নির্জন সন্ধ্যায় এখনও অনেকেই অভ্যাসবশে হাত বাড়ান রেডিওর সুইচের দিকে। কেউ কেউ হঠাৎ থমকে যান। মনে পড়ে যায় সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। বিকেল তিনটা বাজলেই ৯৯.২ এফএম এর তরঙ্গে ভেসে আসা পরিচিত সুর, পরিচিত কণ্ঠ, বরেন্দ্র ভূমির মানুষের জীবন-জীবিকার গল্প, হাসি-আনন্দ, সংগ্রাম, অর্জন সবকিছুই যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বরেন্দ্র রেডিওর প্রতিটি অনুষ্ঠানে। আজ সেই কণ্ঠস্বর স্তব্ধ। সেই সুর নীরব। আমি বলছি, নওগাঁ জেলার বরেন্দ্র রেডিও ৯৯.২ এফএম এর কথা। আর নওগাঁর মানুষ এখনও অপেক্ষায়, আবার কবে জ্বলে উঠবে তাদের প্রিয় রেডিওটি!
২০১২ সালের ৮ মার্চ। নওগাঁ শহরের উকিলপাড়া উত্তরা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ভবনটির জানালা দিয়ে বিকেলের আলো পড়ছিল গায়ে। সেদিন প্রথম অনএয়ার হয়েছিল বরেন্দ্র রেডিও ৯৯.২ এফএম“নওগাঁর কণ্ঠস্বর” স্লোগান নিয়ে।
এ যেন কোনো সাধারণ রেডিও নয়; এটি ছিল তৃণমূল মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি স্বপ্ন, একটি কণ্ঠবানী। স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা যে বিষয়গুলো নওগাঁ তথা সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের জীবনে প্রতিদিন প্রভাব ফেলে, সেসব তথ্য সবচেয়ে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিত দেশের আঁনাচে কাঁনাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য বরেন্দ্র রেডিও।
লোকজ সংস্কৃতি, ভাষা, গানের ভাণ্ডার, বাউল-সংগীত থেকে শুরু করে তরুণদের করা নাগরিক সাংবাদিকতার গল্প সব মিলিয়ে এটি খুব দ্রুতই হয়ে ওঠে কমিউনিটির মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত আয়োজন।
রেডিওটির আওতায় ছিল নওগাঁর ১১টি উপজেলার মধ্যে ৮টি, পাশাপাশি বগুড়ার আদমদীঘি, রাজশাহীর বাঘমারা ও জয়পুরহাটের আক্কেলপুর। ৩৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ প্রতিদিন শুনতেন বরেন্দ্র রেডিওর অনুষ্ঠান। বিকেল ৩টা থেকে রাত ১২টা, নয় ঘণ্টার ধারাবাহিক সম্প্রচার। সপ্তাহে ৪২টি অনুষ্ঠান। যার বেশির ভাগই তৈরি হতো কমিউনিটির মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে। এ যেন ছিল নওগাঁর মানুষের নিজেদের কথা বলার একটি মঞ্চ।
বরেন্দ্র রেডিও শুধু বিনোদন নয়, ছিল সামাজিক রূপান্তরের একটি চালিকা শক্তি। কোথাও সরকারি সেবায় অনিয়ম হলে শ্রোতারা নিজেরাই জানাতেন। কোথাও কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি দরকার-রেডিও জানাতো পথ। স্বাস্থ্যসেবার হালনাগাদ তথ্য, ঠিক ঠিক সময়ে পৌঁছাত ঘরে ঘরে।
ফোন-ইন প্রোগ্রাম, এসএমএস, সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ- এসবের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও হয়ে উঠতেন সংবাদদাতা, উপস্থাপক, পরামর্শদাতা। যা বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিও ব্যবস্থায় এক বিরল উদাহরণ।
তরুণরা মেতে উঠেছিল পরিবেশ রক্ষা, নারী অধিকার, মানবাধিকার, দুর্যোগ প্রস্তুতি ইস্যুগুলো নিয়ে প্রচারণায়। বরেন্দ্র রেডিওর এভাবেই হয়ে উঠেছিল তথ্যের আলো, গণশক্তির ভাষা ও সমতার বার্তা বহনকারী এক নতুন সেতুবন্ধ।
স্বল্প সম্পদ, সীমিত সুযোগ নিয়ে এগিয়ে চলা সত্ত্বেও রেডিওটি অর্জন করে বহু সম্মান- ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড , গাল পাওয়ার অ্যাওয়ার্ড , জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট অ্যাওয়ার্ড এছাড়াও আরও বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার।
আর এসব সফলতার পেছনে ছিল একদল নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবক। বলা যায় যারা বিনা পারিশ্রমিকে, অশেষ ভালোবাসা নিয়ে, তৃণমূল মানুষের কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন অব্যাহতভাবে।
২০১৯ সালের ১৪ এপ্রিল বিকেলে বজ্রপাত। চোখের পলকে পুড়ে গেল নওগাঁ জেলার জনপ্রিয় বরেন্দ্র রেডিও ৯৯.২ এফএম এর মূল ট্রান্সমিটার যা রেডিওর সম্প্রচারের প্রাণ। সেদিনের পর থেকে আর শুরু হয়নি বরেন্দ্র রেডিওর নিয়মিত সম্প্রচার। মাঝে ফেসবুক-ইউটিউবে বিচ্ছিন্ন কিছু কার্যক্রম হলেও তাও বন্ধ হয়ে যায় ধীরে ধীরে। কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে রেডিওটি আজ পুরোপুরি নিস্তব্ধ।
শ্রোতারা বলেন- আমরা যেন নিজেরাই কণ্ঠহীন হয়ে গেছি। বরেন্দ্র রেডিও কি শুধু স্মৃতি হয়েই থাকবে? প্রশ্নের উত্তর গুলো আজও মেলেনি।
ছয় বছর পেরিয়ে গেছে, রেডিওর কক্ষে ধুলো জমেছে, স্টুডিওর মাইক্রোফোনগুলো চুপচাপ পড়ে আছে। কিন্তু মানুষের মন আজও জেগে আছে প্রশ্নে- আবার কি চালু হবে বরেন্দ্র রেডিও? আবার কি শোনা যাবে টুকটুক শব্দে ইথারের কণ্ঠস্বর? আবার কি গ্রামের মানুষের গল্প শহরে পৌঁছাবে, আর শহরের আলো পৌঁছাবে গ্রামে?
প্রত্যাশা আজও নিভে যায়নি। বরেন্দ্র রেডিওর প্রতিটি শুভাকাঙ্ক্ষী জানেন, একদিন না একদিন এই রেডিও আবারও আলোর মুখ দেখবেই। আবারও খুলবে মাইক্রোফোন, বাজবে সিগনেচার টিউন, তারুণ্যের কণ্ঠ ভেসে উঠবে বরেন্দ্রের বাতাসে।
নওগাঁর সেই প্রিয় কণ্ঠস্বর আজ নীরব হলেও মানুষের হৃদয়ের কান এখনও শুনে- একদিন আবার ফিরে আসবে বরেন্দ্র রেডিও ৯৯.২ এফএম। আবার আলোকিত হবে অন্ধকার ঘর, আবার জেগে উঠবে গ্রাম আর শহরের সেতুবন্ধন। একটি জেলার সামষ্টিক স্বপ্নে আবারও ফিরে আসবে নতুন পৃষ্ঠপিষোকতায়,নতুন আঙ্গিকে, নতুন রং এ, ও নতুন সুরে নওগাঁর কণ্ঠস্বর।
লেখক-
রিফাত হোসাইন সবুজ
গণমাধ্যম কর্মী।
সাধারণ সম্পাদক, জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন,নওগাঁ।

