কদিন আগের ঘটনা। এক বিকেলে ডাক্তার দেখিয়ে শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। রাস্তায় ভীষণ যানজট — ঢাকা শহরের একদম স্বাভাবিক চিত্র।
একটা বেবীট্যাক্সি থামিয়ে উঠলাম। অভ্যাসবশত চালকের সাথে আলাপ জমে উঠলো। জানলাম, তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে।
আমি যেই যানবাহনেই উঠি — সেটা রিকশা হোক, বেবীট্যাক্সি বা উবার — চালকের সাথে কথা বলা আমার একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে।
অনেকে হয়তো এটাকে সময়ের অপচয় বলবে, কিন্তু আমার কাছে এটি যেন এক ধরনের চলমান সমাজবিজ্ঞান।
এই শহরের রাস্তাঘাটে বসেই বোঝা যায়, মানুষ কীভাবে ভাবে, কেমন করে দেশটাকে দেখে।
ঢাকা শহরের দীর্ঘস্থায়ী ট্রাফিক জ্যামে বসে বোরিং সময়টাকে অন্তত তাৎপর্যময় করে তুলতে এই আলাপচারিতা এক অন্যরকম আনন্দ দেয়।
সেদিনও আলাপের বিষয় ঘুরেফিরে চলে এলো দেশের রাজনীতিতে। আমি খুব বেশি প্রশ্ন করার আগেই তিনি বললেন,
“ভাই, এখনকার তরুণরা একসময় বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনটা করেছিল, তা সত্যি অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।
কিন্তু প্রশাসনের দায়িত্ব যখন তাদের হাতে এসেছে, তখন মনে হয় তারা ততটা সফল হয়নি।
অভিজ্ঞতার অভাবটাই হয়তো এখানে প্রধান কারণ।”
তার এই কথাটা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুললো। একদিক থেকে এটি একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ।
নতুন প্রজন্ম যারা পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যে উদ্যম, ন্যায়বোধ,
প্রযুক্তিগত জ্ঞান আছে — কিন্তু বাস্তব প্রশাসনিক জটিলতা, আমলাতন্ত্রের কাঠামো,
এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করার মতো দক্ষতা অনেক সময় অনুপস্থিত।
এখানেই মূল সংকট। আন্দোলন ও প্রশাসন — এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
আন্দোলনে আবেগ, ন্যায়বোধ ও পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে;
কিন্তু প্রশাসনে দরকার শৃঙ্খলা, অভিজ্ঞতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা।
নতুন প্রজন্ম হয়তো এই রূপান্তরের পথে হাঁটছে,
কিন্তু অভিজ্ঞতার ঘাটতি অনেক সময় তাদের বাস্তব প্রয়োগে সীমাবদ্ধ রাখে।
বেবীট্যাক্সি চালকের সেই সরল বিশ্লেষণটি যেন বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।
সাধারণ মানুষও এখন রাজনীতি বোঝে, মূল্যায়ন করে, এবং নিরপেক্ষ মত দিতে পারে — যা একধরনের সামাজিক সচেতনতার ইঙ্গিত।
এই সচেতনতাই হয়তো ভবিষ্যতে দেশকে আরও পরিণত গণতন্ত্রের পথে নিয়ে যেতে পারে।
আবু তালেব সিদ্দিকী,
জনপ্রিয় লেখক, গবেষক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

