রাজশাহী একসময় সবুজ-শ্যামল নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। রাস্তার দু’পাশে ছায়া দেয়ার মতো বড় বড় গাছ, পরিচ্ছন্ন রাস্তা, আর শীতল বাতাস ছিল এ শহরের গর্ব। কিন্তু আজকের রাজশাহী সেই গৌরব হারিয়ে কেবল বর্জ্যের স্তূপ আর দূষণের শহরে পরিণত হচ্ছে। শহরের প্রবেশমুখ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এখন ময়লা, ধোঁয়া, পচা গন্ধ আর দূষিত বাতাসের রাজত্ব। এছাড়া, বিষাক্ত নদীর পানি, রাজশাহীর এই অবস্থা শুধু নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা নয়, এটি এক গভীর পরিবেশ সংকট—যার প্রভাব পড়ছে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে। সব মিলিয়ে শহরটি ক্রমেই এক পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের সাত কিলোমিটার পথ এখন সিটি করপোরেশনের কঠিন বর্জ্যের স্তূপে পূর্ণ। নগরীর নওদাপাড়া থেকে সিটি হাট পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে ময়লা জমে থাকা, পলিথিন, প্লাস্টিক, এমনকি হাসপাতালের চিকিৎসাবর্জ্য অবাধে ছড়িয়ে রয়েছে। এই অবস্থা শুধুমাত্র রাস্তার সৌন্দর্য নষ্ট করেনি, গাছপালা শুকিয়ে পড়েছে, মাটি বিষাক্ত হয়ে গেছে, এবং বাতাস দূষিত হয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দাবি, ল্যান্ডফিলে যানবাহন ঢুকতে না পারলে তারা ‘সাময়িকভাবে’ রাস্তার পাশে বর্জ্য রাখে। কিন্তু এই সাময়িকতা বহু বছর ধরে স্থায়ী বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। যে ল্যান্ডফিল ২০০৪ সালে স্থাপিত হয়েছিল, তা বহু আগেই ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে প্রতিদিনের ৪০০ টনের বেশি বর্জ্যের বড় অংশ যাচ্ছে মহাসড়ক, কৃষিজমি কিংবা আবাসিক এলাকার পাশে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিশোধিত বর্জ্য থেকে নিঃসৃত লিচেট বা বিষাক্ত তরল ধীরে ধীরে মাটির গভীরে মিশে যাচ্ছে। এতে মাটির উর্বরতা কমে, গাছের শিকড় পচে যায়, আর ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করে ভারী ধাতু—যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, স্নায়ু রোগ ও অঙ্গ বিকল হওয়ার কারণ হতে পারে।
রাজশাহীর শুধু সিটি নয়, জেলার ১৪টি পৌরসভার ১৩টিতেই নেই কোনো ডাম্পিং স্টেশন বা বর্জ্যভূমি। প্রতিদিনের গৃহস্থালি, বাজার ও হাসপাতালের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে খোলা জায়গায়, নদীতে বা পুকুরে। নওহাটা, বাগমারা ও তাহেরপুর পৌরসভা তাদের বর্জ্য ফেলছে বারনই নদীতে; দুর্গাপুর পৌরসভা হোজা নদীতে; আর গোদাগাড়ী পৌরসভা ফেলছে পদ্মার তীরে।
বাঘা পৌরসভার শাহী মসজিদের ঐতিহ্যবাহী পুকুরে প্রতিদিন ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। পুকুরের পানি এখন কালচে, দুর্গন্ধে ছাওয়া। স্থানীয়রা বলেন, পুকুরে গোসল করলে চর্মরোগ ও ডায়েরিয়া হয়।
এমন অবস্থায় বলা যায়, পুরো জেলার জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ পানি এক নীরব বিষক্রিয়ার মধ্যে আছে। নদী ও পুকুরে জমে থাকা বর্জ্য শুধু পানির গুণগত মান নষ্ট করছে না, তা থেকে ছড়াচ্ছে মাছি, মশা ও রোগজীবাণু।
আইন অনুযায়ী, প্রতিটি পৌরসভার দায়িত্ব বর্জ্য অপসারণ ও ডাম্পিং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে রাজশাহীর কোনো পৌরসভাই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রপ্রাপ্ত নয়। প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে, বরাদ্দও মিলেছে, কিন্তু জমি না পাওয়া ও স্থানীয় সমন্বয়ের অভাবে বছর পেরিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থানার কারণে রাজশাহীর লাইফলাইন খ্যাত বারনই নদী আজ প্রায় মৃত। নগরীর সমস্ত তরল বর্জ্য দুটি খালের মাধ্যমে প্রতিদিন এই নদীতে গিয়ে মিশছে। গৃহস্থালি পয়ঃনিষ্কাশন, হাসপাতালের বর্জ্য, গ্যারেজের ব্যাটারি অ্যাসিড, বিসিক এলাকার কারখানার রাসায়নিক—সব মিলিয়ে নদী এখন এক ভয়ংকর রাসায়নিক ককটেল।
নওহাটা এলাকার গৃহিণী রাখি দাসের কথায়, ুআগে এই নদীর পানি দিয়ে রান্না করতাম, এখন গায়ে লাগলেও চুলকায়।” জেলে চিত্তরঞ্জন দাস বলেন, ুনদীতে আর মাছ নেই, মাছে এক ধরনের দুর্গন্ধ থাকে।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বারনই নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা এতটাই কম যে সেখানে আর কোনো জলজ প্রাণ টিকে থাকতে পারে না। পানিতে পাওয়া গেছে সীসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম ও জিংকের মতো ভারী ধাতু—যা মাটির মাধ্যমে ফসলে, পরে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
অধ্যাপক মিজানুর রহমানের মতে, বারনই নদীর দূষণ কেবল পরিবেশগত নয়—এটি মানবাধিকারের সংকট। কারণ এই নদী বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।”
এসব বিষয়ে দায় কার, এই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়। রাজশাহীর তিনটি স্তরে—সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং শিল্পাঞ্চলে—যেভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনা চলছে, তা এটিই প্রমাণ করে যে, প্রশাসনিক সমন্বয়ের চরম অভাব।
সিটি করপোরেশন বলে :জায়গা নেই”, পৌরসভা বলে :প্রকল্প আটকে আছে”, শিল্পাঞ্চল বলে : শোধনাগার নির্মাণাধীন”—কিন্তু ততদিনে মাটি, পানি ও বাতাস ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরও এ ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। তারা চিঠি দেয়, নির্দেশ পাঠায়, কিন্তু তার বাস্তব প্রয়োগ অদৃশ্য। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সমস্যাটি এক ধরণের নীরব বিপর্যয়” হিসেবে বেড়ে উঠছে।
রাজশাহীতে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে—নতুন সড়ক, ফোয়ারা, পার্ক, ফ্লাইওভার। কিন্তু এই উন্নয়নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে নোংরার রাজত্ব। কেন নতুন ল্যান্ডফিল নির্মিত হলো না? কেন প্রতিটি পৌরসভায় আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্লান্ট স্থাপন করা গেল না? কেন শিল্প এলাকার জন্য কার্যকর ইটিপি (Effluent Treatment Plant) এখনো চালু হলো না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল প্রশাসনিক নথিতে নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাতেও লুকিয়ে আছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকার।
কেননা, রাজশাহীর গাছগুলো আজ যেন মূক সাক্ষী। রাস্তার পাশে শুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো বলছে—আমাদের মেরে তোমরাই বিষ খাচ্ছ।” এই গাছগুলো কেবল প্রকৃতি নয়, নগরীর আত্মা। গাছ মরে গেলে শুধু ছায়া হারাই না, হারাই বাতাসের বিশুদ্ধতা, জীবনের ভারসাম্য।
একসময় রাজশাহীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল সৌন্দর্য, শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। এখন সেই শহর একদিকে কংক্রিটের জঙ্গল, অন্যদিকে বর্জ্যের পাহাড়। এটি কেবল শহরের নয়, সমগ্র অঞ্চলের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ সংকেত।
তাই, প্রথমত: রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও সকল পৌরসভায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র (Waste Processing Plant) স্থাপন জরুরি। দ্বিতীয়ত, বারনই নদীর জন্য কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও শিল্প বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করতে হবে। তৃতীয়ত, নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা ও বর্জ্য বাছাই (Segregation at Source) বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, পরিবেশ অধিদপ্তরকে কাগজে নয়, মাঠে কাজ করতে হবে—জরিমানা নয়, চাই শাস্তির বাস্তব প্রয়োগ।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খানের কথাই এখানে প্রাসঙ্গিক—আমরা প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি করছি, তা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে রাজশাহীর নদী, কৃষি, মাটি—সবই বিষাক্ত হয়ে যাবে।”
রাজশাহীর সৌন্দর্য একদিন তার সবুজেই ছিল, আর আজ সেই সবুজই মৃত্যুর মুখে। এ শহরকে আবার সুন্দর করতে হবে, কিন্তু তা আলো-ফোয়ারায় নয়—বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়, নদী বাঁচাতে, মাটি রক্ষায়। কারণ রাজশাহী শুধু একটি শহর নয়—এটি উত্তরবঙ্গের শ্বাসপ্রশ্বাস, আর সেই শ্বাস এখন বিষাক্ত হয়ে উঠছে। যদি এখনই সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, একদিন হয়তো রাজশাহী সত্যিই সুন্দর থাকবে—কিন্তু শুধু ছবিতে, স্মৃতিতে, বা পোস্টকার্ডে।
লেখক : এনায়েত করিম
সম্পাদক, দৈনিক উত্তরা প্রতিদিন
রাজশাহী।

