দূর নক্ষত্র, পর্ব-০৬

ইসমাইল হোসেন ইসমী

by sondeshbd.com
60 views

প্রথম সকালে ইয়েল ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় এসেই নীলক্ষেত থেকে বিভিন্ন রকমের গাইড কিনে পড়ালেখা শুরু করে। চাকরির পত্রিকা নিয়ে শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন খুঁজে খুঁজে চাকরির জন্য আবেদন করে। পাশাপাশি কিছু কোম্পনিতে সিভি ড্রফ করে আসে। এরমধ্যে কয়েকটা চাকরির পরীক্ষা দিয়েছে। দুই-তিনটাতে ভাইভা দিয়েছে। এভাবে ছয়-সাত মাস পার হয়ে যায়। আগামী সপ্তাহে বিসিএস পরীক্ষাও আছে। সেটা নিয়েও বেশ সিরিয়াস। রাত ১২টার মধ্যে ঘুমিয়ে আবার ভোর ৪টায় উঠে পড়ে। শুধু পড়া আর পড়া, এর বাইরে কোনো কাজ নেই।

সাত মাস পরে ইয়েলের চাকরি হয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে। তিন মাস পরে পানি উন্নয়ন বোর্র্ডে। যাকে বলে সরকারি খাসা চাকরি। প্রতিদিন অফিসে যায় বিকালে ফেরে। আবার কখনও অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে অফিসে। দেশে বন্যা হলেই তখন তাদের কাজের চাপ বেড়ে যায়। চলে যাচ্ছিল দিন মাস বছর। অফিসে ওর সুনামও বেড়ে যায় খুব জলদি, সরল পথে চলার কারণে।

বাধ সাধে হাওড়ের বাঁধের নকশা নিয়ে। নকশায় দশ ফুট বাঁধ দশ ফুটই করতে হবে বলে ঠিকাদারকে।ঠিকাদার শোনে না ওর কথা। দশটা ব্রিজের ডিজাইন অনুমোদন করা আছে। একটা ব্রিজ করে বাকি নয়টা কালভার্ট করে বিল সাবমিট করে। আবার ঠিকাদার সাতফুটবাঁধ করবে আর তিন ফুটের অর্থ আত্মসাৎ করবে।তা না হলে উপরওয়ালাদের খরচ মেটাতে পারবে না বলে ঠিকাদার।

ইয়েল বলে, সাতফুট বাঁধের কারণে উজানের পানি এসে হাওড়ে ঢুকবে। ক্ষয়ক্ষতি হবে প্রচুর। কৃষক বাঁচবে না। বিশাল হাওড় এলাকায় পানি জমে থাকবে।
ঠিকাদার উপরওয়ালাদের সাথে যোগসাজস করে সাত ফুট করে বাঁধের বিল সাবমিট করে। সাতফুটের বিল পরিশোধের অনুমোদনের জন্য পাঠায় ইয়েল। ঠিকাদার লেগে যায় ওর সাথে।ঠিকাদার হুমকি দিয়ে তাকে দেখে নেবে বলে। রাতে অফিস থেকে বাসায় যাওয়ার পথে লোক দিয়ে শাসায়। কাজ না করে বিল দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। অফিসের বসরা ঠিকাদারের মত অনুযায়ী কাজ করার চাপ দেয়। সে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।

এভাবে চলতে থাকে কয়েক দিন। এক দিন অফিস থেকে বের হতে বেশ রাত হয়ে যায়। অফিস থেকে বের হয়েছে এমন সময় ঠিকাদারের লোকরা ইয়েলের উপর চড়াও হয়। তাকে বেধড়ক পিটিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখে। তারপর ওর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফেরার পর সে নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করে।

ডিউটিরত নার্স ‘আলভি ম্যাডাম’ বলতে বলতে রুম থেকে বের হয়ে যান। ইয়েল বুঝল ডাক্তারের নাম আলভি। আলভি বলে,‘যাক,আমাদের বাঁচালেন। আমরা আপনার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আজ পাঁচ দিন পর আপনার জ্ঞান ফিরেছে। মাথা ও পায়ে প্রচণ্ড আঘাত নিয়ে আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন আপনার সহকর্মীরা। ওরা না থাকলে আপনাকে হয়তো মেরেই ফেলত। এরই মধ্যে হাসপাতালের বড়ো ডাক্তাররা এসে আপনাকে দেখে গেছেন।’
ডিউডিরত নার্স বলে,‘আলভি ম্যাডামের নিবিড় পরিচর্যা না থাকলে আপনাকে বাঁচানোই অসম্ভব হয়ে যেত।’
ইয়েলের অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হতে থাকে। এখন উন্নতির দিকে। সবার মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। হাসপাতালেআলভি আজ গোলাপ নিয়ে ওর কেবিনে আসে। এসেই জিজ্ঞাসা করে, ‘কেমন আছেন আপনি?’
এ সময় বিছানা ছেড়ে ইয়েল উঠে বলে,‘এত সকালে আপনি?’
আলভি বলে,‘আজ একটু আগে ঘুম ভেঙে গেছে। আমি সাধারণত এত সকালে ঘুম থেকে উঠি না। আজ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তাই চলে আসলাম।’
‘ভালো করছেন।’
‘আপনার অবস্থা কেমন?’
‘আগের চেয়ে ভালো। তবে বাম পায়ে ভর দিতে পারছি না।’
‘একটু সময় লাগবে। এক সপ্তাহ পরে এ ব্যথা থাকবে না।’
‘কবে রিলিজ দেবেন?’

‘আরেকটু সময় লাগবে। শুনুন, আমাকে ডিউডিতে যেতে হবে। সময় পেলে আরেকবার দেখা করে যাবো। ঔষধগুলো ঠিকমতো খাবেন। ভয়ের কিছু নেই। নার্সকে বলে দেবো টেক কেয়ার করতে।’
‘আপনি যেটা ভালো মনে করেন। আমার ঢাকা শহরে আত্মীয়স্বজন তেমন কেউ নেই।’
‘নেই তো কী হয়েছে? আমরা আছি। আপনার পাশে জনগণ রয়েছে। সাহস হারাবেন না।’
কথা বলতেবলতে ইয়েলের চোখজুড়ে ঘুমের ভাব চলে আসে।আলভি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ওর কেবিন থেকে বের হয়ে এসে নিজের রুমে ঢোকে। নিজেকে আলভি এক নজর দেখে নেয়। এবার অ্যাপ্রোন পরে গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে ডিউটিতে চলে যায়।

সময় অতি দ্রুত অতিক্রম করে। অল্প সময়ে কত না ঘটনা ঘটে যায়। কতগুলো জানা আর কতগুলো অজানা রয়ে যায়। কিন্তু তার রেশ থেকে যায় আজীবন। এভাবেই চলে প্রতিনিয়ত। চলার মধ্যে কোথাও উঁচু অথবা নিচু। কোথাও মৃসণ, কোথাও বন্ধুর। এর মধ্যেই জীবনের প্রবাহ। চলার পথে কত মানুষের দেখা পাওয়া যায়। প্রতিটি মানুষের কর্ম-চিন্তা-চেতনা ভিন্নরকমের। আলভি হলো তার ব্যতিক্রম। প্রতিটি কাজকে নিজের হৃদয় থেকে বিবেচনা করে সে। হাসপাতলের কোনোকিছু হলে সবাই ছুটে যায় ডাক্তার আলভির কাছে। কোনো ডাক্তার না এলে তার সাব-ডিউটি করে ডাক্তার আলভি। কোনো ডাক্তার জ্যামে পড়ে আটকে গেলে বা কেউছুটিতে গেলে হাজির ডাক্তার আলভি। সমস্ত হাসপাতাল ডাক্তার আলভিময়। এ কারণে কত কথা যে পরিবার থেকে শুনতে হয়েছে! এমনকি আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বিশেষ করে প্রফেসর সিলভি অযাচিত হয়ে কথা বলে থাকে। তবুও ওসবে কান না দিয়ে আলভি কাজ করে যায়। এটাই তার পরিতৃপ্তি, আনন্দ, সুখ।

ভোরের আলো ফুটবে ফুটবে এমন সময়ে চলে আসে ডাক্তার আলভি। বেশ কয়েকদিন যাবৎ ডিউটির আগে এসে ইয়েলের খোঁজখবর নিয়ে পরে অন্য ডিউটিতে যায়। ইয়েল বেডে শুয়ে আছে। আলভি দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। রুমে ঢুকবে কি না ভেবে নেয় একটু।ভাবতেই বলে ফেলে,‘ভেতরে আসতে পারি?’
ইয়েল বলে,‘আসুন।’
আলভি ঢুকে ওর বেডের দিকে এগিয়ে যায়।
ইয়েল জিজ্ঞাসাকরে,‘হঠাৎ অনুমতির প্রয়োজন হলো কেন?’
‘অসময়ে এসে পড়েছি তাই।’
‘ডাক্তারদের সময়-অসময়ে বলতে কিছু নেই। মন চাইলে চলে আসবেন।’
‘বা রে! ডাক্তার হলেই কি যখন-তখন আসা যায়?’
‘ডাক্তার রোগীর কাছে আসবে, এটাই জানতাম।’
‘ডাক্তার আসবে ঠিক আছে, তবে শিডিউল অনুযায়ী।’
‘তা ঠিক বলেছেন। কিন্তু শিডিউলের বাইরেও আসা যায়।’
‘ওসব বাদ দেন। এখন বলেন, কেমন আছেন?’
ইয়েলবলে,‘বেটার অ্যান্ড বেটার।’
‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?’
‘জি, অব্যশই পারেন। বলুন কী জানতে চান?’
‘না তেমন কিছু না। কয়েকদিন ধরেই একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।’
‘বলে ফেলুন। পেটের ভেতরে কথা জমিয়ে রাখতে নেই।’
আলভি বলে,‘আপনার আহত হবার ঘটনাটা আমি আপনার সহকর্মীদের মুখে শুনেছি। আপনার মতো নিঃস্বার্থ মানুষকে সেবা দিতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। কেউ যদি সত্যিকারের মানুষ হতে চায় তবে আপনার মতো যেন হয়।যে নিজের স্বার্থত্যাগ করতে পারে সে-ই তো আসল মানুষ; তাই না? আপনার বেদিমূলে আমি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্যনিবেদন করলাম। পৃথিবীতে আজ যত ফুল ফুটেছে সব ফুলের সৌরভ আপনার জন্য। শুধু আপনার জন্য, আর কারও জন্য নয়।’

‘হয়েছে! হয়েছে! আর বলবেন না প্লিজ। আপনি এতক্ষণ যা বললেন আমি তার যোগ্য নই। অনেকেই দেশের জন্য করে। কারওটা প্রকাশ পায় আবার কারওটা প্রকাশ পায় না।’
‘সবাই দেশের জন্য করে না। সবাই নিজের জন্য করে বেশি।এক-একজনের এক-একরকমের পয়েন্ট অব অবজারভেশন আছে।রসুনের খোসার মতো একটা একটা করে খুলতে থাকলে অবশেষে কিছুই থাকে না। আপনার স্বার্থটাকে রসুনের খোসার মতোখুলে ফেলেছেন। সব মানুষ সবকিছু করতে পারে না। এক-এক মানুষ এক-এক কাজে স্পেশালিস্ট। খোদা নির্ধারণ করে রেখেছেন কাকে দিয়ে কখন কোন কাজ করিয়ে নেবেন। আমরা কেউ সেটা জানি না।’

‘আপনার কথায় যুক্তি আছে।আপনাকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি।’
‘কেন? আমাকে দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
‘আমরা মনে করি সব ডাক্তার কসাই।আসলে কি তাই?আপনাকে দেখে মনে হলো, এখনও কিছু ভালো ডাক্তার আমাদের দেশে আছে।’
‘আমি কী করেছি জানি না। তবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র।’
এ দায়িত্ববোধটুকু অনেকে মানতে চান না। সবাই দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চায়। সবাই যদি আপনার মতো দায়িত্বসচেতন হতো আমাদের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা আরও ভালো হত।’
এমন সময়ে দারোয়ান এসে বলে,‘সিলভি ম্যাডাম অনেকক্ষণ ধরে আপনার রুমে বসে আছেন।’
আলভি বলে,‘সরি,অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখন যেতে হবে। আপনি ঠিকমতোঔষধগুলো খেয়ে নেবেন। সময় পেলে আরেকবার এসে দেখা করে যাবো।’

আলভি কেবিন থেকে বের হয়ে নিজের রুমের দিকে যায়। রুমে গিয়ে দেখে প্রফেসর সিলভি বসে আছে। টেবিলের উপর পেপারকাটিংগুলো মনযোগ সহকারে পড়ে যাচ্ছে।
‘অনেকক্ষণ তোকে বসিয়ে রেখেছি। সরি।’
সিলভি কিছুই বলে না। সে এক মনে আলভির দিকে চেয়ে আছে।
আলভি আবার বলে,‘কী রে কী হলো?’
সিলভি বলে ওঠে,‘তোকে কেমন যেন লাগছে।’
আলভি বলে,‘এর মানে কী?’
সিলভি বলে, ‘মানে তো তুই জানিস।’
আলভি বেল, ‘তোর কথার আগামাথা নাই,বুঝলি?’
সিলভি বলে,‘দারোয়ান বলল একজন আধমরা রোগীর দায়িত্ব তোর কাঁধে এসে পড়েছে।’
‘ওহ! ইয়েলের কথা বলছিস?হ্যাঁ, সেরকম বলতে পারিস। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছে।তার জন্য আমার উপর দিয়ে গত কয়েকদিন বেশ বাজে অবস্থা গেছেরে দোস্ত।’
সিলভি বলে,‘দারোয়ান আরও কত কিছু বলল। লোকটা নাকি ঠিকাদারের অনিয়ম মেনে বিল দেয়নি বলে মেরে এরকম হাল করেছে। তুই যে একটা ভালো মানুষের জন্য কিছু করতে পেরেছিস, এটাই বা কয়জনে করতে পারে।’
আলভি বলে,‘রাখ ওসব। তোর খবর কী সেটা বল।’
‘কোন বিষয়ে জানতে চাস?’
‘তোর ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেটার খবর বল।’
ওর কথা শুনে আলভি মুখ নিচু করে নেয়।
আলভি বলে,‘কী রে লজ্জা পেলি নাকি?’
সিলভি বলে,‘লজ্জা কেন পাবো? তোর এখন বলার সময়। বল। আমার কী করার আছে?’
আলভি বলে,‘শোন, অসম প্রেম হলেও ভালো। আজকাল ওরকম অনেক হচ্ছে। কয়েকদিন আগে আমার এক কলিগের ছেলেটা একত্রিশ আর মেয়েটা বিয়াল্লিশ বয়সে নিজেরাই পচ্ছন্দ করে বিয়ে করল। ছেলেরা যদি ছাত্রীকে বিয়ে করতে পারে তাহলে মেয়েরা ছাত্রকে বিয়ে করতে পারবে নাকেন? এখন যুগ বদলে গেছে।কী যেন তোর ছাত্রের নাম? কারু না কাবু!’

সিলভি বলে,‘কী যা-তা বলছিস! কারুও না কাবুও না।’ সিলভি একটু হেসে বলে,‘ওর নাম কাব্য।’
আলভি বলে, ‘তোকে নিয়ে বেশ কাব্যটাব্য লিখছে, তাই না রে?’
‘কাব্য না ছাই।’
‘বলিস কী!’
‘যা সত্যি তাই বললাম।’
‘কী হয়েছে আগে সেটা বল।’
‘ভালো না রে।’
আলভি বলে,‘তুই যে বলেছিলিছেলেটাকে যা বলিস তাই শোনে। আবার কী হলো তোদের?’
‘আর বলিস না। কর্ড ছাড়া গিটার আমি।’
আলভি বলে,‘কিছু হয়েছে? খুলে বল তো।’

সিলভি বলে,‘কাব্য গিটার কিনতে চাইল, কিনে দিলাম। সেমিস্টার ভর্তির হওয়ার টাকা ছিল না, টাকা দিলাম। মেসের বিল তিন মাসের বকেয়া ছিল, পরিশোধ করে দিলাম। বই কেনার টাকা ছিল না, দিলাম। যখনই দিলাম তখনই দুই-তিন দিন খোঁজ নেই। পরে জানতে পারলাম টানবাজার গিয়েছিল। মেজাজ হলো চড়া। দেখা হওয়ার পরে জানতে চাইলাম, কোথায় গিয়েছিলে?হারামির বাচ্চা বলে কিনা,বাড়ি গিয়েছিলাম।তখনই মুখ থেকে বের হয়ে গেছে,খুপরি ঘরে তোর মা থাকে? আর সেই মায়ের সাথে রাত কাটিয়ে ফিরে আসলি? ফকিন্নির বাচ্চা!তোরে মানুষ করতে চাইলাম, মানুষ হইলি না।’

আলভি বলে ওঠে, ‘সে হয়তো সত্যিসত্যি বাড়ি গিয়েছিল। তার বন্ধুরা তোকে ভুল বুঝিয়েছে। কিছু বন্ধু এমন হয়ে থাকে। সামনে বন্ধু আর পেছেনেপাছায় কাঠি দিতে ছাড়ে না। এরকম বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো।’
সিলভি রেগে বলে,‘তুই ডাক্তার আর আমি প্রফেসর। এসব বুঝ আমারে দিস না।’
‘ঠিক আছে, মানলাম তোর কথা। তারপরওকথা থেকে যায় সিলভি।’
সিলভি উত্তেজিত হয়ে বলে,‘জানতে চাস কাব্য কী করেছে?’
আলভি বলে,‘বাচ্চা ছেলে কাব্য। কী এমন করতে পারে?’
‘সে বাচ্চা ছেলে নয় রে। অনেক বড়ো হয়ে গেছে।’
আলভি বলে,‘কী করেছে, খুলে বল আমাকে। খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।’
সিলভি বলে, ‘কাব্য খুলনা থেকে এসে আমার রুমে ব্যাগ রেখে ক্লাসে চলে যায়।আমি ফাইল খুঁজতে গিয়ে ব্যাগটা টেবিল থেকে নিচে পড়ে যায়। ব্যাগটি তুলতে গিয়ে দেখি একদম হালকা। চেন খুলে দেখি ব্যাগের ভেতর গামছা, শার্ট আর তার সাথে কনডমের প্যাকেট। বুঝতে পারছিস কোথায় গিয়েছিল?মায়ের কাছে না ললনাদের কাছে।চোখে সর্ষের ফুল দেখলাম আমি। বসে পড়লাম ধপাস করে। আমার মনে হলো গাছেরটাও খাবে আবার তলারটাও কুড়াবে। আর কোনোদিন কোনোফকিন্নির বাচ্চাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবো না।’
‘হয়েছে, এবার বুঝতে পেরেছি। এজন্য সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে এসব কাজে জড়ানো ভালো। না হলে পরে পস্তাতে হয়। হুটহাট করে কোনোকিছু না করাই ভালো।’
সিলভি গলার স্বর হালকা করে বলে,‘আমি আসলে এতদিন স্টাডি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। চাকরি পেয়ে মনে হলো,যাক বাবা বাঁচা গেল। কত ভালো ছেলেদের বিয়েরপ্রপোজ আসত। সব ফিরিয়ে দিয়েছি।’
‘কাব্যকেও ফিরিয়ে দিতে পারতিস। ফিরালি না কেন?’
‘দিতে চেয়েছিলাম, পারিনি।আমার সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে হৃদয়কুঠিরে প্রবেশ করে সে। কাব্যের কণ্ঠে যে গান শুনবে সে-ই তন্ময় হয়ে যাবে। আমিও নিজেকে ঠিক ধরে রাখতে পারিনি।’
‘কাব্যের গান শোনার জন্যই তাহলে গিটার কিনে দিয়েছিলি?’
‘হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। তাকে বড়ো শিল্পী করতে চেয়েছিলাম।’
‘ওহ! তাই বুঝি?’
এমন সময়ে দারোয়ান হাফিজ দুই কাপ চা দিয়ে যায়।দুজনে চা পান করতে করতে সিলভি বলে ওঠে, ‘তোর তো আজ ডিউটি নেই। তবুও আসলি যে আজ?’
‘হঠাৎ মনটা কেমন হয়ে গেল। ভাবলাম যাই, তাই চলে আসলাম।
কাব্যের প্রসঙ্গ ধরে আবার বলে, ‘একটা কথা মনে রাখিস সিলভি। হৃদয় যা বলে তা-ই করিস, তবে অন্যায়টা ছাড়া।’
সিলভি বলে,‘তুই বলছিস ন্যায়নীতির কথা। আমার মন বলছে তাকে বুুড়িগঙ্গায় কিছুক্ষণের জন্য ডুবিয়ে রাখি। আমার হৃদয় বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।ওই হারামির বাচ্চাটা আমার হৃদয়টা একেবারে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।’
‘এ বয়সে ছেলেরা এমনই হয়। প্রেমিকরা সবসময়বাচ্চাদের মতো হয়। সবসময় দেখে রাখতে হয়। নইলে পরে পস্তাতে হয়।’
‘দেখেই রেখেছিলাম। হঠাৎ আমি টিউটোরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কাব্য এমন করবে বুঝিনি। সে আমার সরলতার সুযোগ নিয়েছে।’
‘যা হোক, বেশি বেশি কাজে মনোযোগ দে। দেখবি ভালো লাগবে।’
‘কোনোকিছুই আমার ভালো লাগে না। কী করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
‘এ স্টেজে এসে তোকে এসব মানায় না। তোর একটা পজিশন আছে। সোসাইটি আছে।’
‘কী করব। কিছুই ভালো লাগে না। তাকে ঘেন্না করব সেটাও পারছি না। ভুলে থাকব সেটাও পারছি না।’
‘উত্তাল সাগরে নৌকা ভাসাতে নেই। তাহলে নৌকা আর মাঝি দুটোকেই ডুবতে হয়। তেমনই উথালপাথাল হৃদয়ে কাউকে স্থান দিতে নেই।’
‘আমার ভেতর ভেতর পদ্মফুল ফুটে আছে তা ঘুণাক্ষরে বুঝিনি। তার স্পর্শে ফুটে উঠেছিল।’চোখ দুটো আনত করে সিলভি বলে,‘ক্যালোসিমিয়া ফুলের মতো ফুটেই ঝরে গেল। আমি তাকে অবলম্বন ভেবেছিলাম। তার অস্তিত্ব আমার মনের ভিতরে বাসাবেঁধে আছে।’
‘সবকিছুকে কঠিন করে দেখতে নেই। সহজ ভাবলে সহজ আর কঠিন ভাবলে কঠিন।’
‘পারছি না রে। রীতিমতো দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছি।’
‘এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। একটু ধৈর্য ধর। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘শুকরিয়া’, বলে সিলভি। ‘সেই তখন থেকে আমার কথা নিয়ে বকে চলেছি। তোর কিছুই তো শোনা হলো না।’
আলভি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
‘এভাবে আর কতদিনথাকবি একা একা?’
আলভি বলে,‘আমার ইর্ন্টানি শেষ হোক। তখন ভেবে দেখা যাবে।’
‘যা হোক,বয়স কমে যাচ্ছে! এটা মনে রাখিস।’
আলভি বলে,‘তার মানে কী?’
সিলভি বলে,‘আমরা ভুল হিসেব করি। বয়স কি কখনও বাড়ে? আসলে কমে। আমি যদি ষাট বছরবাঁচি। আমার এখন ত্রিশ। তাহলে আর ত্রিশ বছর বাঁচব।এখন বল বয়স বাড়ে না কমে?’
‘এভাবে চিন্তা করিনি কখনও। তুই এসব নিয়ে ভাবতে থাক।’
‘এখন চল কিছু খেয়ে আসি।’
তারা দুজনে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে কার্জন হলের রাস্তা দিয়ে বোরহান উদ্দিন রোডের ভেতর দিয়ে পুরান ঢাকার দিকে রওনা করে।হঠাৎ সামনে এসে হাজির কাব্য। এসেই রাস্তার মাঝে সেরিকশা থামিয়ে বলে, ‘সিলভি ম্যাডামের সাথে কথা বলতে চাই।’
সিলভিঅন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।
কাব্য বলে,‘ম্যাডাম আপনার সাথে কিছু কথা সাথে আছে। নেমে আসুন।’
সিলভি বলে,‘তোমার সাথে কোনো কথা নেই। সরে যাও। আর কখনও সামনে আসবে না।’
কাব্য বলে,‘কেন আমাকে এড়িয়ে চলছেন? কী এমন করেছি আমি?’
সিলভি বলে,‘তুমি আমার ছাত্র। ছাত্রের মতো থাকার চেষ্টা করো।’
সিলভি এবার রিকশা চালককে সামনে যেতে বলে।রিকশার পেছনে কাব্য, সামনে ওরা দুজন। কাব্য কিছুক্ষণ পেছন পেছনে এসে পরে ঠায়দাঁড়িয়ে থাকে। রিকশা আস্তে আস্তে দোয়েল চত্বর পার হয়ে পুরান ঢাকার দিকে অদৃশ্য হয়ে যায়।

বেশ কিছুদিন পর হাসপাতাল থেকে ইয়েলকে রিলিজ দেওয়া হয়। সপ্তাহে একবার চেকআপ করার জন্যতাকেহাসপাতালে যেতে হয়। ওর সবকিছু করে দেয় আলভি। ইয়েলকে কোনো কিছু নিয়ে বেগ পেতে হয় না। হঠাৎ একদিন আলভি ইয়েলকে ফোন করে যেতে বলে হাসপাতালে।কী কারণে যেতে বলেছে জানতে চেয়েও পারেনি। সে বাধ্য হয়েই যায়।
হাসপাতালে গিয়ে দেখে সিলভি ও আলভি বসে আছে। বসতে-বসতে তাদের আলোচনা শুরু হয়। ইয়েল সিলভিকে আগে কখনও দেখেনি।আলভির মুখে ওরনাম শুনেছিল বেশ কয়েকবার। সুন্দরী কিংবা অসুন্দরী তেমন কিছু নয়। পার্সনালিটিসমৃদ্ধ মহিলা বলেই মনে হলো তাকে। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে ম্যাচ করা শাড়ি,স্যান্ডেল, লিপস্টিক, নেইলপালিশ। বিউটি পার্লার থেকে দুচোখের ভ্রু কেটেছে। দৃষ্টিনন্দন এক অসাধারণ রূপ। মাথার সামনের চুলগুলো কিছু ছোটো করে ছাঁটা। কিছু চুল সোনালি রং করা। কালো আর সোনালিতে দারুণ দেখাচ্ছে।
আলভি বলে ওঠে, ‘সিলভি, তোর সাথে ইয়েলের পরিচয় করে দিই।’
পরিচয় পর্বটুকু হলো তাদের। ‘তোরা গল্প কর, আমি চা তৈরি করে আনি’, বলে সিলভি উঠে যায়। তারপর তিন কাপ চা তৈরি করে রুমে আসে।দাঁড়িয়ে চা দেওয়ার সময় শাড়ির কিছু অংশ নাভি থেকে সরে যায় সিলভির। নাভিটা ছোটো একটি গভীর কুয়ার মতো। তবে ম্যাচের কাঠি জ্বালালে যে গন্ধ নাকে আসে তেমনই অদ্ভুত ধরনের গন্ধ ভেসে আসেতার শরীর থেকে।
চা শেষ করে তাকে তারা দুজন এক প্রকার জোর করে মহিলা সমিতিতে নাটক দেখতে নিয়ে যায়। ইয়েল পড়েযায় মহা ফ্যাসাদে। নিজেকে যত দূরে রাখার চেষ্টা করে আলভি তত আরও কাছে টেনে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে দুপুরের লাঞ্চ পর্যন্ত তার সাথে করে। এ নিয়ে ওর অফিসে গল্পের ডালপালা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক কানাঘুষা শুরু হয়। ওর কানে সব আসে কিন্তু সে নির্বিকার। কখনওআলভি নিজে দুপুরে চলে আসে ওর অফিসে। দুজনে একসাথে লাঞ্চ করে। ইদানীং নতুন উপসর্গ শুরু হয়েছে। রাতে আলভির ডিউটি থাকলে তাকে তার চেম্বারে বসে থাকতে হয়। ডিউটি শেষ হলে তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসা লাগে। মাঝে মাঝে সিলভিও যাওয়া-আসা শুরু করে ওর অফিসে। সিলভি প্রায় প্রস্তাব দিতে থাকে কোথাও ঘুরে আসার জন্য। সে যেতে সাহস পায় না। তার উপর আলভির কড়া নিষেধ, তাকে ছাড়া সিলভির সাথে কোথাও যাওয়া যাবে ন।
ইয়েল কত হতভাগা! সবাই তাকে চায় কিন্তু যাকে সে চায় সে তাকে চায় না।বিধাতার এ কেমন খেয়ালি? ইয়েলের থার্ড আই বলে সিলভি ভেতর ভেতর ক্ষয়ে চলেছে। বেচারিকে দেখে ওর কষ্ট হয়। কিন্তু সে নিরুপায়। সে ভিতু, সে বোকা, সে সহজসরল এবং লাজুক। সিলভিকে দোষ দেওয়া যায় না। সেও এক প্রকার নিরুপায়।
ইদানীং আলভিসিলভিকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। আগে কোথাও গেলে তারা তিনজনই একসাথে যেত। আর এখন ইয়েল আর আলভি। আলভি অবসর পেলেই ইয়েলকে নিয়ে তার বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় নিয়ে যাওয়া শুরু করে। তাদের পরিবারের সাথে ইয়েলের ভালো একটা বন্ধন গড়ে ওঠে। এভাবে তাদের সময় অতিবাহিত হতে থাকে।
এক বিকালে আলভি হঠাৎ ইয়েলের অফিসে এসে হাজির।এসে বলে যেতে হবে তার সাথে।
ইয়েল বলে,‘কোথায় যাবো?’
আলভি বলে, ‘আজভাই-ভাবির অ্যানিভারসারি।’
‘সেটা আগে বলবে না?’
‘তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই আসলাম।’
‘একটু পরে গেলে হয় না? হাতে কাজ আছে যে।’
‘রাখো তোমার কাজ। একদিন কাজ না করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।’
ইয়েল এবার কিছু বলার সাহস করে না।
আলভি রেগে গিয়ে বলে,‘যেতে বলেছি, চলো।’
বলেই এক প্রকারের জোর করে অফিস থেকে বের করে আনে তাকে। আর কিছু না বলে তারা হাঁটতে থাকে। কিছু পর রিকশায় দুজন উঠে পড়ে। রিকশা ধানমন্ডির দিকে এগিয়েচলেছে। পান্থপথ সিগন্যাল পার হয়েছে। এমন সময়ে আলভি বলে,‘আমার পিরিয়ড শুরু হয়ে গেছে। ব্লাডে সব ভিজে যাচ্ছে।’
ইয়েল রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েযায়।কী করব সে? কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকেরিকশাওয়ালা চাচাকে বলে,‘রিকশা জোরে চালান।’
ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর হয়ে ডানে মোড়ের সাথে পানের দোকান। রিকশা থেকে নেমে চার খিলি পান কিনে নেয়। সব কয়টা পান মুখে দিয়ে চিবাতে থাকে ইয়েল। রিকশা যখন বাসার কাছে গিয়ে থামে,আলভিকে ইশারা করে রিকশা থেকে নামার জন্য।আলভি রিকশা থেকে নামার সাথে সাথে ইয়েল পানের পিক ফেলে দেয় ওর নিতম্বজুড়ে। সমস্ত নিতম্বে ব্লাড ও পানের পিকের রস মিশে একাকার হয়ে যায়। আলভি তাড়াতাড়ি করে বাসায় ঢুকে কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ইয়েল ওর রুমে একা একা বসে থাকল। কিছুক্ষণ পরে আলভির ভাবি এসে বলে,‘এখানে কেন একাএকা বসো আছ? চলো আমার রুমে চলো।’
‘না ভাবি, এখানেই ভালো আছি।’
‘আরে চলো না।’
‘আলভি আসুক।’
‘ভাবির কথা ছোটকাদের শুনতে হয় কিন্তু।’
ভাবি আর কিছু না বলে ইয়েলের হাত ধরে ওর রুমে নিয়ে গিয়েবলে,‘তোমার কালার সেন্স ভালো। কোন কালারের শাড়িটা পরব তুমি চুজ করে দাও।’
‘আমার কালার আপনার পছন্দ হবে না ভাবি।’
‘মিথ্যে বলো না। আলভির সব শাড়ি, কামিজ, ব্লাউজ তোমার চুজ করা, আমি জানি।’
আলভির ভাবি আট-দশটা শাড়ি তার খাটের উপরে সারিসারি করে রাখে। সেখান থেকে একটা শাড়ি ইয়েল তুলে বলে,‘এটা পরেন আজকে।’ (চলবে)

আরো পড়ুন