গান – কবিতা – গল্প

আবু তালেব সিদ্দিকী

by sondeshbd.com
113 views

আমি বলতাম, একটা কবিতা লিখি। তুমি বলতে, কবিতা তো সবাই লেখে। আমি বলতাম, একটা ছোট গল্প লিখি। তুমি বলতে, সে তো সব প্রেমিকরাই তাঁদের প্রেমিকাকে নিয়ে লিখে! আমি বলতাম, তাহলে প্রবন্ধ লিখি। তুমি বলতে, এ তো বয়স্ক মানুষের কাজ। তুমি এত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছ কি যে জীবনের দর্শন অথবা উন্নয়নের মহড়া নিয়ে লিখবে? তুমি বরং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখ। আমি বলতাম, সমসাময়িক বিষয়গুলো পাঠকপ্রিয়তা না পেলে তো অর্থহীন। আমার লেখা কে ছাপবে? তুমি আমাকে বললে, তোমার কবিতা তো সেই কবে দেশের প্রধান এক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। যেন তুমি আমার প্রশংসায় রঙ ঢেলে আমাকে অহঙ্কারী করতে চাইলে? সত্যি বলতে আমার সে কবিতা যখন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের হাতে দিলাম (উনিও একজন প্রখ্যাত কবি) উনি বললেন, তুমি তো আবদুল হাই ও নও বা শামসুর রাহমানও নও যে তোমার কবিতা জমা দিলেই ছাপা হয়ে যাবে।

রেখে যাও, ছাপানোর হলে ছাপানো হবে। হতাশা নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। তুমি বলেছিলে, কবি সাহেবের কবিতা ছাপা হলো। মনে হলো আমি হেরে গেলাম, তোমার বিশ্বাসের বরখেলাপ হলো বলে। সপ্তাহ গেল, পক্ষ অতিবাহিত হলো, মাসও চলে গেল। একদিন আমার সেই কবিতা ছাপা হয়েছিল, ওরা আমাকে রয়্যালটিও দিয়েছিল। কবিতা লিখে টাকাও পাওয়া যায়, এ আমার প্রথম পাঠ। মনে আছে রয়্যালটির সে টাকা দিয়ে আমি তোমাকে আইসক্রিমও খাইয়েছিলাম সচিবালয়ের গেটের সামনে সেই ঈগলু আইসক্রীম পার্লারে। আমি সেদিন নিজেকে খুব ধন্য মনে করেছিলাম, তোমাকে আইসক্রীম খাওয়াতে পেরে যতটা না তার চে বেশী আমার সাথে তোমাকে দেখা আমার বন্ধু বান্ধব স্বজনরা যখন অবাক হয়েছিল, কেউ কেউ খুশী হয়েছিল, হাতে গোণা কয়েকজন ঈর্ষান্বিতও হয়েছিল।

 

তুমি কি অনুমাণ করতে পেরেছিলে আমার সেই ঘোর লাগা আনন্দের দিনগুলির কথা? আমি তো তোমাকে কোনদিন বুঝতে পারিনি, বুঝবার চেষ্টাও করিনি, তোমার সাথে কথা বলে ভালো লাগতো, তুমি কবিতা আবৃত্তি করতে বলতে, অন্যের কবিতা মুখস্ত থাকতো না বলে নিজের লেখা কবিতা তোমাকে শুনাতাম। তুমি এক পলকে তাকিয়ে থাকতে, লজ্জা পেতাম, মাঝে মাঝে নেপথ্যে খুশী হতাম তোমার মত অনুরোধের এক মুগ্ধ শ্রোতা পেয়ে। তোমার কাছে কতই না কিছু শিখেছিলাম। মনে আছে আমি সেই শব্দটাকে বলতাম মহারাজা, তুমি বলেছিলে শব্দটা মহারাজা না বলে মহারাজ উচ্চারণে শ্রুতিমধুর লাগবে। তারপর তুমি আমাকেই মহারাজ বলে সম্বোধন করতে, এমনকি চিঠিতেও। অনেক দিনের ছুটিতে তুমি আমাকে চিঠিও লিখতে, তোমার লেখা পঙতি গুলো এখনও অবসরে আমাতে কোলাহল তৈরী করে। যেমন একবার লিখেছিলে, বাবলা গাছে ভরা পাবনা ছাড়িয়ে বনলতা সেনের নাটোর পেরিয়ে তোমার রাজশাহীতে এলাম। রাজশাহীর লোকগুলো কেমন জানি একটু গোবেচারা টাইপের। তুমি কি এ কথা লিখে আমাকেই কিছু বলতে চাইলে? আমরা কোনদিন ভাবিনি আমাদের এ মেলামেশার মধ্যে একটা বৈষম্য আছে। তুমি বলতে এক বছর কোন ব্যাপার না।

 

তারপর আমরা সমানে সমান। তুমি বেরিয়ে গেলে, আমি আটকে রইলাম। যুদ্ধের দামামায় একজন যোদ্ধা সেজে বনবাদাড়ে কাটিয়ে ফিরে এলাম স্বাধীন দেশের নূতন আঙ্গিকে। তুমি ততদিনে একটা চাকুরীতে ঢুকে গেছ। তোমার অফিসে গিয়ে খামাকা ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতাম। তুমি খুশী হতে নাকি বিরক্ত হতে বুঝতামনা; বুঝার চেষ্টাও করিনি। এখন মনে হলে হাসি পায় কি বেহায়াই না ছিলাম, এটা তো এক ধরণের বেহায়াপনা বলা চলে। যখন বুঝতে শিখলাম, আমার বোধের দৈন্য যখন আমাকে উপচে ছাপিয়ে দিল তখন আমি আমার আমাতে ফিরে এলাম। আবার লেখা শুরু করলাম, কবিতা, গল্প আর আমার অপারগতার টানাপোড়েন।

আরো পড়ুন