৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

একজন আবুল সরকারের বিকৃত আচরণের সঠিক বিচার, ও সমগ্র বাউল সমাজের দায়মুক্তি

আলভি হায়াত রাজ

by sondeshbd.com
35 views

বাউল: মিথ, গবেষণা ও ভুলবোঝাবুঝির ভেতর বাংলার এক লোকধারার পাঠ।

বাংলার সাধক-সংস্কৃতির গভীর স্তরে বাউল একটি বহমান ধারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাউলদের নিয়ে নানা তথ্য,

কিছু গবেষণা-নির্ভর, কিছু বিচ্ছিন্ন ব্যাখ্যা, সব মিলিয়ে এমন একটা চিত্র তৈরি হয়েছে যেন বাউলধারা শুধু যৌনাচার, গুপ্তাচার বা ধর্মবিরোধী আচরণের আরেক নাম।

প্রশ্ন হলো, এটাই কি বাউলধারার সম্পূর্ণ পরিচয়? নাকি আমরা গবেষকের টেক্সটের টুকরো টুকরো অংশ নিয়ে পুরো সংস্কৃতির ওপর একমাত্রিক রায় শুনিয়ে দিচ্ছি?

বাউলদের নিয়ে আলোচনায় যে বইগুলো বারবার উদ্ধৃত হয়- ড. আনোয়ারুল করিম, ড. আহমদ শরীফ, সুধীর চক্রবর্তী

কিংবা নেয়ামত আলীর গবেষণা- সেগুলো মূলত বাউলদের নানা শাখা, নানা দল, নানা আচারের বর্ণনা।

 

এই ধারার ভেতরে সুফি, বৈষ্ণব, সহজিয়া, নাথ, তান্ত্রিক, অসংখ্য রূপ। কোথাও দেহতত্ত্ব, কোথাও ভক্তিভাব, কোথাও আবার সত্যানুসন্ধানী গোপন সাধনা।

অথচ সাধারণ পাঠক অনেক সময় সব শাখার আচরণকেই “বাউলধর্ম” মনে করে সমগ্র বাউল সম্প্রদায়কে এক ফ্রেমে আটকে ফেলেন।

বাউল শব্দের উৎস: মিথ না প্রমাণ?

গবেষক আনোয়ারুল করিম প্রাচীন দেবতা ‘বাল’ এর সঙ্গে “বাউল” শব্দের যোগসূত্র খুঁজেছেন।

অপরদিকে অন্য গবেষকেরা বলেন, এটি “বাতুল” শব্দের রূপান্তর, সামাজিকভাবে অপ্রচলিত, নিয়মভাঙা, ‘পাগল’-জাতীয় মানুষদের নির্দেশ করে।

অর্থাৎ বাউল শব্দের উৎস কোনো একক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।

এটাই বাউলধারার প্রথম সত্য, এটি একরৈখিক নয়।

 

বাউলের ধর্মচর্চা: প্রতিষ্ঠানবিরোধী, কিন্তু ধর্মবিরোধী নয়-

গবেষণায় দেখা যায়, বেশিরভাগ বাউল ঐতিহ্যই সংগঠিত ধর্মের আচার অনুসরণ করে না। তবে অনেকে সুফি বা বৈষ্ণব ভাবধারার অনুসারী।

তারা মসজিদ-মন্দিরে নিয়মিত না গেলেও আধ্যাত্মিক সাধনায় ‘মানুষ ভজন’, ‘মানুষ ভক্তি’কে গুরুত্ব দেন, এই কথা বহু গানেই স্পষ্ট।

অথচ কিছু গবেষণাপাঠে যে তান্ত্রিক বা দেহতত্ত্বভিত্তিক সাধনার কথা এসেছে, তা মূলত বাউল-সহজিয়া-তান্ত্রিক এক ক্ষুদ্র অংশের বর্ণনা।

এটিকেই যদি পুরো বাউল সমাজের আচরণ মনে করি, তবে তা হবে অর্ধসত্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো সংস্কৃতিকে অপরাধী বানানো।

 

যৌনতত্ত্ব: বাউল সাধনার একটি অংশ, পুরো পরিচয় নয়

ড. আহমদ শরীফ বা সুধীর চক্রবর্তীর গবেষণায় বাউলদের দেহতত্ত্ব, যৌন প্রতীক বা মিথুনসাধনার উল্লেখ আছে।

সত্য, বাউলদের কিছু দলের সাধনাকেই দেহ-মানস-আধ্যাত্মিক রূপান্তরের পথ বলে মনে করা হয়।

সেখানে যৌনতার প্রতীকী ব্যবহার দৃশ্যমান। গানেও বহু রূপকের আড়ালে দেহতত্ত্বের ইঙ্গিত থাকে।

কিন্তু এটাও সত্য, বাংলার অন্তহীন গ্রামে যে বাউলরা গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের অধিকাংশই

এসব গূঢ় তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত নন। তারা লালনকে ‘মানুষ ধর্ম’-এর প্রতীক হিসেবে দেখেন, কোনো যৌনতান্ত্রিক দেবতা হিসেবে নয়।

 

গবেষণা উদ্ধৃতি কি সম্পূর্ণ সত্য?

কেউ কেউ উদাহরণ হিসেবে যে বয়ান তুলে ধরেন, যেখানে লালনকে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের আসনে বসানোর চেষ্টা করা হয়,

তা গবেষকদের মতে সমগ্র বাউল সমাজের ধারণা নয়, বরং কিছু বিচ্ছিন্ন অনুসারীর ব্যক্তিগত মত।

বাউলধারার মূল স্রোত মানবতাবাদ, দেহতত্ত্ব বা ভক্তিমূল্যের ওপর দাঁড়িয়ে;

সেখানে কোনোভাবে ধর্মীয় আকীদা পাল্টে দেওয়ার প্রচেষ্টা মূলধারার অংশ নয়।

তাই এসব পৃথক মতকে পুরো বাউলসমাজের বিশ্বাস হিসেবে প্রচার করা ভুল এবং বিভ্রান্তিকর।

এটি শুধু তথ্যগত অসঙ্গতিই তৈরি করে না, বরং ধর্মীয় অনুভূতি ও লোকসংস্কৃতির সম্পর্ককেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তেজিত করে।

তেমনই “রজ পান”, “প্রেম ভাজা”, “চন্দ্র সাধন”, এসব তান্ত্রিক আচরণও সব বাউলের নয়, বরং অতি-গোপন কিছু দলের।

গবেষকের কাজ হলো দুর্লভ আচারের নথিবদ্ধকরণ; সামাজিক বাস্তবতা হলো- এগুলো বাউলচর্চার মূলধারা নয়।

 

তাহলে বাউল কে?

লালনের ভাষায়,

“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”- এই মানবধর্মই বাউলদের মর্মকথা।

বাউল সেই মানুষ-

যে স্থাপত্য ধর্মের বদলে মানুষকে ঈশ্বর মনে করে (যা মুসলিম সমাজে ভীষণ ভাবে সমালোচিত)

যে প্রেমে মুক্তি খোঁজে,

যে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে গান গায়,

যে সমাজের কঠিন নিয়মের বাইরে দাঁড়িয়ে মানবিকতার শিক্ষা দেয়।

আর এই মানবিক, প্রতিবাদী, আত্মিক ধারাকেই বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছিলেন লালন।

 

শেষ কথা-

বাউলধারার ভেতরে যে যৌনতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব বা তান্ত্রিক আচার আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কিন্তু এটিকে একমাত্র, চূড়ান্ত এবং সবার ওপর প্রযোজ্য পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও গবেষণার ভুল পাঠ।

বাংলার বাউল-
একদিকে মরমিয়া দার্শনিক,
অন্যদিকে লোকসংস্কৃতির বাহক,
কোথাও তান্ত্রিক, কোথাও মানবতাবাদী,
কখনো দেহতত্ত্বে, কখনো ভক্তিভাবে-
এক বিশাল, বহুস্তরীয় মানবসঙ্গীতের প্রতিনিধিত্ব করে।

 

বাউলকে বুঝতে হলে তাই প্রয়োজন-
গবেষণার উদ্ধৃতির বাইরে গিয়ে মানুষের গল্প, গানের রাগ, আর বাংলার মাটির গন্ধমাখা সাধনাকে নতুন করে পড়া।

কারণ যে কোনো সংস্কৃতিকে টুকরো টুকরো পৃষ্ঠার বদলে পুরো মানুষের চোখে দেখলেই কেবল সত্য ধরা দেয়।

একজন আবুল সরকারের বিকৃত আচরণ বা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যকে সমগ্র বাউল সমাজের পরিচয় মনে করা যেমন ভুল, তেমনি অন্যায়ও।

কারণ, বাউলধারা নিজেই বহুস্তরীয়- মানবতাবাদী, আধ্যাত্মিক, ভক্তিমূলক এবং গভীর লোকজ ঐতিহ্যভিত্তিক।

সেখানে একজন ব্যক্তির মানসিক বিকৃতি বা অপরাধকে পুরো সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে তা শুধু বিভ্রান্তি ছড়ায় না,

বরং আলেম সমাজ, তথা সমগ্র মুসলিম সমাজের সাথে, বাউল সমাজের মধ্যকার সামাজিক দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই অপ্রয়োজনীয় বিভেদ শেষ পর্যন্ত সমাজে উত্তেজনা ও অস্থিরতার জন্ম দেয়, যা কারওই কাম্য নয়।

তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব- আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এমন অপরাধীর ব্যক্তিগত দায় ব্যক্তিকেই বহন করতে বাধ্য করা।

একজন আব্দুর রহমান যদি কোনো কুরুচিপূর্ণ, ধর্ম-অপমানজনক কথাবার্তা বলে থাকেন, তবে আইনগতভাবে তার বিচার হওয়াই উচিত,

যাতে সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়, মহান আল্লাহ, ধর্ম বা অন্য কোনো সম্প্রদায়কে অপমান করার নামে কেউ যেন

আর জঘন্য উসকানি দেওয়ার সাহস না পায়। এই ন্যায়বিচার যেমন সমাজের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে,

তেমনি সংরক্ষণ করবে বাংলাদেশের বহুস্বর সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নতা থাকে, কিন্তু সহাবস্থানই মূল মূল্যবোধ হয়ে দাঁড়ায়।

আলভি হায়াত রাজ
সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

আরো পড়ুন