পৌষের শুরুতেই যেন শীত তার সমস্ত রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে নওগাঁয়। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত চারদিক ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সূর্যের দেখা মেলে খুব কম সময়ের জন্য। হিমেল বাতাসে কাঁপছে জনপদ, কাঁপছে মানুষের জীবনও। এই শীতে সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছেন দিনমজুর, খেটে খাওয়া ও নিম্নআয়ের মানুষরা। যাদের জীবিকা নির্ভর করে প্রতিদিনের কাজের ওপর।
কাকডাকা ভোর। শহরের মুক্তির মোড়, ব্রিজের মোড় কিংবা শিবপুর ব্রিজ বাইপাস এলাকায় জড়ো হয়েছেন কয়েকজন শ্রমজীবী মানুষ। কারও হাতে কোদাল, কারও সঙ্গে মাটি কাটার ঝুঁড়ি। ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাওয়া হাত-পা গরম করতে কেউ কেউ নিঃশ্বাস ছাড়ছেন, কেউ আবার পুরোনো চাদর গায়ে জড়িয়ে অপেক্ষা করছেন কাজের আশায়। কিন্তু সময় গড়ালেও কাজের ডাক আসে না।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) নওগাঁয় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৯৯ শতাংশ। গত কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা ১১ থেকে ১৩ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করছে। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডায় স্বাভাবিক কাজকর্ম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে নির্মাণকাজসহ দিনমজুর নির্ভর অনেক কাজই বন্ধ রয়েছে।
শহরের মুক্তির মোড়ে বসে থাকা সত্তর বছর বয়সী আব্দুস ছাত্তার, চোখে-মুখে ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠার ছাপ। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, মাঝে কিছুদিন শীত কম ছিল, তখন একটু কাজ হইতো। এখন শীত আর বাতাসে বাইরে থাকা যায় না। তারপরও পেটের দায়ে বের হই। সর্দি-কাশি লেগেই থাকে। আমরা তো দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। কাজ না থাকলে ঘরে চুলা জ্বলে না।
একই জায়গায় অপেক্ষায় থাকা সোবহান আলী জানান, তার প্রতিদিনের সংগ্রামের কথা, ভোরে সাইকেল নিয়ে বের হই। কুয়াশায় কিছুই দেখা যায় না। হাত-পা ঠান্ডায় শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু গরিব মানুষ, শীতে ঘরে বসে থাকলে তো না খেয়ে থাকতে হবে। গত দুই দিন ধরে কোনো কাজ পাইনি। এসে এসে আবার বাড়ি ফিরছি।
শিবপুর ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৬২ বছর বয়সী জাহিদুল হক বলেন, আমাদের কাজ সবই রোদ আর আবহাওয়ার ওপর। শীত পড়লেই কাজ কমে যায়। পারিশ্রমিক কম হলেও কাজ পেলে করি। কিন্তু কাজ না পেলে বাড়ি ফিরে বসে থাকা ছাড়া উপায় নাই।”
শুধু কাজের সংকট নয়, শীতজনিত রোগও ভোগাচ্ছে এসব শ্রমজীবী মানুষকে। সর্দি-কাশি, জ্বর, শরীর ব্যথা যেন নিত্যসঙ্গী। অনেকেরই নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র কিংবা গরম কাপড়। ফলে শীতের এই মৌসুমে জীবনের সঙ্গে লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
হাড় কাঁপানো এই শীতে নওগাঁর নিম্নআয়ের মানুষ প্রতিদিন লড়ছেন দু’টি শত্রুর সঙ্গে একদিকে প্রকৃতির নির্মমতা, অন্যদিকে কাজহীনতার যন্ত্রণা। শীত কবে কাটবে, কাজ কবে মিলবে—এই প্রশ্নের উত্তর নেই তাদের কাছে। শুধু আছে বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা।
রিফাত হোসাইন সবুজ
নওগাঁ

