৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

স্টোরি অফ ব্রথেলজিক – পর্ব – ০৩

সরদার মেহেদী হাসান

by sondeshbd.com
1K views

 

স্টোরি অফ ব্রথেলজিক – পর্ব – ০৩

 

A Cloud in Trousers by Mayakovsky Vladimir

Each word,

each joke,

which his scorching mouth spews,

jumps like a naked prostitute

From a burning brothel.

 

মায়াকভস্কি ভালাদিমিরের লেখা “আ ক্লাউড ইন ট্রাউজেস”
প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত,
প্রতিটি কৌতুক,
যা তার কাতর মুখ থেকে বের হয়,
একজন নগ্ন প্রস্টিটিউটের মতো লাফালাফি করে
জ্বলন্ত পতিতালয় থেকে।

প্রিয় পাঠক, আপনি কি কখনও পতিতালয়ে গিয়েছেন? পতিতালয় দেখেছেন? পতিতালয় জিনিসটি আসলে কি?

কবির ভাষায় বলতে হয়, পতিতালয় একটি জ্বলন্ত আগুনের চুলা। এই চুলাকে ব্যবহার করে আপনি/আমি রান্নার সুন্দর সুন্দর

ক্রিসপি রেসিপি তৈরি করে পেট পুরে খাচ্ছি, স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে ঢেকুর তুলছি। অন্যদিকে চুলার নীচে পড়ে থাকছে

জ্বলন্ত আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে ছাঁই হওয়া পতিতার শরীর, সমাজের দগদগে ঘা হয়ে।

 

আমাদের সমাজ নামক এই পৃথিবীতে, এই ঘা সৃষ্টির প্রথম সূচনা হয় সুমের (আনুমানিক ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ):

পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রাচীনতম উল্লেখ হয, উরুক শহরে অবস্থিত একটি প্রাচীন উপাসনালয় (যাকে কাকুম বলা হয়) থেকে।

যা দেব-দেবীর ইশতেহারের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত ছিল। এই উপসনালয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর নারী-পুরুষ বাস করতেন,

কিছু সংখ্যক পবিত্র আচার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন এবং

অন্যরা উপাসনালয়ের ভিতরে দর্শনার্থীদের সেবা করতেন অথবা রাস্তায় ক্রেতা খুজে বেড়াতেন।
প্রাচীন গ্রীস( প্রায় ৫৯৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ): এথেনীয় আইন প্রনেতা সোলন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পতিতালয় স্থাপন এবং

নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেখানে মূলত পুরুষদের জন্য খাবার সরবরাহ করা হত

এবং দাসত্বপ্রাপ্ত নারী ও যুবকদের দ্বারা কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হতো।

আসলে ব্রথেল লজিক বা গল্পের ভাষায় ব্রথেলজিক শুরু হয়েছে আনুমানিক ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পূর্ব থেকেই।

 

পৃথিবীর শুরু থেকে আজ অবধি নারীকে সঠিক ভাবে মুল্যায়ণ করা হয়নি,

দেশের প্রয়োজনে, সমাজের প্রয়োজনে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে, পারিবারিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রয়োজন শেষে নিক্ষিপ্ত হয়েছে অন্ধকারের গরম চুলাতে। ধর্ম নারীদের সম্মানীত করলেও,

সমাজের সুবিধাবাদি মানুষেরা সব সময়ই সুযোগ নিয়েছে কিংবা এখনও নিচ্ছে নারীদের বিপথে পরিচালিত করবার জন্য।

আধুনিক যুগ। আমরা সভ্য হতে হতে অতি বেশী অসভ্যতার রাজ্যে প্রবেশ করে ফেলেছি। স্কুল-কলেজ,

বিশ্ববিদ্যারয়, সবখানেই চলে অসভ্যতার কেনা-বেচা। ফেসবুকের মতো বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যম

বা পোর্টালে নারীদের আমরা অর্ধনগ্ন করে উপস্থাপন করে উপার্জনের রাস্তা খুজি। বেশ্যাপল্লীর  নারীরা রং বেরং এর

মেকাপ করে রাস্তায় দাড়িয়ে থেকে নিজেদেওকে তুলে ধরে কাষ্টমারদের সামনে। বয়স্ক নারীরা বয়সের চাপে,

কাষ্টমার ধরে রাখার জন্য হার্ড মেকাপ বা অতিরিক্ত সাজসজ্বায় নিজেদের তুলে ধরে কাষ্টমারদের সামনে।

ঠিক একই কর্মযজ্ঞ চলে বর্তমানে ফেসবুকের মতো রাত-বিরাতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

 

আমি মেয়েটির ঘরে বসে আছি। কথা বলছি মেয়েটির সাথে। গত পর্ব যারা পড়েছেন তারা দেখেছেন মেয়েটি

আমার সাথে যথেষ্ট নোংরা, গালিযুক্ত কথার বৃষ্টিতে আলাপে মেতেছিল। নিষিদ্ধপল্লীর নারীদের মধ্যে একটি বিশেষ স্বভাব লক্ষ্য করা যায়,

অনেক নারীই তাদের কাষ্টমারদের সাথে যথেষ্ট নোংরা ভাষায় কথা বলে থাকে,

এইটাকে বলা যেতে পারে তাদের কথা বলার অভ্যাস। নিষিদ্ধপল্লীর দমবন্ধ হয়ে যাবার মতো পরিবেশে দিনের পর দিন

থাকতে থাকতে, বাড়িওয়ালা বা সর্দানীর গালি-লাত্থি খেতে খেতে, কাষ্টমারদের অভাবনীয় অত্যাচার সহ্য করতে করতে,

তারা অশ্লীলতার রাজ্যে নিজেদেরকে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করতেই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

আমি আমার ভাবনার রাজ্য থেকে বেড়িয়ে মেয়েটির সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হলাম:

তুমি কি সাজগোজ করার সময় পাও?
আমি নিজে সাজার চেয়ে অন্য মেয়েদের সাজিয়ে দেই বেশি।
তাহলে তো তুমি পার্লার দিতে পার!
হ্যাঁ, আমার তো একটা পার্লার আছেই
পার্লার আছে! তাহলে কি তুমি খদ্দের নাও না?
না, খদ্দের নেই না।
আমি অনেকটাই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম: তাহলে চল কেমনে?
আমার একজন বাবু আছে।
বাবু!!!!? বয়স কত!!!?
তোমার মতো।
আমার মতো!!!? আমার মতো বয়স হলে বাবু হয় নাকি???
আরে…চো..বাবু হচ্ছে পার্মানেন্ট খদ্দের, স্বামীও বলতে পারো।

ও.. আচ্ছা। সে কি সব সময় এখানেই থাকে?
না, সে তার নিজ এলাকায় থাকে। ওখানে ওর বউ বাচ্চা আছে। সে গাড়ির ড্রাইভার,

গাড়ি নিয়ে টাঙ্গাইল আসলে দু/এক সপ্তাহ আমার এখানেই থাকে।
তুমি কি তাকে বিয়ে করেছো?
আরে না। শুবুই মৌখিক বিয়ে।
মৌখিক বিয়ে!!! ও কি তোমার খরচপাতি দেয়?
হ্যাঁ দেয়। সে যতদিন আমার কাছে থাকে ততদিন আমি অন্যকোন খদ্দের ঘরে তুলতে পারি না,

সে না থাকলে পারি, সে যাবার সময় মাসের কিছু খরচ আমাকে দিয়ে যায়।
বাচ্চা-কাচ্চা নেওয়ার ইচ্ছা আছে?
ইচ্ছা তো হয়। কিন্তু নোংরা পরিবেশে সন্তান জন্ম দিয়ে কি করব!

ঠিক বলেছো। শুনেছি, আগে তোমরা বাহিরে বেরুলে খালি পায়ে বের হতে , এখন কি সেই নিয়ম আছে?
না সেই নিয়ম নেই, এখন আমরা জুতা পায়ে বাহিরে বের হতে পারি।
খালি পায়ে বাহিরে যাবার রীতি কিভাবে আসল?
কেন? তোমরা ভালো মানুষ, আর আমরা বেশ্যা তাই।
মানে?
মানে, তোমাদের মা/বোনেরা বাহিরে বা মার্কেটে বেরুলে যাতে আমাদের সঙ্গে কেউ মিলিয়ে ফেলতে না পারে।
খালি পায়ে দেখলে যাতে বুঝতে পারে আমরা বেশ্যা, তাই
আচ্ছা আজকে চলি, অন্যদিন আসব।
আচ্ছা তুমি কবে আবার আসবে? আগে জানাও, আমি ফ্রি থাকব, আচ্ছা তুমি কি সাংবাদিক?
না।
তাহলে এত প্রশ্ন করলা ক্যাঁ?
আমি একটি টিভি চ্যানেলে চাকুরি করি, এখানে একটি এনজিওর হয়ে তোমাদের নিয়ে একটা ডকুমেন্টরি বানাতে চাই।
আচ্ছা বন্ধু, যত সহযোগিতা লাগে বইল, আমি করব।
তুমি আমাকে সাহায্য করবে!!!
মেয়েটি: কেন? আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি না?
অবশ্যই পার, কেন পারবে না।
আমি মেয়েটির কথা শুনে যার পর নাই অবাক হলাম। মেয়েটি বলে কি! সে আমাকে সাহায্য করবে! ভাবা যায়!

 

আমি/আমরা সমাজের ভাল মানুষ। আমি কেন একজন বেশ্যার কাছ থেকে সাহায্য নিব? সে ত সমাজের জঘন্য কীট।

এই নোংরা কীটে আমরা থুতু ফেলি, আবার সেই নোংরা থুতুই আয়েশ করে চেঁটে খাই। সকালের সূর্য উঠলেই তাদের প্রতি আমাদের ঘৃণা বেড়ে যায়,

কিন্তু দিনের সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে আমরাও নির্লজ্জের মতো তাদের শরীরে ঢলে পড়ি।

এ্ইটাই পৃথিবী থেকে ব্রথেল শিল্পকে বিতারিত করবার প্রধান অন্তরায়।

আমি মেয়েটির ঘরে অনেকটা সময় বসে গল্প করে তার সময় অপচয় করেছি।

আমি চলে যাবার পর সে রাস্তায় গিয়ে খদ্দের খুজবে। আমি বিষয়টি বুঝতে পেরে

তার হাতে ৫০০শত টাকা দিতে এগিয়ে গেলাম। মেয়েটি না না বলে,কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে বলল:
না না তুমি টাকা দিবে কেন? তুমি ত শুধুই গল্প করেছো, আমি টাকা নিব না বন্ধু
আমি তার বন্ধু ডাকের দোহাই দিয়ে টাকাটা নিতে অনুরোধ করলাম, সে কিছুটা ইতস্তত হয়ে টাকাটা হাতে নিল
আমি ধন্যবাদ বন্ধু বলে চলে আসার জন্য দাড়িয়ে গেলাম। শিউলি নামের মেয়েটিও ঘর থেকে বের হতে হতে বলল:
চল বন্ধু তোমাকে পল্লী ঘুরায়ে দেখাই।
আচ্ছা, চল। (চলবে)

আরো পড়ুন