ফাতেমা আজ তিনি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয়ের মানুষ। কোনো মামলার আসামি ছিলেন না, তবু ভালোবাসার টানে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছিলেন তিনি। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছায়াসঙ্গী ছিলেন এই সাধারণ নারী। গৃহকর্মীর পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অসাধারণ আত্মত্যাগের গল্প।
কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ হোক কিংবা নিজ বাসভবনের নিঃসঙ্গ গৃহবন্দী জীবন,প্রতিটি কঠিন অধ্যায়ে তিনি ছিলেন পাশে। করোনাকালীন মৃত্যুভয়ের দিনগুলোতেও হাসপাতালের একই কেবিনে, নিঃশব্দ পাহারার মতো, নিঃস্বার্থ সঙ্গী হয়ে থেকেছেন ফাতেমা বেগম। সুখ-দুঃখ, অসুস্থতা-নিঃসঙ্গতা—সব মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি ছিল অবিচল, প্রশ্নহীন, নিখাদ।
ফাতেমা বেগমের গ্রামের বাড়ি ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। রফিকুল ইসলাম ও মালেকা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়।
একই ইউনিয়নের কৃষক মো. হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ের পর তাঁদের সংসারে আসে মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও ছেলে মো. রিফাত। মেঘনা নদীর চরে কৃষিকাজ করেই চলত সংসার। ছেলের বয়স তখন মাত্র দুই বছর। ২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান তাঁর স্বামী। স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছোট সন্তান নিয়ে দুঃখের মধ্যে পড়েন ফাতেমা।
পরিবারের হাল ধরতে সন্তানদের নিয়ে ফিরে যান বাবা–মায়ের কাছে। মুদি দোকানি বাবার আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সন্তানদের গ্রামের বাড়িতে রেখে ২০০৯ সালে কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন ফাতেমা।
ঢাকায় আসার পর পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে ওই বছরই বেগম খালেদা জিয়ার গৃহকর্মী হিসেবে কাজের সুযোগ পান ফাতেমা। তখন থেকেই যেখানে খালেদা জিয়া, সেখানেই ফাতেমা। প্রতিকূল–অনুকূল সব পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনে ছিলেন অবিচল।
পৃথিবীতে ভালোবাসার রূপ যে কত বিচিত্র, কত গভীর হতে পারে ফাতেমা বেগম তা প্রমাণ করলেন। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরিমাপ হয়না।। ক্ষমতা বা প্রতিদানের আশায় নয়, নিছক ভালোবাসা আর কর্তব্যবোধ থেকে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তাঁর এই নিঃশর্ত ভালোবাসা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রিফাত হোসাইন সবুজ
গণমাধ্যম কর্মী

