৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

অব্যক্ত চাহুনীর প্রেম

মো: আবুল কালাম আজাদ

by sondeshbd.com
39 views

তদবিরটি তৃষার। সে আমার সেই অহঙ্কারী ক্লাসমেট। যার সাথে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম পর্যন্ত পুরো পাঁচ বছর পড়েছি একই স্কুলে। নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার ভান্ডারপুর হাইস্কুলের হেডমাস্টার শ্রদ্ধেয় জব্বার স্যারের কঠোর শাসনে ৮টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীন সকাল-সন্ধ্যা চলেছে এই বিদ্যা সাধনা। সালটি ১৯৭০। স্বাধীকার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। সর্বত্র স্লোগান, ‘ তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যুমনা।’ লাইব্রেরির সামনে দক্ষিণ দিকের টিনের ছাউনীর ছোটো ঘরটিতে আমরা তখন ১০ জন শিক্ষানবীশ; দুদু, টুকু, নজরুল, রবিউল, বাকী, আজাহার, আলীম, মেরী, রিক্তা আর তৃষা।

একই ঘরে দিনের পর দিন, দীর্ঘ সময়। মেয়েদের বেঞ্চিটি শুধু আলাদা। স্যার ব্যস্ত মানুষ, গোটা স্কুলের দায়িত্ব তাঁর। তাই মাঝে মাঝে একটা টাস্ক বা পড়া ধরিয়ে দিয়ে অন্য কাজে যান। এই ফাঁকে আলাপ চলে আমাদের। হাসি-ঠাট্টা এবং রঙ্গ। কিন্তু কী অবাক! সেই দীর্ঘ ৫ বছরের মধ্যে তৃষা আমার সাথে একটি কথাও বলেনি। আমার তো প্রশ্নই ওঠে না, কেননা ওই ১০ জনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে নিরীহ সাধারণ এবং লাজুকের অধম। অন্তরে কামনা ছিল তীব্র, কিন্তু ব্যক্ত করার ক্ষমতা ছিল না মোটেই। বড় তুচ্ছ আর হীন্ মনে হতো নিজেকে।

জব্বার স্যার যার পরনেই ভালো শিক্ষক। তিনি পড়াতেন সবকিছুই। তবে প্রত্যহের হোম টাস্ক দিতেন অংক আর ইংরেজি গ্রামারের। সবারই কিছু কিছু ভুল হতো। তিনি লাল কালিতে সেগুলো ঠিক করে দিতেন। স্নেহ করতেন প্রচুর, আর বকা দিতেন আরো বেশি। কিন্তু আমার মনে হতো তিনি যেনো আমাকেই তীরস্কার করতেন সবচেয়ে বেশি। তাচ্ছিল্ল ও। মারতেন না মোটেই। কিন্তু তাঁর কথার এতো ঝাল আর অপমানের এতো যন্ত্রণা যে তারচেয়ে মারাই ছিল ভালো। আমি কাঁদতাম নিঃশব্দে, মাথা নিচু করে। শুধু চোখের জলে ভিজে যেতো বুকের শার্ট। কখনো কখনো দু’এক ফোঁটা খাতার পাতাতেও পড়তো। লেখাগুলো ভিজে ঢ্যাপসা হয়ে যেতো। তা দেখে আরো বাড়তো বকুনী। সবাই আমার এই অপমান উপভোগ করতো। ওরা আমাকে শান্তনা দেয়নি, উৎসাহ দেয়নি, বরং করেছে অবহেলা। তাই নীরবে নিভৃতে অভিমানে আমার বুকের ভেতর তৈরি হয়েছে ত্যেজ, সঞ্চিত হয়েছে ক্ষোভ, জন্ম নিয়েছে শক্তির। তাই তো বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট যখন বেরোলো, তখন অনেকের চক্ষুই চড়ক গাছ। প্রত্যাশীত বৃত্তিটি আমি পেয়েছি। পায়নি অনেকেই, তৃষা ও।
এই সেই তৃষা ধনীর নন্দিনী। প্রতাপশালী এক মহাজনের একমাত্র কন্যা। দেশে বিদেশে কারবার তাঁর। গায়ের রংটা একটু শ্যামলা, কিন্তু গঠনটি চমৎকার। একেবারে বিদ্যুতের চমকের মতো চোখ ধাঁধানো। দারুণ শিহরীত চলন। তখনি উদ্ভিন্নযৌবনা। পোশাক-আশাক আলট্রা মর্ডান। দামী তো বটেই। সুতরাং সে আমার সাথে সখ্যতা করবে কোন্ দুঃখে ? তাই তো এসএসসির পরে ওরা ভর্তি হলো নামী-দামী কলেজে। আমার ঠাঁই হলো পার্বতীপুরের ডিগ্রি কলেজে। কিন্তু এই এসএসসির পরে কে কোথায় চলে গেলো জানা গেল না। তারপরে আমিও অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে চাকরি জীবনের শেষ সাত বছরের জন্য এলাম ঢাকাতে ২০০৭ সালে।

তারও দু’বছর পর পহেলা এপ্রিলে এলো হঠাৎ একটি কল। মুঠোফোনে। নারীকণ্ঠ। বংশীধ্বনির মতো কারুকাজ তাতে। আমি তো এপ্রিল ফুল বলেই উড়িয়ে দিতে চাইলাম। কিন্তু সে দেখি নাছোরবান্দা। একটু ইতিং-বিতিং এর পরে নাম বললো তৃষা। আমি চমকে উঠলাম। অতীতের গভীরে ডুবে গেলাম। কয়েক সেকেন্ড। ওর রেডিও তখনো চলছেই। ‘চিনতে পারো আমি কোন তৃষা?’ ততোক্ষণে আমি নিউট্রাল। বললাম, ‘নিশ্চয়ই, তোমাকে ভুলবো এক জনমেই তাই কী হয়?’ —‘তাই?’— অসম্ভব মোলায়েম ওর কণ্ঠ। আমি বললাম, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না? তুমি আমার সেই গরবিনী, বিউটি কুইন ক্লাসমেট, যে পাঁচ বছরের স্কুল জীবনে একবারও আমার সাথে কথা বলেনি।’ —‘সত্যি তাই?’ ওর কণ্ঠে অনুযোগ। —‘তা হলে কথা শুনেই আমাকে চিনলে কি করে?’ —‘ তোমার কণ্ঠস্বর আমি ভুলিনি,অনেক কষ্টেই হৃদয়ের হার্ডডিস্কে তা প্রিজার্ভ করেছি সঙ্গোপনে। সেই সুরেলা মাদকীয় কণ্ঠ, যা দিয়ে মশকরা করতে আমার বন্ধুদের সাথে, আমারই সম্মুখে।
সখী কেমনে রাখিব হিয়া
আমারই বধূয়া আন বাড়ি যায়
আমারই আঙ্গিনা দিয়া।

আমি শুধুই শুনেছি আর তিক্ততার সাথে সঞ্চিত করেছি সেই বঞ্চনার ব্যথা।’ —এক নিঃশ্বাসে বলি কথাগুলো। ও বলে, ‘ ভেরি স্যাড।’ আমি আবার বলি, ‘আচ্ছা আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি, যেচে কোনো দিন কথা বলিনি, সাহস করে তাকাইনি তোমার দিকে, তবু কেন তোমার এতোরাগ আমাকে?’ ও বলে, ‘ দেখো এই বয়সে আর অনুরাগের কথা বলতে চাই না, তবে নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে তোমার নির্লিপ্ততাই আমাকে পীড়া দিত। জানোই তো আমার রূপের অহংকার ছিল, প্রতিপত্তিরও। ছেলেরা আমাকে পছন্দ করত, উপবাচক হয়ে কথা বলত। সুযোগ পেলেই প্রশংসা করত বড়রা পর্যন্ত। শুধু তুমিই তাকাতেনা আমার দিকে। আমি মনে করতাম এ তোমার অবজ্ঞা। আমার অহমিকায় সেটিই প্রথম আঘাত। তাই তো তারুণ্যের অপমানে আমি অন্ধ হয়ে যাই। প্রতিহিংসায় তোমার অনিষ্ট কামনা করি। তোমার কষ্ট আর অপদস্থতায় আমি আনন্দিত হই।’— ‘এতো কিছু?’ — তখন জানলে তো মজনু হয়ে যেতাম।’— ‘বাড়িয়ে বলছো।’ —‘একদম না, তা থাক, এতোদিন পরে কেন আমাকে মনে পড়ল তোমার তাই বলো।’
— ‘নিশ্চয়ই বলবো, তার আগে বলো তুমি কেমন আছো?
—‘ভালো
কতো কষ্ট আর পেরেশানীর পরে তোমার নম্বরটি সংগ্রহ করেছি জানো?’
— ‘আমি কি এতোই দুর্লভ?’
— ‘হাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে, এর চেয়ে বরং সহজ ছিল মহামান্য প্রেসিডেন্টের ফোন নম্বর জোগার করা।
— ‘সে তো সহজ হবেই, কেননা প্রেসিডেন্ট হলেন দেশের এক নম্বর ব্যক্তি, সমগ্র জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, শেষ আশ্রয়স্থল। কাজেই তাঁকে তো অবারিত হতেই হয়। তাই তো তাঁর নম্বর কাগজে, ডায়রিতে সর্বত্র। আর সৃষ্টিকর্তা আরো সর্বজনীন জন্যই তাকে আপনি, তুমি, তুই সব নামেই ডাকা যায়, সবসময়। আমি হলাম এক অতি তুচ্ছ মানুষ, তাই তো আমাকে রেখে-ঢেকে চলতে হয়। মূল্যবান রত্ন বাহারী দোকানে পাওয়া যায়, মূল্যহীন পাথর কোথায় পড়ে থাকে কে তার খোঁজ রাখে?’
— ‘আ”ছা দাঁড়াও, আমার সন্দেহ হচ্ছে আমি কি সেই স্বাধীনের সাথে কথা বলছি, মুখচোরা লাজুক ছেলেটি, শত ধাক্কাতেও যার মুখ থেকে রা’ বেরোতো না?’
— ‘ কোনোদিন ধাক্কা মেরে পরখ করেছিলে?’
— ‘দাঁড়াও দাঁড়াও, আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি, এতো ঝটপট খোঁচামারা লাগসই উত্তর দিতে শিখলে কবে থেকে?’
— ‘না সুন্দরী, খোঁচা মারিনি, শুধুই উত্তর দিচ্ছি, কেননা কখনো তুমি কথা বলবে আমার সাথে সেটিই ভাবিনি কোনোদিন। তা বলো কী এমন প্রয়োজন অধমের, এতদিন পর?’
তৃষা বলে, ‘আমার স্বামী মারা গেছে গত বছর। তার এক কেনা সম্পত্তির মূল্য হবে কয়েক কোটি। সেই সম্পত্তির নামজারী সংক্রান্ত মামলা ছিল নওগার ডিসি অফিসে। সেখানে আমি রায় পেয়েছি। কিন্তু বাদী আপিল করেছে বিভাগীয় কমিশনার রাজশাহীতে। আমার উকিল পরামর্শ দিল যে সেখানে একটু তদবির করলে ভালো হয়। সেই বললো তোমার কথা।’
— ‘ কেসটা তো ভালোই মনে হচ্ছে। কিন্তু আমি কী করতে পারি?’
— ‘ কেন, তুমি আমার হয়ে তদবির করবে?’
— ‘আমি তো কোনো তদবির শুনি না, করিও না।’
— ‘তা শুনেছি, কিন্তু এটা কোনো অবৈধ তদবির নয়। উনি যেন ন্যায়সঙ্গত আদেশ দেন, সেটিই আমি চাই।
— ‘সে রকম আদেশ দেয়াই তো বিচারকের কর্তব্য।’
— ‘সব বিচারকই কী তা করেন, না করতে পারেন?’
— ‘অধিকাংশই করেন।’
— ‘আমি তো জানি তার উল্টোটা।’
— ‘ সে বিতর্কের সমাধান নাই। কেননা, কোনো জাজ্মেন্টকেই কম্পিউটারে যাচাই করা যায় না। তা-আমি বলব তোমার কথা।’
সেদিনের কথা সে পর্যন্তই। রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান আর অতিরিক্ত কমিশনার সৈয়দ আহমদ ছাপা উভয়েই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, একই ব্যাচের। বগুড়াতে মান্নান, নন্দি গ্রামে আর আমি গাবতলীর ইউএনও ছিলাম। ও আমাকে ডাকতো ‘গুরু’ বলে। সে শান্ত এবং গম্ভীর। কবিও। আবুহেনা মোস্তফা কামালের সাগরেদ সে। আর ছাপা— অসম্ভব চঞ্চল। আমাকে বলে দোস্ত। ওর সাথে শাহ্বাগে আইন, ভাটিয়ারিতে মিলিটারী আর সাভারের পিএটিসিতে বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি অন্তরঙ্গভাবে। মান্নানকে বলতেই সে তৃষার সাথে আমার সম্পর্ক নিয়ে কবিতার এক নতুন নিকুঞ্জের সন্ধানে মত্ত হলো। জানতে পারলাম কেসটি ছাপার কাছে। তাই তাকেই বললাম বিস্তারিত। সে তার স্বভাবসুলভ ইয়ার্কী করেই বললো, ‘ দোস্ত, তোমার পুরনো পিরিতী আমার দ্বারা ঝালাই করে নিতে গেলে আমাকে তার অংশ দিতে হবে।’ — আমি বললাম, ‘অংশ নয়, পুরোটাই তোমাকে দেবো, কিন্তু দখল নিতে হবে নিজের জোরেই।’ — ও হেসে বললো, ‘ দোস্ত, এখন অসুখ-বিসুখ আর নিজের ঘর সামলাতেই পেরেশান। কাজেই তুমি নিশ্চিন্তে— থাকতে পারো যে, তোমার রাজ্যে হামলা করার সাধ্য আমার নেই।’ — আমি বললাম, ‘তৃষার সাথে কোনো প্রেম-পিরিতির সম্পর্ক আমার নেই। কৈশোরে সে আমাকে অবহেলা করেছে। আজ দায়ে পড়ে সখ্যতার ভান করছে, কাজেই ও যখন সারেন্ডারের লজ্জা বরণ করেছে, তখন ওর আবদারটি শোনার মতো ব্রড্নেস আমাদের থাকা উচিত কী বলো? অবশ্যই সেটি যদি আইনসঙ্গত হয়।’ ছাপা বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্তে থাকো আমি আইনসঙ্গত আদেশই দেবো।’
ছাপার আশ্বাস সে পর্যন্তই শেষ। কেননা এর পরে কেসটির ৪-৫ দিন তারিখ বদলালো কিন্তু একদিনও শুনানী হলো না। অবশেষে সেটি পেন্ডিং রেখেই ছাপা বদলী হলো ঢাকায়। ওর স্থানে যোগদান করলো আমার আরেক বন্ধু শাহিদুর রহমান। চট্টলার মিলিটারী একাডেমিতে ট্রেনিংয়ের সময় সে বিকেলের খেলার সময় হাবিলদারদের মতো লম্বা হাফপ্যান্ট পরতো বলে আমরা ওকে ইয়ার্কী করে ‘স্টাফ’ বলে ডাকতাম। সেখানে প্রশিক্ষক হাবিলদারদের ‘স্টাফ’ বলা হয়। ক্ষমতাধর ওই খেতাবটি পেয়ে সে অবশ্য খুশিই ছিল। কেননা মিলিটারি একাডেমিতে দন্ডণ্ডমুন্ডেণ্ডর মালিক এই ইনস্ট্রাক্টর স্টাফরা। বেপরোয়া ক্যাডেটরা পর্যন্ত তাদের দেখে শিশুর মতো শান্ত হয়ে যায়। ট্রেনিং শেষ হলো সেই কবে এরশাদ আমলের শেষের দিকে, কিন্তু শাহিদুরের নামের সাথে ‘স্টাফ’ খেতাবটি রয়েই গেল স্থায়ীভাবে। সেই শাহিদুর ‘স্টাফ’ রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে ‘ছাপার’ স্থানে স্থলাভিষিক্ত হলো। যথারীতি তৃষা বার বার আমার কাছে রিং করতে লাগলো শাহীদুরের কাছেও কেসটির তদবির করার জন্য।
সেদিন সম্ভবত ৩০শে মে। মাসের শেষ। বেতনের তলানীও প্রায় শূন্য। গৃহিনী ঝেড়ে-মুছে বত্রিশ টাকা ছিলো বাজার করতে। বললো, ‘এই শেষ, আর একটি আধুলিও অবশিষ্ট নেই। বেতন না পাওয়া পর্যন্ত তোমার মোবাইল রিচার্জ করাও সম্পূর্ণ বন্ধ। অফিস-আদালত কিছু নেই, ছ-মাস ধরে উনি ওএসডিগিরি করছেন। বাসার টেলিফোনটা পর্যন্ত ডিস্কানেক্ট। ঘরে বসে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো হচ্ছে। মোবাইলে টাকা তোলা আর যার-তার জন্য হ্যালো-হ্যালো করা, এই উনার কাজ। যতোসব উদ্ভট প্রেম-পিরিতী।’ —জানি ছোটো এই অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রটির উপর গিন্নির অনেক রাগ। কিন্তু কথার শেষের খোঁচাটি অদৃশ্য কোন্ কাল্পনিক প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশ্যে তা বুঝতে পারলাম না। যাই হোক, বক্তৃতা লম্বা হওয়ার ভয়ে কোনো প্রতিবাদ না করেই চরম প্রো-একটিভ মানুষের মতো বেরিয়ে পড়লাম। সকালের জগিং শেষে বাজার করা। আধা কেজি আলু, আধা কেজি বেগুন, একশ গ্রাম আদা, পাঁচ টাকার কাঁচামরিচ ইত্যাদি নিরেট গরীবানা সদাই করে ও কিপটের মতো ছ’ টাকা বাঁচালাম। ভাবলাম মোবাইলের ব্যালান্স প্রায় শেষ। তৃষার মামলার চুড়ান্ত শুনানী আজ, সাত সকালেই সে স্মরণ করে দিয়েছে। শহীদুরকে অন্তত বলা দরকার। ফলাফল যা হয় হোক।
দশ টাকার নিচে রিচার্জ করা যায় না। ভাবলাম সপ্তপদী দোকানে ছ’টাকা দিয়ে দু’টাকা মিনিটে তিন মিনিট কথা বলা যাবে। কিন্তু বাসার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই ‘ও-বাবা’ বলে সামনে দাঁড়ালো সেই বুড়িটি, ভিক্ষে করে, কিন্তু চায় না। অন্ততো আমার কাছে। শুধুই জিজ্ঞাসা করে, ‘ভালো আছো বাবা?’ বড়ই স্নেহের সুর। আমার অন্তরটা গলে যায়। কোনোদিন খালি হাতে ফেরত দিই না। কিন্তু আজকে বুড়িকে দেখে একটু বিরক্তই হলাম। তহবিল মবলগে ছ’টাকা, অনেক কাট-ছ।ট করে বাঁচানো। ভাবলাম আজ দেবো না। কিন্তু বুড়ির চোখের দিকে চেয়ে আমার দাদীর কথা মনে হলো। তাঁর স্নেহ, মমতা, আর দরদ যা আমার সমস্ত শৈশবকে ভরপুর করে রেখেছে। চোখের পাতা আদ্র হয়ে এলো। দু’টাকার একটি নোট বুড়ির হাতে দিয়ে দ্রত চলে এলাম। বাসায় এসে মোবাইল খুলে দেখি ৪ টাকা ব্যালান্স আছে। কল দিলাম শাহীদুরের অফিসের ফোনে। ওর ব্যক্তিগত সহকারী বললো, ‘স্যার বাইরে গেছেন পরিদর্শনে, ফিরবেন ১টায়, ৩টায় উঠবেন কোর্টে।
সুতরাং কথা বলা গেলো না। ব্যালান্স দাঁড়াল বাইশ পয়সায়। জোহরের নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে ফেরার পথে ফোনের দোকানে উঠলাম দু’মিনিট কথা বলার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দোকানি বললো, ফোন বন্ধ। সুতরাং বিষন্নবদনে বাসায় এসে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ইত্যাদিতে ভুলেই গেলাম ফোনের কথা। যখন মনে হলো, তখন অফিসের সময় শেষ।
রাতে ফোন এলো তৃষার। ধরলাম না ভয়ে ভয়ে। যদি জিজ্ঞাসা করে, ‘কথা বলেছো?’ —কী উত্তর দেবো? মিথ্যে বলতে পারবো না, কিন্তু সত্যিটা বললেও সে বিশ্বাস করবে না। বলবে আমি ইচ্ছে করেই ফোন করিনি গোঁড়াসততার অজুহাতে। আবার ফোন এলো। কারো স্ত্রীই মেয়েদের সাথে ফোনে কথা বলা পছন্দ করে না। কাজেই সাউন্ড অফ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন প্রাতঃভ্রমণের সময় মোবাইলটি পকেটে নিলাম লুকিয়ে। কেননা এ সময় যন্ত্রটি সাথে নেয়ার বারণ আছে। নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখি গত রাতের বারোটা পর্যন্ত সাতটি মিস্কল, এসেছে তৃষার। নিজেকে বড় অসহায় মনে হলো। কয়েকটি টাকাও যে কতো প্রয়োজনীয় হতে পারে তা বুঝলাম। এক অব্যক্ত বেদনা অনুভব করলাম। বার বার মনে হলো মোবাইলে ব্যালান্স থাকলে এ দুর্ভোগ হতো না। আফসোস্। —চিন্তা করতে করতেই রিং এলো তৃষার। দ্বিধা, সংকোচ আর অপরাধবোধ নিয়ে রিসিভ করলাম। ভাবলাম ও যাই মনে করুক সত্যটা বলতে হবে। নিজেকে শক্ত করলাম। যে কোনো ভর্ৎসনা শোনার জন্য প্রস্তুত হলাম। ‘হ্যালো’— ওপাড়ে তৃষার কণ্ঠ; প্রেয়সীর মতো মোলায়েম, মিষ্টি। এমনটি আশা করিনি। উচ্ছ্বসিত— নিবিড় স্বরে,সে বল্লো, ‘ তোমার তদবিরের জন্য ধন্যবাদ, গতকাল তোমার বন্ধু আমার পক্ষেই রায় দিয়েছেন।’
আমি থ’ হয়ে গেলাম ওর কথা শুনে। খুশীও। ঘাম দিয়ে যেনো জ্বর ছাড়ে। এতো উদ্বেগ আর আশংকার অবসান যে এমনিভাবে হবে তা কল্পনাই করিনি। কিন্তু ওর মোকদ্দমাতে আমি যে মোটেই তদবির করতে পারিনি সে কথাটি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম বার বার। কিন্তু সে মোটেই পাত্তা দিল না আমাকে। বরং খুশীতে আটখানা হয়ে বললো, ‘আমার পদ্মা পাড়ের বাসায় এসো, এখান থেকে ওপাড়ে গৌরাঙ্গের নদীয়া দেখা যায়।’
মো: আবুল কালাম আজাদ, সাবেক যুগ্মসচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ঢাকা।

আরো পড়ুন