৭ মার্চ, ১৯৭১। রবিবার বিকেল। ভয়ঙ্কর শীত ইতোমধ্যে উধাও। পরিবর্তে, উত্তরায়ণে ধাবিত সূর্যের ছত্রছায়ায় দখলবাজ তাপ ক্রমশ গ্রাস করছিল বৃদ্ধসদন, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, পরিত্যক্ত মন্দির, আস্তাবল, পানিকল, বৃক্ষের কোটর, ঝরাপাতা, পাখির বাসা, হাতির শুঁড়, ছিটপোকা, শস্যক্ষেত্র, জলাশয়, এবং আগ্রাসীভাবে সর্বত্র। গরমের ভ্রুকুটি সত্ত্বেও সেদিন রমনা রেসকোর্স মাঠে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নেমেছিল—রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শিক্ষক, গৃহকত্রী, উচ্চপেশাজীবী, ডাক্তার, দুর্বল চিত্তের কেরানি, আদালতের পেয়াদা, দিনমজুর, পেপার হ্যাঙ্গার, পথচারী, কুলি, মুচি, পশু কারবারি, চাকর, চোর, ডাকাত, দাগি আসামি, নির্বোধ এবং পরশ্রীকাতর মানুষ। ঘাসাচ্ছাদিত রেসকোর্স মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মানুষ! মানুষ! আর মানুষ! যেন মানুষের সমুদ্র। গাদাগাদি মানুষের উত্তাপে সৃষ্ট অস্বস্তির সঙ্গে তারা হাঁপিয়ে উঠছিল; কিন্তু তবুও তারা উৎসব মেজাজে ছিল এবং পরস্পরের সঙ্গে লঘু ঠাট্টা-তামাশা করছিল। তারা গভীর উত্তেজনার সঙ্গে অপেক্ষা করছিল তাদের মহান নেতা শেখ মুজিবর রহমানের কাছ থেকে কিছু শোনার আশায়, যিনি খুব শিগগিরই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আসবেন; এবং ভরাট গলায় নবযুগের সূচনাকারী বক্তৃতার মাধ্যমে যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। তাদের সবাই উত্তেজিত এবং ভাবপ্রবণ স্বাদেশিকতায় উজ্জীবিত। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল কখন তাদের অবিসংবাদিত নেতা আসবেন! এবং কখন তিনি মঞ্চ আলোকিত করবেন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষদের স্বপ্নের জাদুকর ও শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহান নেতা হিসেবে! উত্তেজনা এতটাই প্রবল ছিল তাদের আড্রেনালিন অস্বাভাবিক গতিতে নিঃসৃত হচ্ছিল। কখন তিনি তাঁর তেজস্বী রাজনৈতিক শব্দমালার বোমা ফাটাতে আসবেন! সূর্য ছিল প্রখর উজ্জ্বল, এবং ছিল তার উন্মত্ত ঝলকানি। কতিপয় দাঁড়কাক তাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ছিল, যেন তারা সতর্ক পাহারায় ছিল। সময়টা ছিল সোনালি বিকেলের। সেই বিকেলের আকাশ ছিল গম্ভীর মেজাজে যেন সে “স্বাধীনতা” নামক কোনো বইয়ের উচ্চমার্গীয় ভূমিকা লিখছিল। সেই বিকেলে, রূপকথার পাখিরা পল্লবিত বৃক্ষের শাখায় শাখায় বসেছিল; এবং সম্ভাব্য ও হার্দিকভাবে স্বপ্নময় কথামালায় সুরারোপিত সংগীত গাইছিল। সেই বিকেল ছিল এই অবহেলিত ও নির্যাতিত ভূখণ্ডের মাটির সমতুল্য মানুষের কাছে অভ্রান্তভাবে আশা-উদ্রেককারী। এই ভূখণ্ড ছিল তখনো পাকিস্তানি প্রশাসনে বিন্যস্ত। সেই কারণে তারা ছিল ক্ষুব্ধ এবং উচ্চকিতভাবে প্রতিবাদমুখর। তারা চেয়েছিল পাকিস্তানি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে। সেই বিকেল প্রস্তত ছিল বাঙালিদের দুর্দশার মর্মবিদীর্ণ গল্প শুনতে। পুরুষ, নারী এবং নির্বিশেষে সবাই যারা সেখানে উপস্থিত ছিল তারা দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। নারীরা ছিল সাদামাটাভাবে ব্যবহারের উপযোগী মঞ্চের ঠিক সামনে, তারপর বাঁশের তৈরি সাময়িক ক্র্যাশ-ব্যারিয়ার এবং তার পেছনে পুরুষ জনতা। তারা শৃঙ্খলিত ছিল এবং হঠাৎ বিশৃঙ্খলার কারণে সভা যাতে পণ্ড না হতে পারে সে বিষয়ে কঠোর সতর্ক ছিল। যদিও, কালো মাছিরা অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের বিরক্ত করছিল এবং, মাঝেমধ্যে, তাদের সুন্দর মনকে ছায়াবৃত করছিল। অবশেষে এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! স্থির লক্ষ্য ও আদর্শে বলীয়ান হয়ে সর্বকালের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান রমনা পার্ক দিক থেকে সাদা গাড়িতে রেসকোর্স ময়দানে প্রবেশ করলেন। অতঃপর তিনি তার বন্ধু ও সহযোগীদের নিয়ে দীপ্ত পদভারে মঞ্চে উঠলেন। উপস্থিত জনতা উঠে দাঁড়াল, তাঁর আগমনকে উৎফুল্লিতভাবে অভিনন্দন জানাল এবং “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো”, “তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব—শেখ মুজিব” ইত্যাদি রক্ত গরম করা স্লোগানে রেসকোর্স মাঠ মুখরিত করল। আকাশ ও বাতাস এতটা জোরে প্রতিধ্বনিত হলো মাঠের চারপাশের বৃক্ষরাজি নীরবতা ভেঙে আন্দোলিত হলো। সবুজ পাতারা এতক্ষণ শুধুই পিঠ দেখাচ্ছিল তারা এখন বুক দেখানোর সাহস করল; তার ফলে, নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া রহস্যময় পাখিরা ভয়ে পালিয়ে গেল। শেখ মুজিব সাদা পাজামা, অর্গান্ডির সাদা পাঞ্জাবি, কালো ওভারকোট এবং মোটা ফ্রেমের কালো চশমা পরে ছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তেমনি তাঁর দরাজ গলা ও বাগ্মিতার অমোঘ অভিঘাত দেশ এবং দেশের বাইরে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল উচ্চাসনে। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় তিনি ছিলেন দৃষ্টিনন্দন। তাছাড়া, তাঁর পেছন দিকে আঁচড়ানো চুল ও রূঢ়-চওড়া মুখ ভয়ঙ্কর সমীহ জাগাত। মঞ্চের উপরে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা সাধারণ রসট্রাম স্থাপন করা হয়েছিল এবং তার উপরে ছিল অসংখ্য মাইক্রোফোন। মাইক্রোফোনগুলো অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের জাদুকরী কণ্ঠ শোনার জন্য অধীর হয়ে উঠছিল। প্রথম তিনি তাকালেন জনতার সমুদ্রে; তারপর হাত উঁচিয়ে, ভদ্রভাবে তাদেরকে শান্ত থাকতে ইঙ্গিত দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে, জনতার সমুদ্র একেবারে ঢেউহীন। মাইক্রোফোনের দিকে সামান্য ঝুঁকে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক এবং বাঙালিদের হাজার বছরের বর্বর বাস্তবতার অনুভূতিমিশ্রিত সময় উত্তীর্ণকারী বক্তৃতা আরম্ভ করলেন— “আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি—আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও যশোরের রাজপথ আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায় তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে, আমরা শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভ করবে। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্তদানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান দশ বছর আমাদের গোলাম করে রাখল। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা দেয়া হলো এবং এরপর এ অপরাধে আমার বহু ভাইকে হত্যা করা হলো। ১৯৬৯ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান এলেন। তিনি বলেলেন, তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, শাসনতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম। তারপরের ঘটনা সকলেই জানেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা হলো, আমরা তাকে ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করলাম। কিন্তু ‘মেজরিটি’ পার্টির নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমার কথা শুনলেন না। শুনলেন সংখ্যালঘু দলের ভুট্টো সাহেবের কথা। আমি শুধু বাংলার মেজরিটি পার্টির নেতা নই, সমগ্র পাকি¯ানের মেজরিটি পার্টির নেতা। ভুট্টো সাহেব বললেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে অধিবেশন ডাকতে, তিনি মার্চের ৩ তারিখে অধিবেশন ডাকলেন। আমি বললাম, তবুও আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে আমরা তা মেনে নেব, এমনকি তিনি যদি একজনও হন। জনাব ভুট্টো ঢাকা এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা হলো। ভুট্টো সাহেব বলে গেছেন আলোচনার দরজা বন্ধ নয়; আরো আলোচনা হবে। মওলানা নুরানী ও মুফতি মাহমুদসহ পশ্চিম পাকি¯ানের অন্যান্য পার্লামেন্টারি নেতারা এলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো—উদ্দেশ্য ছিল আলাপ-আলোচনা করে শাসনতন্ত্র রচনা করব। তবে তাদের আমি জানিয়ে দিয়েছি ৬-দফা পরিবর্তনের কোনো অধিকার আমার নেই, এটা জনগণের সম্পদ। কিন্তু ভুট্টো হুমকি দিলেন। তিনি বললেন, এখানে এসে ‘ডবল জিম্মি’ হতে পারবেন না। পরিষদ কসাইখানায় পরিণত হবে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের প্রতি হুমকি দিলেন যে, পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিলে রক্তপাত করা হবে, তাদের মাথা ভেঙে দেয়া হবে। হত্যা করা হবে। আন্দোলন শুরু হবে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত। একটি দোকানও খুলতে দেয়া হবে না। তা সত্ত্বেও পঁয়ত্রিশ জন পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্য এলেন। কিন্তু পয়লা মার্চ ইয়াহিয়া খান পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দিলেন। দোষ দেয়া হলো, বাংলার মানুষকে, দোষ দেয়া হলো আমাকে, বলা হলো আমার অনমনীয় মনোভাবের জন্যই কিছু হয়নি। এরপর বাংলার মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল। আমি শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য হরতাল ডাকলাম। জনগণ আপন ইচ্ছায় পথে নেমে এল। কিন্তু কী পেলাম আমরা? বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর অস্ত্র ব্যবহার করা হলো। আমাদের হাতে অস্ত্র নেই। কিন্তু আমরা পয়সা দিয়ে যে অস্ত্র কিনে দিয়েছি বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যে, আজ সে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার নিরীহ মানুষদের হত্যা করার জন্য। আমার দুঃখী জনতার উপর চলছে গুলি। আমরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখনই দেশের শাসনভার গ্রহণ করতে চেয়েছি, তখনই ষড়যন্ত্র চলেছে—আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ইয়াহিয়া খান বলেছেন, আমি নাকি ১০ই মার্চ তারিখে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে চেয়েছি, তাঁর সাথে টেলিফোন আমার আলাপ হয়েছে। আমি তাঁকে বলেছি আপনি দেশের প্রেসিডেন্ট, ঢাকায় আসুন দেখুন আমার গরিব জনসাধারণকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আমি আগেই বলে দিয়েছি কোনো গোলটেবিল বৈঠক হবে না। কীসের গোলটেবিল বৈঠক? কার গোলটেবিল বৈঠক? যারা আমার মা-বোনের কোলশূন্য করেছে তাদের সাথে বসব আমি গোলটেবিল বৈঠকে? তেসরা তারিখে পল্টনে আমি অসহযোগের আহবান জানালাম। বললাম, অফিস-আদালত, খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করুন। আপনারা মেনে নিলেন। হঠাৎ আমার সঙ্গে বা আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করে একজনের সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টা বৈঠকের পর ইয়াহিয়া খান যে বক্তৃতা করেছেন, তাতে সমস্ত দোষ আমার ও বাংলার মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। দোষ করলেন ভুট্টো কিন্তু গুলি করে মারা হলো আমার বাংলার মানুষকে। আমরা গুলি খাই, দোষ আমাদের—আমরা বুলেট খাই, দোষ আমাদের। ইয়াহিয়া সাহেব অধিবেশন ডেকেছেন। কিন্তু আমার দাবি সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে, হত্যার তদন্ত করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব পরিষদে বসব কি বসব না। এ দাবি মানার আগে পরিষদে বসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, জনগণ আমাকে সে অধিকার দেয়নি। রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি, শহীদদের রক্ত মাড়িয়ে ২৫ তারিখে পরিষদে যোগ দিতে যাব না। ভাইয়েরা, আমার উপর বিশ্বাস আছে? আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই। প্রধানমন্ত্রীত্বের লোভ দেখিয়ে আমাকে নিতে পারেনি, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নিতে পারেনি। আপনারা রক্ত দিয়ে আমাকে ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন। সেদিন এই রেসকোর্সে আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করব; মনে আছে? আজো আমি রক্ত দিয়েই রক্তের ঋণ শোধ করতে প্রস্ত ুত। আমি বলে দিতে চাই, আজ থেকে কোর্ট-কাচারি, হাইকোর্ট, সুপ্রীমকোর্ট, অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমুহ অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোনো কর্মচারী অফিস যাবেন না। এ আমার নির্দেশ। গরিবের যাতে কষ্ট না হয় তার জন্য রিক্সা চলবে, ট্রেন চলবে আর সব চলবে। ট্রেন চলবে—তবে সেনাবাহিনী আনা-নেয়া করা যাবে না। করলে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তার জন্য আমি দায়ী থাকব না। সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রীমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্টসহ সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো বন্ধ থাকবে। শুধু পূর্ববাংলার আদান-প্রদানের ব্যাংকগুলো দু-ঘণ্টার জন্য খোলা থাকবে। পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্থানে টাকা যেতে পারবে না। টেলিগ্রাফ, টেলিফোন বাংলাদেশের মধ্যে চালু থাকবে। তবে, সাংবাদিকরা বহির্বিশ্বে সংবাদ পাঠাতে পারবেন। এদেশের মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝে শুনে চলবেন। দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেয়া হবে। আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। যদি একটিও গুলি চলে তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলবেন। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারব—পানিতে মারব। হুকুম দিবার জন্য আমি যদি না থাকি, আমার সহকর্মীরা যদি না থাকেন, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ কিছু বলবে না। গুলি চালালে আর ভালো হবে না। সাত কোটি মানুষকে আর দাবিয়ে রাখতে পারবা না। বাঙালি মরতে শিখেছে, তাদের কেউ দাবাতে পারবে না। শহীদদের ও আহতদের পরিবারের জন্য আওয়ামীলীগ সাহায্য কমিটি করেছে। আমরা সাহায্যের চেষ্টা করব। আপনারা যে যা পারেন দিয়ে যাবেন। সাতদিনের হরতালে যেসব শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছেন, কারফিউ’র জন্য কাজ করতে পারেননি শিল্পমালিকরা তাদের পুরো বেতন দিয়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। কাউকে যেন অফিসে দেখা না যায়। এদেশের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ থাকবে। আপনারা আমার উপর ছেড়ে দেন, আন্দোলন কীভাবে করতে হয় আমি জানি। কিন্তু হুঁশিয়ার, একটা কথা মনে রাখবেন, আমাদের মধ্যে শত্রু ঢুকেছে, ছদ্মবেশে তারা আত্মকলহের সৃষ্টি করতে চায়। বাঙালি অবাঙালি, হিন্দু-মুসলমান সবাই আমাদের ভাই, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্র যদি আমাদের আন্দোলনের খবর প্রচার না করে তবে কোনো বাঙালি রেডিও এবং টেলিভিশনে যাবেন না। শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারলে ভাই ভাই হিসাবে বাস করার সম্ভাবনা আছে, তা না হলে নেই। বাড়াবাড়ি করবেন না, মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। প্রস্তুত থাকবেন, ঠান্ডা হলে চলবে না। আন্দোলন ও বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়লে তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। শৃংখলা বজায় রাখুন। শৃংখলা ছাড়া কোনো জাতি সংগ্রামে জয়লাভ করতে পারে না। আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।
উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে তার চলে যাওয়ার পর, উজ্জীবিত হওয়ার মন্ত্র ধারণ করে, জনতা বাড়ি ফেরার জন্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কিছু লোক এখানে-সেখানে হুড়োহুড়ি করছিল। কতিপয় পা টেনে টেনে হাঁটছিল, আবার অনেকেই পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে বাহাস করছিল—যেহেতু বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছেন, “আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে, আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।” কাজেই তাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে এবং নিজেদের উৎসর্গ করবার জন্য প্রস্তত্মুত। তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একজনকে ব্যতিক্রম মনে হচ্ছিল। কাউকে খুঁজছিল সে, হন্তদন্ত হয়ে। তার নাম সাবিত্রী—সাবিত্রী চ্যাটার্জী। ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী। বয়স অনুমান করা কঠিন। দিনটাকে স্পেশাল ভেবে লালপেড়ের শাড়ির সঙ্গে কলারনেক ব্লাউজ এবং সাদা পেটিকোট পরেছিল সে। সুন্দর করে বেঁধেছিল খোঁপা এবং সেই খোঁপায় ছিল সাদা গোলাপের গাঁজরা। তাকে চমৎকার ও সুশ্রী দেখাচ্ছিল এবং তার চেহারায় ছিল বুদ্ধিদীপ্ত আভার ঝলকানি। জনতার ভিড় ঠেলে ভার্সিটির দিকে হাঁটছিল সে। সামান্য হাঁটার পর হঠাৎ থামল সে একটা পুরনো গাছের নিচে এবং চারদিকে তাকাল তার আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে খুঁজতে; এবং অবশ্যই, গভীর নিঃশ্বাসে। তার আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটি আর কেউ নয়—রাসেল আহমেদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়ত সে। একজন অধ্যাপক দুষ্টুমি করে তাকে বার্ট্রান্ড রাসেল বলে ডাকতেন। ভিড়ের মধ্যে এতক্ষণ বসেছিল সে। লম্বা, সুদর্শন, বলিষ্ঠ চেহারার যুবক। তার পেছনদিকে আঁচড়ানো চুল এবং প্রসারিত কপাল ঠিক শেখ মুজিবকে দারুণভাবে মনে করিয়ে দিত। হয়ত সে-কারণেই সাবিত্রী তার প্রতি দুর্বল। তাছাড়া, তাদের মধ্যে চিন্তা-চেতনা, বিভিন্ন মত এবং আদর্শগত প্রচুর মিল ছিল। যদিও তারা দুজন আলাদা আলাদা ধর্মের মানুষ—একজন মুসলমান, আরেকজন হিন্দু। রাসেল ধূসর রঙের গ্যাবার্ডিন স্যুট, গলাখোলা সাদা সিল্ক শার্ট ও কালো জুতা পরেছিল। সে-ও সাবিত্রীকে খুঁজছিল; কারণ, ততক্ষণে সূর্যা¯ অন্ধকারের ডানায় এসে অবতরণ করছিল। তাছাড়া, বিপদের সম্ভাবনাও ইতি-উতি তাকাচ্ছিল। অলক্ষুণে চিন্তা লাল পিঁপড়ের মতো কুটকুট করে কামড়াচ্ছিল তার মগজে। জনতার ভিড় ঠেলতে ঠেলতে নাক বরাবর অগ্রসর হলো সে। এদিকে হতাশা সঙ্গী করে দাঁড়িয়েছিল সাবিত্রী। চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। ঠিক তখুনি একটা শুকনো ডাল হঠাৎ তার মাথার উপরে সড়সড় করে ভেঙে পড়তে দেখল সে। বিপদ আঁচ করে সামনের দিকে দ্রুত সরে গেল। কাকতালীয়ভাবে একে অপরের মুখোমুখি; এমনকি দুজনের মধ্যে ধাক্কা খায়খায় অবস্থা হলো। অতঃপর দুজনই যারপর নেই বিস্মিত। “কী হচ্ছে, এসব!” সাবিত্রী চিৎকার করল, তারপর আঁচলটা কটিদেশে টেনে নিয়ে, “তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না কেন?” “আমিও তাই,” বলল রাসেল, আড়ষ্টতা ব্যবচ্ছেদ করে। “চলো, চা খেতে খেতে কথা বলি!” বলল সাবিত্রী, হাঁকুপাঁকু করে। তারা রেসকোর্স ময়দান থেকে বেরিয়ে মধুর ক্যান্টিনে এল। সাধারণ ছাত্র, নেতা এবং পাতি নেতারা সেখানে ভিড় করছিল। তাদের পদভারে ক্যান্টিন প্রকম্পিত। বসার মতো তেমন জায়গা ছিল না; কিন্তু তারা কোনোরকমে মুখোমুখি বসতে সক্ষম হলো। তারা দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিল। তখন চায়ের কাপে রাজনৈতিক ঝড়—শেখ মুজিব অবশ্যই ক্ষমতায় বসবেন। চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সেসঙ্গে পাকিস্তানি শাসকদের যাচ্ছেতাই গালমন্দ। অবিন্যস্ত কেশভারের কয়েকজন ছাত্র দ্বিধান্বিত ছিল; কেন তারা দ্বিধান্বিত, সেই ব্যাখ্যাও তারা দিয়ে যাচ্ছিল দিগগজ পণ্ডিতদের মতো। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও একটা উসখুস ভাব সাবিত্রী’র মধ্যে ছিল। চায়ে চুমুক দিয়ে, ইতস্তত করে বলল সে, “তোমাকে একটা জায়গায় পাঠাতে চাই।” “কোথায়?” রাসেল জিজ্ঞাসা করল, সামনে সামান্য ঝুঁকে। “আগের জায়গায়,” বলল সে, তার চোখে-মুখে অদ্ভুত অস্থিরতা। “কেন?” রাসেল জিজ্ঞাসা করল। পরক্ষণে, উপদেশের সুরে বলল, “ক্রেজি হইও না! ক্রেজিনেস এক ধরনের মানসিক রোগ। এটা জীবন থেকে স্বাভাবিকতা কেড়ে নেয়। অ্যালোপাথ বা হোমিওপ্যাথ কোনো চিকিৎসায় এটা সারবে না।” “আমার মনে কী চলছে তুমি তা বুঝবে না,” বেজার মনে বলল সে। “স্ত্রীয়াশ্চ চরিত্রম দেবা না জানন্তি। স্ত্রীচরিত্র দেবতারাও জানেন না। আর আমি কোন ছার?” রাসেল হেসে উঠল। তার হাসিতে বেশ বিরক্ত হলো সে। চাহনিতে তার আভাস স্পষ্ট। আর তা বুঝতে দেরি হলো না রাসেলের। সঙ্গে সঙ্গে বলল, “বিষয়টা কী, বলো তো! যখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে কথা বলার কথা তখন তুমি কেমন যেন এলোমেলো! ভিড়ের মধ্যে টাকা পয়সা খোয়া গেলে এরকম হয়। তোমার কি তাই?” “না! সোনার দুল।” যেন অপরাধ করেছে এরকম ভঙ্গি তার। “উফ! এটাই তোমার মন খারাপের কারণ?” বিরক্তি প্রকাশ করল রাসেল। পরক্ষণে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “মেয়েরা সত্যিই এক অদ্ভুত জাতি। এদের চিন্তা যতটা সামষ্টিক তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিক—যতটা রাষ্ট্রিক তার চেয়ে বেশি গার্হস্থিক। এই সময়েও সোনাদানা নিয়ে পড়ে আছ।” “পড়ে থাকতাম না যদি দুলগুলো মায়ের না হত,” তড়িৎ গতিতে জবাব দিল সে। একটু পরে মা সম্পর্কে দু’এক কথায় বলল, “আমার মা টিপিক্যাল হাউসওয়াইফ। এটাকে সহজভাবে নেবে না।” রাসেলের বাঁ চোখের পাতা কাঁপছিল, হাত দিয়ে ঘষে তারপর বলল, “ভয় পেয়ো না! আগামীকাল এটা ফেরত পাবে। আর যদি খুব বেশি সমস্যা মনে করো, তোমাদের বাসায় আমাকে নিয়ে যেতে পারো। কাকিকে যা বলার আমি বুঝিয়ে বলব।” “বাপরে! এতক্ষণ ছিলাম বিপদে, এবার পড়ব মহা বিপদে,” তড়াক করে বলল সে। “ঠিক আছে আমাকে নিতে হবে না। কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হোক, আমিও চাই না।” রাসেল তাকে নির্ভার করল। এতক্ষণ পর এবার সে মূল আলোচনায় ফিরল। কিছু ভারী কথা আছে যা বলতে গেলে আবেগে গলা কেঁপে ওঠে। গলা কেঁপে উঠল তার, “আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না এটা ভাষণ না অন্যকিছু? এরকম মহাকাব্যিক জ্বালাময়ী ভাষণ এর আগে কখনো শুনিনি। ভাষণ তো না যেন অতল সমুদ্রের তলদেশে ভূমিকম্পের হঠাৎ বিস্ফোরণ।” “সত্যিই তাই! আমি বিস্মিত! কোনো ভাষাতেই এরকম ভাষণ দেওয়া হয়েছে কিনা জানিনা, এবং জানার কথাও নয়। আমি নিশ্চিত পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই এরকম ভাষণ নেই।” সাবিত্রী’র কথায় জোশ ফিরে এল, “এটা জলের মতো পরিষ্কার তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।” চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পুনরায়, “কিন্তু কীভাবে তা অর্জিত হবে, বলা মুশকিল। পরিস্থিতি আউট অফ কন্ট্রোল।” “রুরিটানিয়ান রাজনীতি চলছে এখানে। কাজেই আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তুমি নিশ্চয় এই ইতিহাস জানো, তবুও বলছি। কারণ, জাবরকাটাই ইতিহাস। মীরজাফর আলি খানের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জয়লাভ করেছিল। এখানে অনেক মীরজাফর আলি খান আছে।” “ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায় বাদ দিয়ে পৃথিবীর কোনো মহান ইতিহাস রচিত হয়নি,” বলতে বলতে নাসিকায় আঙুল বোলাল সাবিত্রী। আরো সংযোজন করল, “মহাভারত ও রামায়ণের পরতে পরতে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার কুটিল বিস্তৃতি। মুঘল সালতানাতের কথাই ধরো। সম্রাট আওরঙ্গজেব তার পিতাকে বন্দি ও বড় ভাইকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিল। আরো বলতে পারি আমাদের নিজস্ব রূপকথার গল্প “সাত ভাই চম্পা” থেকে। সেখানেও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্র নেই কোথায় বলো।” “আমি তোমার কথা খারিজ করছিনা। তোমার কথা যে ধ্রুব সত্য তার প্রমাণ খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে আমাদের চার খলিফার মধ্যে তিনজনকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটাই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বা রাজনীতির ষড়যন্ত্র,” বলল রাসেল। যখন আলোচনা তুঙ্গে, হঠাৎ সুপরিচিত ছাত্রদের একটা দল সেখানে উপস্থিত। তারা রাগে-ক্ষোভে ফুঁসছিল—“পাকিস্থান নিপাত যাক!” রাসেল এবং সাবিত্রী তাদের স্বাগত জানাল। তাদের উদ্দেশ্য করে, সাবিত্রী বলল, “চালিয়ে যাও! আমরা তোমাদের সাথে আছি। বিজয় সুনিশ্চিত!” সাবিত্রী তার নিপাট সৌন্দর্য ও স্মার্টনেসের কারণে তাদের কাছে পরিচিত মুখ। তারা তাকে ঘিরে ধরল এবং স্লোগান দেয়ার পরিবর্তে তারা তার মন জয় করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হলো। তাদের রাগ, ক্ষোভ বরফ হয়ে এল। তাকে খুশি করার কৌশল হিসেবে তারা বিভিন্ন খাবারের অফার করল। সাবিত্রী হাত কচলে অপ্রস্তুত হাসিমুখে বলল, “খিদে নেই। সরি!” ‘বিরক্তি’ বহনে সক্ষম এমন ধূমকেতুর লেজে পা দেয়া সঠিক মনে না করে তারা সেখান থেকে চলে গেল। রাসেল এবং সাবিত্রী ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগল। সময়টা ছিল বিভ্রান্তিকর। তারা কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে সাবিত্রী জিজ্ঞাসা করল, “আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?” রাসেল হঠাৎ থামল। ব্যায়ামবিদের মতো উত্তমাঙ্গ বাতাসে প্রক্ষেপ করে গুরুত্বহীনভাবে বলল সে, “আপাতত ইকবাল হল।” পরক্ষণে গম্ভীর,”যদিও কী কারণে মন আর সায় দেয় না ’ইকবাল’ নামটা মুখে আনতে।” তার রুম নাম্বার ২৬৯, প্রথম ফ্লোর। হয়ত ভয় ও উদ্বিগ্নতা তাদের পিছুপিছু ছিল; তারা ইতস্তত ভঙ্গিতে হাঁটছিল। রাস্তার দু’পাশের বৃক্ষরাজি আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুদূর হাঁটার পর, সাবিত্রী খেয়ালি মনে উপরের দিকে তাকাল। আকাশ সামান্য মেঘাচ্ছন্ন। কিন্তু, অবলীলাক্রমে, চাঁদের উত্তপ্ত পৃষ্ঠ থেকে প্রাচুর্যময় আলোর শৈল্পিক রেখাগুলো শাখাময় বৃক্ষের ফাঁক দিয়ে নেমে এসে ভূপৃষ্ঠে ছোপছোপ ছায়ার আলপনা আঁকছিল। মস্তিষ্কের ডোপামিন সাবিত্রীকে অভিভূত করল। হঠাৎ থামল সে। “দেখো! দেখো!” রাসেল ক্লান্ত ছিল; তার দিকে তাকিয়ে বলল সে, “ধুত্তোরি! আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ। এমন কী হয়েছে?” “কিছুই হয়নি,” বলল সে, বোকার মতো হাসতে হাসতে। “ফালতু হাসির খ্যাতা মারি!” তাকে বিরক্ত মনে হলো, হঠাৎ এবং উত্তেজনাকরভাবে। সাবিত্রী স্বাভাবিক ছিল; একটা সুখী অনুভূতি তার অšরে ক্রিয়াশীল। “এটা অপ্রয়োজনীয় নয়,” বলল সে, উষ্ণ স্বরে, “যেহেতু বঙ্গবন্ধু’র ভাষণে উদ্দীপ্ত, তাই পৃথিবীর বদলে যাওয়াটা ভালো লাগছে।” “কিছুই বদলায়নি! পৃথিবী যেমন ছিল তেমনই রয়ে হেছে! হয়ত তোমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে!” রাসেলের কথায় যে শক্তি ছিল তা দুর্বল হয়ে এল, “তুমি ওয়ার্ডসওয়ার্থ পড়ো, কীটস পড়ো, শেলী পড়ো। বাঙালিদের মধ্যে একজন বাবু তো আছেনই। নারীকুলের মাথা খেয়েছেন আগেই। সন্দেহ নেই প্রকৃতিপূজোয় তারাই সেরা। ঈশ্বর সুন্দর প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন; কিন্তু বিস্ময়করভাবে নীরব থেকেছেন এর মহিমা প্রচারে। কিন্তু কবিরা তাদের কলমের মাধ্যমে প্রকৃতিকে উদারভাবে মহিমান্বিত করেছেন। অবশ্য, কে আছে যে প্রকৃতিকে ভালোবাসে না? হোক না সে সুলতান মাহমুদ গজনবী কিংবা জ্যাক দ্য রিপার।” রাসেলকে এবার বুদ্ধিদীপ্ত মনে হলো। “আসলে প্রকৃতির অভূতপূর্ব রূপ জ্যাক দ্য রিপারের মতো আমাকে খুন করেছে। তুমি সেই দৃশ্যটি মিস করেছ।” এবার ন্যাকা করে বলল, “যার সঙ্গে আছ সে-ই বা কম কীসে!” “সরি!” রাসেল বলল। পরক্ষণে, প্রশংসার ছকে বেঁধে ফেলল তাকে, “গ্রেট! অতুলনীয়া! তোমাকে, বিশেষ করে এই ড্রেসে, উপমহাদেশের মোস্ট পপুলার ও মোস্ট ওয়ান্টেড নায়িকা সুচিত্রা সেনের মতো গর্জিয়াস দেখাচ্ছে। সুচিত্রা সেন কথা বলে চাহনিতে, আর তুমি বলো—” থামল সে। “আমি কীসে বলি, বলো?” রাসেল প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল, “জলদি চলো! রাত দ্রুত গভীর হচ্ছে।” “কথা শেষ না করলে আমি যাব না।” “আরেকদিন শেষ করব।” তার আশ্বাসে কাজ হলো। সাবিত্রী অদ্ভুতভাবে চুপ হয়ে গেল। তারা সংকীর্ণ রাস্তা, বিশৃঙ্খলভাবে বেড়ে ওঠা গাছ-গাছালি পেরিয়ে ভাইস চ্যান্সেলর চত্ত্বরে পৌঁছুল। পুলিশ পাহারা দ্বিগুণ করা হয়েছে। খেঁকি কুত্তাগুলো পালাচ্ছিল এবং ইঁদুররা চেঁচামেচি করছিল। তাদের চিরচেনা পরিবেশ অন্যরকম ঠেকছিল এবং তাদেরকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, চিšাকুল ও ভয়চকিত করছিল। তারা কিছু একটা ভুল সংকেত পেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছিল। খানাখন্দ রাস্তা থেকে কয়েক গজ ভেতরে ইকবাল হল, ইতিহাসের বটবৃক্ষ; সেখানে তারা গেল না। হঠাৎ করেই রাসেল নিজেকে সাবিত্রী’র অভিভাবক ভাবতে লাগল। অভিভাবকরা সাধারণত সন্দেহপ্রবণ হয়, নিজ ভূমে আতঙ্কপ্রবণ হয়। সে-ও যেন এর বাইরে নয়, এমন স্বভাবে আত্মস্থ হয়ে বলল সে, “তোমাকে একা ছাড়তে পারি না! একা যাওয়াটা ক্ষতির কারণ হতে পারে।” সাবিত্রী কখনই হলে বা ছাত্রাবাসে থাকেনি, বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত পুরনো ঢাকার ভাস্কো-দা-গামা রোডে, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছাকাছি। চাঁদ থেকে দূরে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। নিজস্ব বাড়ি। প্রপিতামহের আমলে পুননির্মিত। অন্দর মহলে কিছুটা ব্রিটিশ ছাপ। যেমন হলওয়ে। “কিন্তু আমি পারব,” সাবিত্রী বলল, দৃঢ়ভাবে, “এটা আমার শহর। আমি এখানে জন্মেছি। আমি আজিমপুর গার্লসস্কুলে পড়াশুনা করেছি। আমার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছি এই এলাকায় ঘুরে বেড়িয়ে। বলতে পারো এই এলাকার গলি ও গলিপথ আমার নখদর্পণে।” “তুমি যাই বলো, তোমাকে একা ছাড়তে পারি না! নখের মধ্যেও বিষ থাকতে পারে।” রাসেল বলল, একটু গলা চড়িয়ে। পরক্ষণে, তাকে সতর্ক করতে, “তুমি তো জানো মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের গায়ে একবার কলঙ্কের দাগ পড়লে সেই দাগ মোচন করা কঠিন।” সাবিত্রীকে গুরুত্ব না দিয়ে, তাকে ঠেলে নিয়ে গেল পলাশী চত্ত্বরের দিকে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামনে দিয়ে যেতে হয় সাবিত্রীদের বাসায়। যখন তারা সেখানে পৌঁছুল, ঢাকের উচ্চনিনাদ শুনতে পেল তারা। দ্রিম—দ্রিম শব্দ জড়ভরত আকাশ ও শনশন বাতাসকে বিদীর্ণ করছিল। কেউ একজন বাজাচ্ছিল মন্দিরের ভেতর। “ঢাকা নামকরণের রহস্য কি জানো?” সাবিত্রী পেছনে তাকাল। “অবশ্যই,” সবি¯ারে বলল রাসেল, “ঢাকার নামকরণ কেন এমন সে বিষয়ে অনেক থিওরি রয়েছে। অনেকে মনে করেন এটি গোপন দেবী ঢাকেশ্বরীর কাছ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। তবে এটি ঢাকগাছ বা ঢাক থেকেও নামকরণ করা হতে পারে।” “জানার জন্য ধন্যবাদ!” খুশি হয়ে আবার বলল সে, ”আমরা আমাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি। এখন আমাকে ছেড়ে যেতে পারো।” “এক্ষুনি?” বিস্ময় ও অনিয়ন্ত্রিত হতাশা তার কণ্ঠে। সাবিত্রী প্রকাশ করল তাদের পরিবারের গোপন সত্যটা। বলল সে, অস্বস্তিকর গলায়, “আমার বাবা দুর্দান্ত সৎ মানুষ কিন্তু খ্যাপাটে। বলতে পারো কিছুটা অহংকারীও বটে। আমাদের বাড়িতে তোমাকে এলাও করবে না। যদি শোনে তুমি মুসলমান, তাহলেই হয়েছে!” কিছুক্ষণ পরে, তারা একটা পুরনো জীর্ণ বাড়ির সামনে পৌঁছুল। এর ভেতরে প্রবেশ না করেই আমরা বলতে পারি এর মেঝে চুপসে স্যাঁতসেঁতে, কাঠের বিছানাগুলো ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে, স¯া আসবাবপত্র ধূলোময়, হলওয়ে শীতল ও অন্ধকার, জানালাগুলো শিস দেয় এবং চিলেকোঠায় রহস্যময় আওয়াজ শোনা যায়। পুরো বাড়ির উপর একনজরে তাকাল রাসেল। তার চোখে অদ্ভুত কিছু ধরা পড়লে সে সাবিত্রী’র দিকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “বঙ্গবন্ধুর কথামতো কাল থেকে ক্লাস হবে না, তবুও এসো। তোমার ডিপার্টমেন্টের সামনে অপেক্ষা করব। শুভরাত্রি!” সাবিত্রী বাড়িতে প্রবেশ করল না। দেয়ালে ঝুলানো স্থিরচিত্রের মতো, রাসেলের পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। প্রথম সন্তান জন্ম দেয়ার মতো—অন্ধের প্রথম জগত দর্শনের মতো—কঠিন স্বপ্ন বাস্তবায়নের পর আনন্দিত হওয়ার মতো বিস্ময়করভাবে হৃদয়গ্রাহী অনুভূতি যেন এইমাত্র তাকে ছেড়ে গেল। রাতের গভীরে থাকা অতীন্দ্রিয় তারকাসমূহ থেকে হঠাৎ আক্রমণাত্মক বিষণ্নতা এসে তার সংবেদনশীল মনের উপর ছড়ি ঘোরাতে লাগল। (চলবে)
চন্দ্রদাহ- পর্ব-০১
জিল্লুর রহমান শুভ্র

156
পূর্ববর্তী খবর
