৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

সন্দেশের দাদুভাই, নিভৃতের দেশ সেরা ফেরিওয়ালা

মিঠু হাসান

by sondeshbd.com
46 views

ছোট যমুনা নদীর ধারে, নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলা সদরের পুরাতন বেইলি সেতুর পাশে একটি টিনের ছাউনি। পাশ দিয়ে যানবাহন ছুটে যায়, ধুলো উড়ে।

অথচ সেই সাদামাটা দোকানেই জমে থাকে এক অন্যরকম ভিড়—কেউ দূর থেকে আসে, কেউ পথচলতি থেমে যায় এক টুকরো মিষ্টির জন্য। নাম তার “দাদুর সন্দেশ”।
কোনও চকচকে মোড়ক নেই, নেই বাহারি বোর্ড। কিন্তু স্বাদের এমন যাদু যে, এই সন্দেশ এখন বদলগাছী পেরিয়ে পৌঁছে গেছে পুরো দেশে— এমনকি বিদেশেও।
গল্পটা শুরু প্রায় ৪৫ বছর আগে। বদলগাছী উপজেলার কদমগাছি গ্রামের এক বৃদ্ধ আজিমুদ্দিন। সংসারের টানাপোড়েন, কিন্তু মনের মধ্যে ছিল শিল্পীর ছোঁয়া।

তিনি এক সময় জয়পুরহাট,দিনাজপুর জেলায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। তখনই সেখানকার কয়েকটি সন্দেশ ও মিষ্টি বানানোর কারিগরের সাথে পরিচয় হয়।

তারা কিভাবে এসব সন্দেশ ও মিষ্টি বানাতো তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতো। কাছে গিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, শুধু দেখতেন,কেমন করে দুধ ছানা হয়, কেমন করে চিনি মেশে।
একদিন সাহস করে নিজেই বানালেন এক নতুন স্বাদের সন্দেশ। দুধ, চিনি আর এলাচি। এরপর যা হলো, তা যেন এক মিষ্টি বিপ্লব। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল তার নাম—“দাদুর বানানো সন্দেশ।”
আজিমুদ্দিন এখন বয়সের ভারে ক্লান্ত। বয়স ৮৫। তবুও সকালবেলা বেইলি সেতুর পাশে তাঁর দোকানে বসে থাকেন। পাশে বড় ছেলে এবারত হোসেন (৬৫), যিনি এখন সন্দেশ বানানোর দায়িত্বে।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে দুধ জ্বাল, ছানা ঝরানো, এলাচি মেশানো— প্রতিটি ধাপে বাবার শেখানো নিয়ম মানেন তিনি। “বাবা বলেন, দুধ যদি টাটকা না হয়, তাহলে সন্দেশে প্রাণ আসবে না।”
প্রতিদিন তৈরি হয় ১৫ থেকে ২০ কেজি সন্দেশ। বিক্রি হয় দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার। লাভের অঙ্ক যাই হোক, তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষের প্রশংসা।

বদলগাছীর মানুষ জানে— দাদুর সন্দেশ মানে এক অদ্বিতীয় স্বাদ, এক মাটির ঘ্রাণ।
এই সন্দেশে নেই কোনও রঙ, নেই কোনও কেমিক্যাল। আছে শুধু দুধ, ছানা, চিনি, এলাচি— আর ভালোবাসা। এক কামড়ে যে স্বাদ পাওয়া যায়, তা যেন শৈশবের মিষ্টি দুপুরে ফিরে যাওয়া।
আজিমুদ্দিনের ছেলে এবারত হোসেন বলেন,“ বাবার বয়স হয়েছে। তিনি আর সন্দেশ তৈরী করেন না। তবে সব কিছু শিখেছি তার কাছ থেকে।

ভোরে যখন সন্দেশ তৈরীর কাজ শুরু করি। তখন তিনি পাশে বসে দেখেন। প্রচুর অর্ডার পাই। তাছাড়া এখানে দেখছেন তো কতো মানুষ এসে বসে সন্দেশ খাচ্ছেন।

দূর থেকে মানুষ এসে সন্দেশ নিয়ে যায়। কেউ আবার মোবাইলে অর্ডার দেয়। বাবার পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মানি। গ্রাম থেকে দুধ সংগ্রহ করি।

বাবার কড়া হুসিয়াড়ি ভেজাল মেশানো যাবে না। তার দেখানো পথেই চলছি।”
উপজেলা সদরের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন,“দাদুর সন্দেশ খেলে মনে হয়, আজও পুরোনো বাংলার স্বাদ বেঁচে আছে।”
পত্নীতলার থেকে দিনাজপুর যাচ্ছেন হোমিওপ্যাথিক ডা. এম এ রশীদ দাদুর সন্দেশের দোকানে এসে ১ কেজি সন্দেশ নিলেন।

তার সাথে কথা হলে তিনি বলেন,“ দাদুর সন্দেশ খুব নামকরা। ওনার বাবা এখানে সন্দেশ বিক্রি করতেন। এখন তার ছেলে করে।

আমি এদিক দিয়ে গেলে তার দোকানের সন্দেশ ছাড়া আমার চলে না।

তাই দূর পথ পাড়ি দিয়ে শুধু দাদুর সন্দেশ নেওয়ার জন্য আমি এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। ”
ধান ব্যবসায়ী চঞ্চল মণ্ডল বলেন,“বিয়েশাদি, উৎসব সব জায়গায় এখন দাদুর সন্দেশের চাহিদা।

বিদেশে থাকা বদলগাছীবাসীরা দেশে এলে এই সন্দেশ না খেলে মনে হয় সফরটাই অসম্পূর্ণ।”

মধ্যেপ্রাচ্য দেশ কাতার,সৌদিআরব,দুবাই এমনকি ইউরোপের দেশ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি,ফ্রান্সে গিয়েছে দাদুর সন্দেশ।

কেউ হাতে করে নিয়ে যান ভালোবাসার উপহার হিসেবে, কেউ নিজের গ্রামের মিষ্টি গর্বের প্রতীক করে।
আজিমুদ্দিন এখন দোকানে বসে শুধু দেখেন, ছেলে সন্দেশ বিক্রি করছেন। আশেপাশে লোকজন ভিড় করছেন।

তখন হয়তো ভাবেন“এটাই আমার সন্তানের উত্তরাধিকার— মিষ্টির ভেতরে ভালোবাসা রেখে যাওয়া।”
তাঁর চোখে মায়া, মুখে শান্তি। তিনি বদলগাছীর নাম দেশের মানচিত্রে লিখে দিয়েছেন এক কামড় সন্দেশের মধ্য দিয়ে।
দাদুর সন্দেশ আজ শুধু একটি মিষ্টি নয়— এটি এক গ্রামের গর্ব, এক দাদুর স্বপ্ন, আর এক প্রজন্মের শ্রমের প্রতীক।

টিনের ছাউনি দেওয়া সেই দোকানের ভেতরে যেন আজও ঘুরে বেড়ায় দুধের গন্ধ, মাটির উষ্ণতা, আর মানুষের ভালোবাসার গল্প।
মিঠু হাসান
লেখক ও সাংবাদিক, নওগাঁ

আরো পড়ুন