বাংলাদেশের দুটি নক্ষত্রের বিদায়

সরদার মেহেদী হাসান

by sondeshbd.com
112 views

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০শে মে গভীর রাতে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে দাফন করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে যেখানে প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ সমবেত হয়।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬ – ৩০ মে ১৯৮১)। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অষ্টম রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন সেনাপ্রধান এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাঙালি জনগণের উপর আক্রমণ করার পর তিনি তার পাকিস্তানি অধিনায়ককে বন্দি করে বিদ্রোহ করেন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে ১৯৭১ সালের ২৭শে মার্চ তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার একটি বিবৃতি পাঠ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এদেশে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব প্রদান করে তা জনপ্রিয় করে তোলেন। বাংলাদেশে বহু সংখ্যক, বিভিন্ন ধরনের, মতের ও ধর্মের জাতিগোষ্ঠী বাস করে। তাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার মাত্রা ও ধরন একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই তিনি মনে করেন, ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, ভূখণ্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত। তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ঐক্য ও সংহতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এই ধারণা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ শক্তিশালী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালান।

বহুদলীয় গণতন্ত্র, নির্বাচন ব্যবস্থা পুনর্বহাল এবং অবাধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ প্রদানের লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান যত দ্রুত সম্ভব রাজনীতির গণতন্ত্রায়ণে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগের আমলে নিষিদ্ধঘোষিত রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এইভাবে, তিনি সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন, সংবাদপত্রের মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান করেন। ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে প্রধান করে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) প্রতিষ্ঠা করেন। ছয়টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে তিনি ৭৬.৬৭% ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং রাষ্ট্রপতির পদে নিয়োজিত থাকেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া এই দলের চেয়ারপারসন।

বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়া গত প্রায় চার দশক ধরে কাজ করে গেছেন। হয়েছেন লক্ষ-কোটি বাংলার ‘দেশনেত্রী’, গনতন্ত্রের প্রশ্নে ‘আপসহীন’ নেত্রী, হয়েছেন গণতন্ত্রের “মা” আপোষহীন কন্ঠস্বর।

আজ ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তির প্রস্থান, আরেকটি নক্ষত্রের পতন। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের লক্ষ-কোটি মানুষেরে হৃদয়ে পাহাড় সমান শোকের ভার চাপিয়ে, মহান আল্লাহর জান্নাতের মেহমান হিসাবে চিরবিদায় নিয়েছেন তাঁর প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।

বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর সহধর্মীনি দেশনেত্রী, আপসহীন ও গণতন্ত্রের “মা” বেগম খালেদা জিয়ার মতো দুটি নক্ষত্রের বিদায়, দেশ ও জাতির কল্যাণে তাঁদের অবদানকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দান করুন, আমীন। সেই সাথে, সমগ্র বাঙ্গালী জাতি তাঁর অবদানকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সাথে আজীবন স্মরণ করবে।

আরো পড়ুন