দূর নক্ষত্র – পর্ব – ০৩
‘আমরা সবাই উঠোনে বসে আছি। বদি পাগলা হাঁপাতে হাঁপাতে গিয়ে বলেআপা,আপা,
ইয়েল তোমারে মুড়ি নিয়ে যেতে বলেছে পুকুরপাড়ে।আমি লজ্জায় মরি!’
ইলার কথা শোনে ওর চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে।মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না।
‘এভাবে ছোটো করার মানে কী?’
নিজেকে সামলে নিয়ে ইয়েল বলে,‘বদি পাগলাকে ওসব কিছু বলিনি।’
‘আমি যেই আসলাম অমনি মুড়ি নিয়ে আসতে বললে। এখন বলছ কিছুই বলোনি?’
‘বিশ্বাস করো। ফান করে বলে থাকতে পারে।’
‘তোমার কাছে সবই ফান।’
‘কী যা-তা বলছ সে তখন থেকে!’
‘যা-তা না হয় বললাম। দেখলাম তো ঠিকই।’
‘কী ঠিক দেখছ?’
‘দুপুর থেকে মাছ ধরা।’
হাসতেহাসতে ইয়েল বলে,‘হ্যাঁ,অনেকদিন পর মাছ ধরতে বসলাম।’
‘মাছ ধরাও হলো, সাথে মেয়েমানুষের ভেজা শরীর দেখাও হলো।’
‘বাজে কথা না বললে হয় না তোমার? কীসব বাজে কথা বলছ!’
‘তুমি বাজে কাজ করবে আর আমি বলতে পারব না? ডিসগাস্টিং!’
‘আমি মেয়েদের ভেজা শরীর দেখার জন্য মাছ ধরতে বসেছি? এসব তোমার মাথায় আসে কী করে?’
‘বদি পাগলা সবার সামনে বলেছে। এসে দেখলাম সব হুবহু মিলে যাচ্ছে।’
‘ওরে পাগলা! কই তুই! তুই আমাকে গ্রামছাড়া করে ছাড়বি।’
‘এখন পালিয়ে যাবে, তাই না?সব পাওয়া হয়ে গেছে।’
‘পালিয়ে যাবার প্রশ্নই আসে না।’
‘এত বছর যাবৎ কোনোকিছুতেই তোমাকে বাধা দিইনি।’
‘বাধা দাওনি সেটা সত্য। তেমনই তোমার ক্ষতিও করিনি সেটাও সত্য।’
‘সবার সামনে যখন তোমাকে নিয়ে বদি পাগলা প্রেজেন্টেশন করে, সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আমার কী যে অবস্থা হয়েছিল তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।’
‘এসব কী বলছইলু? পাগল হয়ে গেলে নাকি?’
‘আমি বলি না, বদি পাগলা বলে। যারে আমি সোনালি যৌবন দান করলাম সে কিনা…।’
রাগে কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে ইয়েল।
‘আমার ইচ্ছে করছে পুকুরে ঝাঁপ দিতে।’
‘তোমাকে ঝাঁপ দিতে হবে না। বরং আমি ঝাঁপদিই পুকুরে। তাহলে তোমার ভালো হবে।’
ইলার বড়ো বোন কাজলা পুকুরপাড়ে এসে দেখে তাদের দুজনার মধ্যে তুমুল বাগবিতণ্ডা চলছে।
কাজলাকে দেখে তারা দুজন মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাজলা বলতে শুরু করে,‘তুমি কখন বাড়ি থেকে বের হয়েছ ইলা! কোনো খোঁজখবর নেই।
ওদিকে দাদি চিন্তায় অস্থির হয়ে আছে।জলদি বাড়ি চলো।ইয়েল, তোমার এ কেমন আক্কেল, অসুস্থ মেয়েটাকে সাথে নিয়ে গ্যাঁজাচ্ছ।
গ্রামের মানুষ আসকারা দিয়ে তোমাকে মাথায় তুলেছে।চলোইলা, বাড়ি চলো।’
তারা চলতে আরম্ভ করে। সেও তাদের সাথে পেছন পেছন চলতে আরম্ভ করে।
কিছুক্ষণ চলার পরে কাজলা থমকে দাঁড়িয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বলে, ‘একদম আসবে না। খবরদার!’
কিছু না বলে ইয়েল ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারা দুজনে বাড়ির দিকে যেতে থাকে।
ইয়েলতাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে চোখের অন্তরালে চলে যায় তারা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। চারিদিক কুয়াশা ঘিরে ধরেছে। সবকিছুই ঝাপসা দেখাতে শুরু করে। কী করবে ভেবে পায় না ইয়েল।
ভেবে ব্যাকুল হয়ে যায়। ভেতর ভেতর অস্থিরতা কাজ করছে। ওর পা আর সামনে চলে না।
মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলে ধপাস করেরাস্তার উপরে বসে পড়ে। সারা শরীর ধুলোয় মেখে পড়ে রইল রাস্তায়।
দুদিন বাকি আছে ইসলামি মাহফিলের। বিভিন্ন জায়গা থেকে মাহফিলে মেহমান আসা শুরু হয়েছে। পালপুর,
ধরমপুর, মালিগাছা, কাজিহাটা, মুলকিডাং, মাথাভাঙা, গোলাই গ্রামের লোকজননিজ নিজ বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিচ্ছে।
যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভিযান চলছে।গ্রামের একদল ছেলেমেয়ে দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে।
সবার ঘরবাড়ি পরিষ্কার কিনা দেখে নিচ্ছে। কোথাও অপরিষ্কার দেখলেই সবাই একসাথে পরিষ্কার করে দিচ্ছে।
ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট ইট-বালি-মাটি দিয়ে মেরামত করে দিচ্ছে। গ্রামগুলো এখন সুন্দর পরিপাটি হয়ে উঠেছে।
কাজ শেষে ছেলেমেয়েরা মিলে চড়ুইভাতি করে। ছেলেরা চাল, ডাল, আলু,পেঁয়াজ, তেল, লবণ, মরিচ, হদুল,
জিরা আর নিজ বাড়ি কিংবা আত্মীয়স্বজনদের মুরগি চুরি করে আনে আর মেয়েরা রান্না করে খাওয়ায়।
কখনও কমতি পড়লে মেয়েরা আঁচলের তলে করে বাড়ি থেকে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ নিয়ে আসে।
প্রতিশুক্রবার রাতে তারা সবাই চড়ুইভাতি করে। রান্না শেষে বালতি ভরে জল নিয়ে আসে।কলাপাতা পেড়ে সবাই খেতে বসেছে।
ইলা এক কোণে বসে আছে। ইয়েল আর ইলার কলাপাতা ফাঁকা পড়ে আছে।
সবাই দেখে মিটিমিটি হাসে আর ভেতরে ভেতরে উপভোগ করে। কেউ কোনো কথা বলে না।
খাওয়া শেষ হলে সবাই চলে যায়,শুধুইলা বসে থাকে।অনেকক্ষণ দুজনেবসে আছে মনমরা হয়ে।
ইলা হঠাৎ করে বুকের ভেতর থেকে একটুকরো কাগজ বের করে আনে। ইয়েলনা দেখার ভান করে বসে থাকে।
ইলা কাগজের টুকরো ছুড়ে দেয় ওর দিকে। কাগজটা তুলে দেখে বড়ো বড়ো অক্ষরে‘সরি’লেখা।
দেখে ছিঁড়ে ফেলে ইয়েল।ইলা আরেকবার কাগজের টুকরো ছুড়ে দেয় ইয়েলের দিকে। ‘সরি’ লেখা নয় এবার,পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে দুই ঠোঁটের চুম্বন।
এবারও সে কিছু বলে না। বারবারকাগজের টুকরো ছুড়ে মারে ইলা। কাগজের টুকরো হাতে তুলে নিয়ে দেখে
তাতে লেখা আছে,‘গত দুই দিন আমার জানালার কাছে আসোনি। আজ অপেক্ষায় থাকব। তোমার ইলু।’
সাদা প্যান্ট আর এক হাতে ফুল অন্য হাতে হাফ হাতা আকাশি শার্ট পরে যেখানে-সেখানে চলে যাওয়া, বিয়েবাড়ির খাবার চুরি করে
এনে বন্ধুরা মিলে খাওয়া, গভীর রাতে মন্দিরের প্রসাদ নিয়ে এসে খেয়ে ফেলা, নিজের কিংবা পরের গাছের ডাব-নারকেল-বরই-কলা
পেড়ে নিয়ে দূরের মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সাথে খাওয়াএসব নিয়ে দিন কাটছে ইয়েলের। বলতে গেলে পরিপূর্ণ বাউন্ডুলে।
সারাক্ষণ ঘুরে বেড়ানোই তার কাজ। দারুণ দুষ্টামির মাস্টার। দাবা, লুডু, ক্যারাম, ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল প্রভৃতি
খেলাধুলায় দুর্দান্ত, আবার প্রতি ক্লাসে ফার্স্ট বয়। এইচএসসি রেজাল্ট হলে দেখা যায় সেখানেও স্টার মার্ক। সবাই অবাক হয় ইয়েলের কাজকর্মে।
অপরদিকে ইলা শান্ত ধীর অসম্ভব সুন্দরী তরুণী। ওর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে পাড়ার ছেলে, বুড়োর দল।
ছিমছাম হালকা গড়ন, কাঁচা হলুদের রং। রসুনের কোয়ার মতো পাতলা শরীরখানা। চুলগুলো পিঠ অবধি চলে আসে।
চোখ দুটো পটলচেরা। নাক বাঁশের বাঁশির মতো খাড়া। চিরল দাঁত। হাতের আঙুলগুলো পাটের খড়ির মতো পাতলা
আর নকগুলো বড়ো করে রাখা। ঠোঁট দুটো জবা ফুলের মতো রক্তিম, টসটসে। কিছু বান্দর প্রকৃতির ছেলে ইলাকে দেখে বলে
যদি আমি বই হতে পারতাম তাহলে বুকেরসাথে লেগে থাকতে পারতাম, যদি সুগন্ধি হতাম তবে ব্যাকুল করে দিতাম।
আরও কত কথা ওদের। তবে ইলাও কম যায় না। সাথে সাথে জবাব দেয়বই না হয়ে ন্যাপকিন হলে বুকের চেয়েও ভালো জায়গায় রেখে দিতাম।
তার কথা শুনে আর কোনোদিন ছেলেগুলো ইলাকে নিয়ে মন্তব্য করতে সাহস করেনি। তারা থেমে থাকেনি, সেটা নিয়ে কাজিহাটার নিমতলায় আড্ডা জমে।
কখনও রাত ১২টার আগে পড়ার টেবিলে বসে না ইয়েল। আজ হঠাৎ করেই এশার নামাজের পরে পড়তে বসে গেছে।
তার মা দেখে অবাক।মা এক গ্লাস দুধ নিয়ে কাছে এসে বলে,‘কী ব্যাপার ইয়েল, আজ এত তাড়াতাড়ি পড়ার টেবিলে?’
‘তেমন কিছু না মা।’
‘কিছু একটা তো হয়েছে।’
‘না মা, তেমন কিছুই না।’
‘আচ্ছা এখন দুধটুকু খেয়ে নে।’
‘খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘খেতে ইচ্ছে করছে না বললে হবে? কদিন পরেই চলে যাবি। তখন কী খাচ্ছিস দেখতে যাবো আমি?’
‘ভাল্লাগে না মা। সবসময় বেশি বেশি করো তুমি। ঠিক আছে, দাও।’
‘ঢাকায় কোথায় উঠবি কিছু ভেবেছিস? কোন কোচিঙে ভর্তি হবি তোর বাবা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছেন।’
‘ওমা, তাই তো! তোমাদের বলা হয়নি,কল্পনা আপা ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে থাকেন। আমরা দুজন প্রথমে ওখানে উঠব।
আপা সব ব্যবস্থা করে দেবেন। মিরপুর থেকে ফার্মগেইটে সহজেই যাওয়া আসা করা যায়।’
‘আচ্ছা। তবে বেশিদিন পরের বাড়িতে থাকা উচিত হবে না। যত দ্রুত সম্ভব কোচিং সেন্টারের কাছাকাছি মেসে ওঠাই ভালো হবে।’
‘আগে তো যাই, তারপর একটা ব্যবস্থা হবে।’
‘আচ্ছা’, বলে ওর মা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
চিন্তায় মশগুল হয়ে পড়ে ইয়েল। মনের ভেতরে শুধু বারবার ভেসে ওঠে ‘আজ রাতে অপেক্ষায় থাকব’।
সেটা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারে না। গত রাতেও যায়নি। সেঅপেক্ষায় থাকবেনা ঘুমিয়ে পড়বে?
কী করবে কিছুই মাথায় আসে না। মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা। ওর কিছুই ভালো লাগে না।
কেন এমন করে ওর জন্য। কেন ওরজন্য মন উতলা হয়ে ওঠে। ঢাকা যাবার আগে সব ব্যবস্থা করে যেতে হবে তাকে।
না হলে সোনার পাখি উড়াল দিতে পারে। মেয়েমানুষ বলে কথা। উঠতি মেয়েরা হলো উঠোনের মুরগির বাচ্চাদের মতো,
যে উঠোনে খাবার পাবে সে উঠোনে দৌড় দেবে। একা ইলা কী করে আগলে রাখবে নিজেকে? (চলবে)

