তীব্র শৈত্যপ্রবাহে জনজীবনের কষ্ট ও উৎসব ঐতিহ্যের মেলবন্ধন

তাহির ইবনে মোহাম্মাদ

by sondeshbd.com
63 views

উত্তর জনপদের আকাশ এখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। সমগ্র দেশের মানুষদের মতো উত্তর জনপদের মানুষদের জীবনকে কঠিন এক লড়াই এর মধ্যে চেপে ধরেছে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের জীবনযুদ্ধ।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় নদী বেষ্টিত গ্রাম্য এলাকাগুলোতে শীতের তীব্রতা প্রকটভাবে জেঁকে বসেছে। তেমনি একটি নদীর নাম ছোট যমুনা নদী। ছোট যমুনা নদীর পাড় ঘেঁষে বয়ে যাওয়া হিমেল হাওয়ায় নওগাঁর বদলগাছীতে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত।

প্রকৃতি যখন শুভ্র চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে, তখন এই জনপদের মানুষের জীবনে বইছে দুই রকমের হাওয়া— একদিকে জবুথবু কষ্টের হাহাকার, অন্যদিকে নতুন ধান কেটে ঘরে তোলার আনন্দ আর ঐতিহ্যের উৎসব।

শীতের বয়স্ক ও শ্রমজীবীর মানুষের দুর্ভোগ ও হাহাকার
তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বদলগাছীর প্রবীণ ও বয়স্ক মানুষজন। অনেক অসহায় বৃদ্ধকে দেখা যায় খড়কুটো জ্বালিয়ে একটু উষ্ণতা পাওয়ার আশায় আগুনের কুণ্ডলীর পাশে বসে থাকতে।

একই অবস্থা বদলগাছী উপজেলা বাসীদের মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষদেও জীবনেও। কাঁকডাকা ভোরে যখন সাধারণ মানুষ লেপের নিচে উষ্ণতা খোঁজে, তখন পেট চালানোর দায়ে রিকশা ও অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হতে হয় চালকদের।

কৃষকরা ধানের চারা তৈরির জন্য তীব্র ঠান্ডা কাঁদা পানিতে নেমে কাজ করে, কনকনে ঠান্ডায় রিকশার হ্যান্ডেল ধরা যেন দায় হয়ে পড়েছে চালকদের। শ্রমজীবী মানুষের আয় যেমন কমেছে, তেমনি বেড়েছে শীতজনিত রোগব্যাধির ভোগান্তি।

শীতের এই তীব্রতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না গৃহপালিত পশু ও পথের প্রাণীরাও। বদলগাছীর গ্রামগুলোতে দেখা যায়, তীব্র ঠান্ডায় গরু-ছাগলগুলো কুঁকড়ে আছে। অনেক কৃষক পাটের চট বা পুরনো কাপড় দিয়ে গবাদি পশুর শরীর ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। রাতের বেলা রাস্তার মোড়ে মোড়ে কুকুরদের দলবদ্ধ হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। মুখে ভাষা নেই বলে এই অবলা প্রাণীদের কষ্ট আরও বেশি হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে।

শীতের সাহায্য মানুষের জন্য মানুষ করলেও এসব অবলা পথের প্রানীর জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। দয়াশীল মানুষদেরকে কারোই এই অবলা পথের প্রানীর জন্য ভাবতে দেখছিনা। এমন কি সরকারি প্রানীসম্পদ দপ্তর থেকেও কোন ব্যবস্থা নেই। থাকলে নিজেদেরকে মানুষ মনে করতাম।

সন্ধ্যা নামলেই বদলগাছীর পুরাতন ব্রিজে মোড়ে আসে প্রাণের স্পন্দন।
দিনের বেলা শীতের দাপট থাকলেও সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে বদলগাছী পুরাতন ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয় ভিন্ন এক আমেজ। কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় ব্রিজের পাশে পিঠার দোকান। সেখানে মাটির চুলার ধোঁয়া আর গরম পিঠার সুবাস চারপাশ মাতিয়ে রাখে। সবচেয়ে বেশি ভিড় জমে কালাইয়ের রুটি আর চিতই পিঠার দোকানে। ঝাল ঝাল বেগুনের ভর্তা কিংবা ধনেপাতা বাটা দিয়ে গরম গরম কালাইয়ের রুটি যেন এই শীতের পরম পাওয়া।

বদলগাছী সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। এবার শীতকালীন সবজির ফলন হয়েছে চমৎকার। স্থানীয় পাইকারী ও খুচরা বাজারে সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরেছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম ও মুলাসহ প্রায় সব ধরণের সবজি এখন সাধারণ ক্রেতাদের হাতের নাগালে ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে, কৃষকদের মুখেও ফুটেছে হাসির ঝিলিক। এ বছর আতপ ধানের ভালো মূল্য পাওয়ায় তারা বেশ খুশি। ধান মাড়াইয়ের পর এবার খড়ের চড়া দাম কৃষকদের জন্য বাড়তি আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসলের ন্যায্য মূল্য আর খড় বিক্রির টাকা তীব্র শীতের কষ্টের মাঝেও কৃষকদের মনে আনন্দের খোরাক জোগাচ্ছে।

শীত মানেই বদলগাছীর গ্রামগুলোতে গাছিদের ব্যস্ততা। ভোরে হাঁড়ি ভর্তি মিষ্টি খেজুরের রস নামানোর দৃশ্য এখন চোখে পড়ে।

থানার ভান্ডারপুর থেকে মিঠাপুর যাবার রাস্তায় সারি সারি খেজুর গাছে গাছী রসের হাড়ি লাগায় সন্ধ্যায়। সকালে সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুগন্ধি গুড় ও পাটালি।

ঘরে ঘরে আতপ চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভাপা, পুলি আর দুধে ভেজানো চিতই পিঠা। গ্রামের মেঠোপথে হাঁটলে বাড়ির আঙিনা থেকে ভেসে আসা নতুন চালের পিঠার ঘ্রাণ বুঝিয়ে দেয় উত্তরবঙ্গের শীতের আসল রূপ।

বদলগাছীর শীত মানেই কষ্টের মাঝেও একটুখানি সুখের পরশ। একদিকে যেমন বিত্তহীন মানুষ ও প্রাণীকূলের জন্য প্রয়োজন মানবিক সহমর্মিতা, অন্যদিকে তেমনি সস্তায় টাটকা সবজি আর পিঠাপুলির চিরচেনা ঐতিহ্য এই জনপদকে করে তোলে অনন্য। কুয়াশা কেটে গিয়ে সোনালী রোদ উঠবে, আর এই বৈচিত্র‍্যময় জীবনধারা বজায় থাকবে— এটাই বদলগাছীবাসীর মতো সমগ্র দেশবাসীর প্রত্যাশা।

 

 

আরো পড়ুন