সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: নূর-এ-আলম সিদ্দিক, বদলগাছী-মহাদেবপুর প্রতিনিধি ।
দেশের প্রত্যেক এলাকার স্থানীয় কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। এ ক্ষেত্রে বদলগাছী উপজেলা এর ঊর্ধ্বে নয়। বর্তমানে বদলগাছীর কিছু সমস্যা প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা প্রতিনিয়ত সামাজিক পরিবেশ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকারকে দারুণভাবে ব্যহত করছে।
১.যুব সমাজের অধঃপতন ও মাদকাসক্তি প্রবণতা:
যুব সমাজের মধ্যে মারাত্মক অধঃপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চারিত্রিক স্খলনের শেষ পর্যায়ে এসে এরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের মধ্যে গাজা, ভাং, চরশ, ফেন্সিডিল, তারি, চুয়ান এরা হরহামেশাই গ্রহণ করছে। যারা একবার এতে আকৃষ্ট হচ্ছে, তারা আর এর মরণ ছোবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সামাজিক লোক লজ্জায় পিতামাতা দগ্ধ হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। নিরূপায় কোনো কোনো পিতামাতা সন্তানের মৃত্যু কামনা করছেন, জেলহাজতে পাঠানোর প্রয়াস পাচ্ছেন। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুজতে হবে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গদের, সহযোগিতা চাইতে হবে প্রশাসনের।
২.ইভটিজিং
ইভটিজিং সম্প্রতিকালের বহুল আলোচিত একটি শব্দ। যদিও শব্দটি ইংরেজি অভিধানের গর্ভজাত, কিন্তু হালে এ শব্দটির সাথে আমরা বেশ পরিচিত হয়েছি। মেয়েদেরকে বিভিন্নভাবে উত্যক্ত করার নামই ইভটিজিং। বদলগাছীতে ইভটিজিংয়ের প্রকোপ ব্যাপক না হলেও এর নোংরা ছোবল যে বদলগাছীর মাটি স্পর্শ করেনি তা নয়। অভিভাবক আন্তরিক ও দায়িত্বশীল এবং প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হলে এ বিষফোড়া আংশিক হলেও কমবে।
৩.অভিভাবকদের উদাসীনতা :
কিছু কিছু অভিভাবক স্বজ্ঞানে অজ্ঞান। Carefully-carelessতারা হলো, মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে তাদেরকে পাকাপোক্ত পণ্ডিত হয়ে ফিরে পাবে এই ভেবে নাকে তেল দিয়ে বসে থাকেন। ছেলেমেয়ে আদ্যেও স্কুল-কলেজে যায় কিনা, অথবা পড়াশোনা ঠিকমতো করে কিনা, অথবা তারা কোথায় কিভাবে সময় কাটাচ্ছে— সে খোজটি নেবার প্রয়োজনও তারা মনে করেন না। ফলে বসন্তের এক সুন্দর সকালে জানা যায়, জনৈক ভদ্রলোকের অপরূপা মেয়েটি একটি বখাটে ছেলের হাত ধরে অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছে। উভয় পক্ষের বিশেষ করে মেয়ে পক্ষের অভিভাবকের মাথায় হাত দিয়ে গোপনে অশ্রু বিসর্জন করা ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। এ জাতীয় খুচরা সংবাদ প্রায়ই বদলগাছীর মুক্ত বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। অভিভাবকগণ অধিকতর সতর্ক না হলে বিপত্তিকর ধ্বস নামার সম্ভাবনা আছে। অবশ্য দু’একজন অতীব সতর্ক অভিভাবক মেয়েকে গার্ড দিয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে নিয়ে যান নিয়ে আসেন এরূপ দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যও আমাদের ভোতা দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে মাঝেমধ্যে।
৪.মোবাইল ফোনে উৎকট গান বাজানো
বর্তমান কালচার অনুযায়ী মোবাইল ফোন না থাকা লজ্জার ব্যাপার। আধুনিক সভ্যতার মধ্যগগনে, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার চরম পর্যায়ে একটি মোবাইল ফোন থাকবে না এ কেমন কথা? দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশাওয়ালা থেকে উপরতলা পর্যন্ত সকলেই এখন মোবাইল ফোনের অধীনস্ত। এক মুহূর্ত হাতে না থাকলে দম বন্ধ হবার উপক্রম। কিন্তু কচি-কাচাদের এ ফোনের দরকার আদ্যেও আছে কী না ভেবে দেখতে হবে! তার সঙ্গে আছে মন মাতানো মায়াময় ঝঙ্কার তোলা গান ‘আমার কাছে আগুন আছে, কাছে আয়না’ অথবা, ‘বাপই চ্যাংরা রে, গাছে চড়িয়া দুটা জলপাই পাড়িয়া দে’। আগে দেখেছি ও শুনেছি ছেলেরা কখনো কখনো মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শীষ দেয়, এখন দেখছি, মেয়েরাও শীষ দিতে শিখেছে। নারী স্বাধীনতার এ মহেন্দ্রক্ষণে, ডিজিটাল বাংলাদেশের শ্যামল অঙ্গনে মেয়েরা শীষ দেবে না তো কে শীষ দেবে? এখনো অভিভাবকগণ সতর্ক হলে সমাজের অনেক উপকার হবে বলে প্রাজ্ঞজনদের বিশ্বাস।
৫.প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার সংক্রমণ
এখন এমন একটা সময় প্রবাহমান— যখন প্রাইভেট টিউটর না রইলেও কোচিং সেন্টারে না পড়লে পাশ করা যাবে না বলে ধারণা জন্মেছে। অথচ ধারণাটি নির্ভুল নয়। এ ‘রক্তচোষণ’ পদ্ধতিটি চালু থাকায় পিতামাতা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন কিন্তু ফলাফল আশানুরূপ পাচ্ছেন না। প্রাইভেট পড়ানো ও পড়া বর্তমানে একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এ থেকে কতটুকু উপকৃত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা? একজন শিক্ষক ৩০/৪০ জন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে পড়ান— কি পড়ান তারা? ৬০ মিনিটে ৪০ জনকে একজন টিচার কি শিখাতে পারেন? অভিভাবকরা বিষয়টি ভেবেও দেখেন না। উপরন্তু, প্রতিযোগিতা করে প্রাইভেট টিউটরের সংখ্যা বাড়ান। পাচ ছয়জন শিক্ষকের কাছে পড়ে ক্লান্ত ছাত্রটি কি বাড়ি ফিরে পড়তে পারবে? প্রাইভেট পড়তে এসে শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে ছাত্রছাত্রী ‘হিশহিশ ফিসফিস’ করতে থাকে— এটা ভাবার সময় অভিভাবক-শিক্ষক কারোরই নেই। অভিভাবক টাকা দিয়েই শোধ—আর শিক্ষক টাকা নিয়েই শেষ। স্থানীয়ভাবে সমস্যাটি প্রকট হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষক মূল দায়িত্ব এড়িয়ে প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী হচ্ছেন। উপসর্গটি বদলগাছী তথা জাতির জন্য ক্ষতিকর। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিবেন আশাকরি।
৬.স্থানীয় বহিরাগত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব
বদলগাছী সদরে স্থানীয় বহিরাগত দ্বন্দ্বটি ‘স্লো-পয়জনের’ মতো অতি নীরবে সঙ্গোপনে অন্তঃসলিশার গতিতে কাজ করে চলেছে। অতী ‘সূক্ষ্ম’ এ দ্বন্দ্বটি যদি শীঘ্রই মূল্যোৎপাটিত না হয়, তবে বদলগাছীর সার্বিক উন্নয়ন অবশ্যই বিঘ্নিত হবে। এ ‘চক্রটি’কে সার্বিক মঙ্গল অর্জনের স্বার্থে এ তিন মানসিকা পরিহার করতে হবে এবং উদার মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে।
৭.রাস্তাঘাট ও পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যা
বদলগাছীতে পাকা রাস্তা থাকলেও যথাযথ সংস্কারের অভাবে তথা দলীয় ঠিকাদারের বদৌলতে কখনোই মানসম্মত সংস্কার হয় না। ফলে বছর-ছ’মাসেই বদলগাছী সদরের রাস্তাগুলো যানবাহন ও মানুষ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে খানা-খন্দকের সৃষ্টি হয়। এখানে উল্লেখ্য বদলগাছী যমুনা নদীর উপর এরশাদ আমলে নির্মিত বেলী ব্রিজটি আজও পড়ে আছে অযত্নে অবহেলায়। যদিও বদলগাছী থানার সামনে দিয়ে নতুন ব্রীজ নির্মীত হয়েছে তবে পুরুনো ব্রীজটি সংস্কার করে হালকা যানবাহনের জন্য উপযোগী করে তোলা যেতে পারে। বদলগাছীতে সুপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই, অথচ বিষয় অতীব জরুরি। স্থানীয়দের এটি একটি বিরাট সমস্যা। বর্ষাকালে কোনো কোনো বাড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এজন্য বদলগাছী পুরুনো ব্রীজ থেকে শুরু করে হাটখোলা বাজারের উপর দিয়ে যাওয়া প্রধান সড়কের এবং বদলগাছী চৌরাস্তা বাজার মোড়ের চারিপাশের রাস্তার ধারে স্থায়ীভাবে পানি নিস্কাশনের ড্রেন নির্মাণ করে সকল পানির প্রবাহ নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৮.বদলগাছী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অভাবনীয় দৈন্যতা
এর দৈন্যতা চোখে পড়ার মতো। সর্বদা ডাক্তারের ঘাটতি থাকেই। দন্ত বিশেষজ্ঞ নেই। বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি দিয়ে কাজ চলে। বালিশ বিছানা অধিকাংশ নোংরা-অপরিষ্কার,খাবার মান ভালো নয়। অ্যাম্বুলেন্স আছে, তবে মানসম্মত নয়, লক্কর ঝক্কর। মানুষ বুঝে ২/১ জনকে ওষুধ দিলেও, সাধারণ রোগীরা ২/১টা ট্যাবলেট ছাড়া ওষুধ পাননা। সময়মতো ডাক্তার আসেন বলে মনে হয় না। অভিজ্ঞতা তাই বলে। ডাক্তারের খোজ করলে সেবিকারা ডাক্তারের পক্ষে অশালীন ভাষায় উত্তর দেন, যা বিরক্তি কর। এলাকাবাসী সমস্যার সমাধান চান। মুক্তির সুবাতাস কবে বইবে, কেউ জানে না।
৯.তথাকথিত নয়া প্রজন্মের শিষ্টাচার ও শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি
অতি মেধাসম্পন্ন লোকেরা এটাকে আধুনিকতার নব্য অবদান বলে বিবেচনা করলেও বয়োজেষ্ঠদের মতো সাধারণ মানুষেরা অবশ্যই এটাকে একটা অবক্ষয়জনিত সমস্যা বলে মনে করেন। শ্রদ্ধাবোধ, সম্মান বোধ এবং শিষ্টাচার একজন মানুষের ভূষণ। অবজ্ঞা প্রদর্শণ, ধৃষ্টতা প্রদর্শণ কোনো গুণ নয়। এটা দাম্ভিকতা ও নগ্ন অহঙ্কারের চরম বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ছোটরা বড়দের শ্রদ্ধা করবে, সম্মান করবে, এটাই তো দীর্ঘদিনের লালিত সামাজিক নিয়ম। অবজ্ঞা প্রদর্শণ আমাদের কাম্য নয়। ধ্বংস হোক এ মানসিকতা, ফিরে আসুক শ্রদ্ধাবোধ আর শিষ্টাচার। এটাই সমাজের প্রত্যাশা।
(লেখাটি লেখতে মরহুম জালাল উদ্দিন, বদলগাছী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মহোদয়ের লেখার সাহায্য নেওয়া হয়েছে। আমরা সন্দেশের পক্ষ থেকে ওনার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।)
বদলগাছী উপজেলার স্থানীয় সমস্যার সমাধান কবে হবে !

53
পূর্ববর্তী খবর
