৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

পোরশা নামের উৎপত্তি

ডিএম রাশেদ

by sondeshbd.com
12 views

পোরশা উপজেলা বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা। পোরশা উপজেলার উত্তরে সাপাহার উপজেলা, দক্ষিণে গোমস্তাপুর উপজেলা ও নিয়ামতপুর উপজেলা, পূর্বে পত্নীতলা উপজেলা ও মহাদেবপুর উপজেলা, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। জেলা শহর নওগাঁ থেকে প্রায় ৭০কি:মি: পশ্চিম-দক্ষিণ কোনে অবস্থিত পোরশা মিনি শহর বা পোরশা উপজেলা। ১৭৯৩ সালে পোরশা অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে মালদা জেলার নবাবগঞ্জ মহকুমার একটি থানায় পরিবর্তিত হলেও দেশ ভাগের পর এটি অবস্থানগত কারণে নওগাঁ মহকুমায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
উপজেলা বা থানার নাম পোরশা হলেও উপজেলা পরিষদ, থানা ভবন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সকল সরকারী দপ্তর পোরশা সদর থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণ নিতপুরে অবস্থিত। কথিত আছে, উপজেলা পরিষদ, থানাসহ সরকারী দপ্তরগুলি পোরশা সদরে হলে চোর-বাটপারদের উৎপাত বেড়ে যাবে। তাছাড়া সরকারী অফিসাররা এখানে এসে মাতবরি করবে তাই সেই সময়ে পোরশা সদরে কোন অফিস করতে দেওয়া হয়নি। পোরশা সদর থেকে ৬কি:মি: উত্তর-পশ্চিম কোণে নিতপুরে উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মান করা হয়। এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সকল সরকারী দপ্তরগুলোও সেখানে নির্মান করে কার্যক্রম চালু করা হয়।
কথিত আছে, বহু বছর পূর্ব থেকে এ এলাকায় শাহু (শাহ্) বংশের বসবাস। শাহ্ বংশের লোকদের স্থানীয় ভাষায় শাহু বলা হয়। পোরশা শব্দটি কিছু হলেও সম্মানী অর্থ বহন করে। পোর শব্দটির অর্থ পরিপূর্ণ। আর শাহ্ শব্দটি এসেছে শাহানশাহ বা সম্ভ্রান্ত থেকে। শাহেনশাহে পরিপূর্ণ কথাটির সম্পূর্ণ রূপ হচ্ছে পোরশা। তবে নামটি সম্ভবত স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত হয়েছে। এই নামের উৎস সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য বা জনশ্রুতি পাওয়া যায়নি, তাই এটি একটি স্থানীয় নাম হিসেবেই বিবেচিত হয়। কেহ কেহ মনে করেন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ বছর আগে কিছু পারস্য জনগোষ্ঠী এখানে বসতি স্থাপন করেছিল এবং তাদের নামানুসারেই এই উপজেলার নামকরণ করা হয় পোরশা। এখানকার মানুষ শাহেনশাহে পরিপূর্ণ। এখানে মানুষ বসবাস করার পূর্বে অনেক বড় বড় বন-জঙ্গল ছিল, ছিল হিংস্ত্র প্রাণী।
বয়জষ্ঠ ব্যাক্তিদের নিকট থেকে জানা যায়, প্রায় ১৫শ সালের পরে কোন এক সময়ে তৎকালীন বাদশা আলমঙ্গীরের আমলে ইরান থেকে হিজরত করতে বাংলাদেশের বরিশালে আসেন কয়েকজন শাহ্ বংশের মুরব্বী। তারা হলেন ফাজেল শাহ, দ্বীন মোহাম্মদ শাহ, ভাদু শাহ, মুহিদ শাহ, জন মোহাম্মদ শাহ, খান মোহাম্মদ শাহ্। এদের সাথে আরও কয়েকজন সফরসঙ্গী ছিলেন তারাও একই বংশের মানুষ। সকলেই আসেন বর্তমান পোরশা সদরে। তারা এখানে ঘর বাড়ি নির্মান করে বসবাস করতে শুরু করেন। এদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে স্ত্রী-সন্তানও ছিলেন। পরবর্তীতে তাদের সন্তানদের নিজেদের পরিবারের ছেলে মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে বংশ বিস্তার করান। এবং এ প্রথাটি আর্থাৎ নিজেদের বংশের মধ্যে ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার প্রথাটি বর্তমানেও চালু রয়েছে পোরশায়। এখানে বসবাস করার পর থেকে এ এলাকার প্রচুর জমি জমা পেয়ে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখানে জমিদারীত্ব করেন। এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বর্তমানেও এখানে রয়েছেন।
উপজেলার দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান: নিতপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, হজরত বালা (রহ:) এর মাজার, নিতপুর বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন পূনর্ভবা নদীর তীর, আল জামিআ আল আরাবিয়া দারুল হিদায়াহ (পোরশা বড় মাদ্রাসা), পোরশা মিনাবাজার বড় মসজিদ সংলগ্ন মুসাফির খানা, নিতপুর সেতু, নিতপুর পালপাড়া(কুমারপাড়া) ঐতিহাসিক মৃৎশিল্প এলাকা।
আল জামি’আতুল আরাবিয়া দারুল হিদায়াহ-পোরশা বাংলাদেশের এই উপজেলাতেই অবস্থিত একটি কওমি মাদ্রাসা যা ‘পোরশার বড় মাদ্রাসা’ নামেও পরিচিত। ১৯৪৬ সালে ( প্রায় ৭৯ বছর আগে) স্থাপিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি স্থাপনা। উত্তরবঙ্গে সর্বপ্রথম এই প্রতিষ্ঠানেই ‘দরসে নিযামি’ শিক্ষাক্রমে পাঠদান এবং ‘দাওরায়ে হাদিস’ চালু হয়েছিল।
পোরশার প্রধান উৎপাদিত ফসল হচ্ছে ধান। পাশাপাশি রয়েছে যাবতীয় রবিশস্য। যেমন গম, বুট ও সরিষা। তবে বর্তমানে এই উপজেলা আমের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠছে।
সংক্ষেপে পোরশা উপজেলার তথ্য বিবরণী : উপজেলার আয়তন ২হাজার ৭২বর্গ কিলোমিটার। মোট জনসংখ্যা প্রায় ১লক্ষ ৫০হাজার। মোট ইউনিয়ন ৬টি। মোট গ্রাম ১শ ৮১টি। মৌজার সংখ্যা ১শ ৫৫টি। ইউনিয়ন ভুমি অফিসের সংখ্যা ৩টি। মোট জমির পরিমান প্রায় ৬৬হাজার ৫শ ৬৪ একর। খাস জমির পরিমান ৫হাজার ৫শ ৭৪ একর। খাস পুকুরের সংখ্যা ৪শ ৯২টি। হাট-বাজারের সংখ্যা ১০টি। সরকারী হাসপাতাল রয়েছে ১টি, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ৪টি। কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ১৩টি। আধুনিক ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স রয়েছে ৬টি। কাঁচা-পাকা মোট রাস্তা রয়েছে ৪শ ৬কিলোমিটার।

ডিএম রাশেদ

সাংবাদিক, পোরশা, নওগাঁ

আরো পড়ুন