়। কয়েকবার ময়লা বের করার পরে আগুন দিলেও হ্যাজাকবাতি জ্বলে না। ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগে মেন্টলটাকে। খেয়াল করে মেন্টলে ছোটো ছোটো কয়েকটা ছিদ্র আছে। মেন্টল পরিবর্তন করে সব নতুন মেন্টল লাগিয়ে দিয়ে পাম্প করলে ফসফস করে আগুন জ্বলে ওঠে। বদি পাগলা হাত তালি দিয়ে বলে,‘জ্বলেছে! জ্বলেছে!’
ইমরান ডাক্তারও বলে ওঠেন,‘জ্বলেছে! যাক বাবা,বাঁচা গেল। ডাক্তার যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন ।
‘একটা কিছু হলেই অস্থির হয়ে যান।’
‘অস্থিরকেন হই তা যদি বুঝতিস! সব পোস্টার লাগানো হয়েছে?’
‘সব লাগানো হয়নি। কিছু হয়েছে আর কিছু বাকি আছে। দুয়েকদিনের মধ্যে সব লাগানো হয়ে যাবে।’
‘মাইক ভাড়া করে মাইকিং করে দিতে হবে।’
‘জি। গ্রামেগ্রামে মাইকিঙের জন্য মেজর ও সেতুকে বলে দিয়েছি। একবার হলেও সব গ্রামে যাবে।’
‘ভালো করেছিস’, বলে ডাক্তার একটু অন্যরকম হয়ে গেলেন।
ইয়েল জিজ্ঞাসা করে,‘কী হয়েছে ডাক্তার নানা?’
‘না, তেমন কিছু না।’
‘কীসের এত ভাবনা ডাক্তার নানা?’
‘তুই যখন বাইরে চলে যাবি তখন এসব কাজ কে করে দেবে?তুই আছিস বলেই এত কিছু করা সম্ভব হচ্ছে।’
‘কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না।’
‘কে বলেছে থেমে থাকে না? সৎ ও যোগ্য লোকের বড্ড অভাব আমাদের দেশে। কেউ কিছু করতে চায় না রে। শুধু পেতে চায়। আগে নিজের স্বার্থটা দেখে তারপর অন্য কাহিনি। এ জগৎসংসার যে মিছে মায়া। কেউ বুঝতে চাই না। ভবের মায়ায় পড়ে পথহারা পথিক হয়ে পথে-পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
‘কারও জন্য কোনো কিছু পড়ে থাকে না। সময়ই এক সময় শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়।’
এমন সময়ে খবর এলো আমেনার ছেলে পুকুরে পড়ে গেছে।ডাক্তার বলে উঠলেন,‘ইয়েল, দৌড়া জলদি। ছেলেটাকে বাঁচা।’
ডাক্তারের কথা শুনে ইয়েল দৌড় দেয়। পুকুরপাড়ে এসে দেখে ছেলেটা পুকুরের পানিতেহাবুডুবু খাচ্ছে আর পাড় থেকে কতগুলা মানুষ উচ্চৈঃস্বরে ‘ডুবে গেল! ডুবে গেলো!’বলে চিৎকার চেঁচামেছি করে যাচ্ছে। ইয়েল এসেই পুকুরে লাফ দেয়। ততক্ষণে ছেলেটা পানির নিচে চলে গেছে। সে পুকুরের ভিন্ন জায়গায় ডুব দিয়ে খোঁজ করতে থাকে। খোঁজ করতে-করতে একসময় পেয়ে যায়। অনেক কষ্টে তোলা হলো পুকুরেরপাড়ে। গ্রামের সবাই ঘিরে ধরেছে। ইয়েল মাটির উপরে বসে হাঁপাচ্ছে আর ছেলেটাকেশুইয়ে রেখেছে। অনেক লোক ঘিরে ধরে আছে।
ইয়েলকে জরিনা বলে,‘ইয়েল, কিছু একটা করো।’
ইয়েল বদি পাগলাকে বলে,‘ছেলেটাকে মাথার উপরে নিয়ে ঘোরাতে থাক।’
ওর কথা শুনে বদি পাগলা ছেলেটাকে নিয়ে জোরে জোরে ঘোরাতে থাকে। ঘোরাতে থাকলে ছেলেটার মুখ দিয়ে কিছু পানি বের হয়। সবাই একসাথে বলে ওঠে,‘পানি বের হয়েছে!’ সাত পাকের পর বদি পাগলা ছেলেটাকে মাটিতে রেখে দেয়। ইয়েল ছেলেটার পেটে চাপ দিয়েপানি বের করার চেষ্টা করে। পেটে চাপ দিলে কিছু পানি বের হয়। সে পেটে চাপ দিতে থাকে। পেটে চাপ দিয়েদিয়ে পানি বের করে। পেটের পানি বের করার পর ছেলেটা একসময় চোখ খুলে তাকায়।ভিড়ের মধ্য থেকে সালাম বলেওঠে,‘বেঁচে গেছে!’

অগ্রহায়ণ মাসে শেষ বিকেলের দিকে মিষ্টি রোদ পড়ে। মিষ্টি রোদের মধ্যে পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে বসেছে ইয়েল।কিছুক্ষণ পরেবদি পাগলা এসে ‘কয়টা মাছ ধরেছ?’ বলেআবার দৌড় দেয়। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলে,‘কয়টা মাছ ধরেছ?’
ইয়েল কোনো উত্তর দেয় না।মাছের আশায় বসে আছে তো আছেই। মাগার মাছ ধরা পড়ে না। এমন সময় ইলা পুকুরপাড়ে এসে পেছন থেকে বড়ো একটা ঢিল ছুড়ে মারে পুকুরে।বিরক্ত হয়ে পেছনে ফিরে দেখে ইলা মলিন মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ইয়েল মাছ ধরার ভান করে।
ইলাও পুকুর থেকে পানি নেওয়ার ভান করে। বলে, ‘এই যে মিস্টার, পথ ছাড়ুন, জল নেবো।’
‘পথের জায়গায় পথ আছে।’
‘সরে দাঁড়ান। এমনভাবে বসে আছেন যেন পুরো পুকুরঘাট আপনার।’
‘আমি রাজাবাদশা নই,ইয়েল।’
‘ভাবসাব দেখে তো মনেহচ্ছে না।’
‘কেন? মনেহচ্ছে না কেন?’
‘মনে হচ্ছে না আপনি ইয়েল সাহেব।’
‘কী মনে হচ্ছে তাহলে?’
‘জাহাঁপনা মাছ ধরছেন আর রানি মাছের চ্যার তৈরি করে না দিলে কি মাছ ধরা পড়ে?’
‘এই ঠিক ধরেছ।’
‘ঠিক না ধরে এমনি আসিনি জাহাঁপনা। বলুনআপনার জন্য কী কী করতে পারি।’
‘প্রিন্সেস ডায়না,চট জলদি কিছু মুড়ি নিয়ে আসো।’
‘এ অবেলায় মুড়ি দিয়ে কী হবে শুনি?’
‘অধমের পেটে বিকাল অবধি কিছুই যায়নি।’
‘তাহলে বদি পাগলা মিথ্যে বলেনি।’
‘বদি পাগলা কী বলেছে?’ (চলবে)

আরো পড়ুন