৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৮ই জমাদিউস সানি, ১৪৪৭ হিজরি

চন্দ্রদাহ – পর্ব- ০৩

জিল্লু র রহমান শুভ্র

by sondeshbd.com
26 views

চন্দ্রদাহ – পর্ব- ০৩

 

সাবিত্রী’র বাবা নিত্যানন্দ চ্যাটার্জী, কম করে হলেও তার বয়স পঞ্চান্ন’র উপরে।
সুঠাম দেহ এবং ক্রিম বর্ণযুক্ত ত্বক! উন্নত নাসিকা! খাঁটি ব্রাহ্মণের রক্ত তার ধমনীতে।
দেশভাগের হেজিমনিক আখ্যান তার জানা। সেই সময় তিনি তার মুসলিম সহপাঠী কর্তৃক
শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন এবং তাদের পরিবার একসময় ধর্মীয় উগ্রবাদের শিকার
হয়েছিল। সেই থেকে তিনি গান্ধীর মতো ’অহিংস নীতিতে’ বিশ্বাসী, তবে বিভ্রান্তকরভাবে
রক্ষণশীলও বটে। দুই মেয়ে ছাড়া তার কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। অতএব, তিনি
তাদের সুরক্ষায় যথেষ্ট সজাগ ও বদ্ধপরিকর।
পুজো-টুজো সেরে ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন দু’হাত পেছনে
জোড়বদ্ধ রেখে। সাবিত্রী তখনো ফিরে আসেনি। রাতে, স্বাভাবিকভাবেই, কোনো উৎসব
না থাকলে এতক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকত না সে। তাছাড়া, ‘নাইট কালচার’ তখনো ঢাকা
শহরে গড়ে ওঠেনি। তিনি যেহেতু উচ্চবিত্তের মানুষ কিংবা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ বাহক
ছিলেন না, তাই হতাশা তার কপালের বলিরেখায় স্পষ্ট হলো এবং তার মেয়ের প্রতি
দায়বদ্ধতার এক দৃঢ় অনুভূতি তার বুকের উপর দিয়ে শিস দিয়ে গেল। বুকের শিরশিরে
তাণ্ডবে স্থির থাকতে পারলেন না, কনিষ্ঠ কন্যাকে ডাকলেন তিনি। “রাত্রি—রাত্রি—”
রাত্রি ছিল হাইস্কুলের শিক্ষার্থী। বৈচিত্র্যময় সুতির ফ্রক এবং চোগা পরে ছিল সে।
তার চুল ছিল ছোট ছোট থোকায় কুঞ্চিত করা। হাইস্কুল পড়ুয়া মেয়েদের এমনিতেই
সুন্দর দেখায়। সুন্দর পোশাক পরলে আরো সুন্দর। তাকে দেখাচ্ছিল বার্বি পুতুলের মতো
আড়ম্বরপূর্ণ। পড়াশোনা করছিল সে; পাঠ্য বইটি বন্ধ করে বাবার কাছে এসে জিজ্ঞাস
করল, “বাবা, ডেকেছ?”
“হ্যাঁ, ডেকেছি।” তিনি তার মুখ মেয়ের দিকে ফেরালেন। “তুমি কিছু জানো?”
“বাবা, কোন বিষয়ে?” জানতে চাইল সে। একটু দ্বিধায় ভুগে, পরক্ষণে বলল,
“আমি নিশ্চিত নই।”
“তোমার দিদির কথা! কেন সে এখনও ফিরে আসছে না?” খুব উত্তেজনা তার
মধ্যে।
দিদিকে তার বাবা যতটা না ভালোবাসত তার চে’ বেশি ভালোবাসত সে। বাবা তার
দিদিকে যাতে বকা দিতে না পারেন কিংবা দিদির উপর বাবার রাগের যে মাত্রা তা লাঘব
করতে হঠাৎ সে একটা আষাঢ়ে গল্পের অবতারণা করল।
“বাবা, আজ না আমাদের স্কুলে একটি কোলাব্যাঙ ঢুকে পড়েছিল। আমরা সকলেই
ভয় পেয়েছিলাম।” কেউ মিথ্যাচারে অভ্যস্ত না হলে মিথ্যা বলাটাও কঠিন। গলা জড়িয়ে
যাচ্ছিল তার, ঢোক গিলে আবার বলল সে, “চারদিকে কী ছোটাছুটি!”
বিভিন্ন অভিজ্ঞতাই মি. চ্যাটার্জীকে শিখিয়েছে কে মিথ্যা বলছে আর কে নয়? তিনি
অনুমান করলেন তার মেয়ে তার দিদিকে আড়াল করার জন্য বানোয়াট গল্প বলছে। এমন
ভাব দেখালেন তিনি মোটেই রাগান্বিত নন; বরং মেয়েকে বোঝালেন তিনি একজন ভালো
শ্রোতা, “ইন্টারেস্টিং! তার পরে?”
“তারপর আর কী?” হাই তুলল সে, “হঠাৎ একটা সাপ সেখানে এসে পড়ল।”
মেয়ের তরতাজা মিথ্যা কথায় না হেসে পারলেন না তিনি। হাতের আঙুল পটাপট
ফোটালেন, তারপর মজা করে বললেন, “এবং সেই সাপটি আমাদের বাড়িতেও এসেছিল,
তাই না?” এবার তিনি মেয়েকে কানমলা দিতে কসুর করলেন না। কানে বিষম ব্যথা
পাওয়ার ভান করে উঠল রাত্রি, “আঃ ছাড়ো! বাবা, খুব ব্যথা পাচ্ছি!”
মেয়েকে সামান্যতম আঘাত করা বা চটিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্য ছিল না তার। মেয়ের
কান ছেড়ে দিলেন। এটি ছিল বাবা-মেয়ের পবিত্র সম্পর্কের খুনসুটি মাত্র।
গোয়েবলসীয় কায়দায় মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বাবার উদ্দেশ্যে ছেলেমি করে
আবার বলল সে, “আমি যদি মিথ্যা বলে থাকি মৃত্যুর পর আমার লাশ যেন শেয়াল খেয়ে
ফেলে।”
মি. চ্যাটার্জী হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “মৃত্যুর পর নয় এখনই খেলে
ভাবব আমার মেয়ে ভালো মিথ্যা কথা বলতে পারে। শেয়াল ডাকব?”
বাবার সঙ্গে না পেরে রাত্রি সুড়সুড় করে তার পড়ার টেবিলে ফিরে এল।
মি. চ্যাটার্জী এতক্ষণ পর আরামকেদারায় কেবল আরাম করে বসেছেন, এমন সময় তার
স্ত্রী ঢুকলেন। তার ত্বকের বাহারে ছিল চাপিলা রঙের প্রগলভতা। মেদহীন টানা শরীরের
কারণে তার বুকের চৌহদ্দিতে বসন্তের উন্মত্ততা এতটুকু কমেনি। তবে সর্ষে যেমন
ভুত থাকে তেমনি তার কালো চুলের বহরে দু-চারটে পাকা চুলের ভুত দেখা যাচ্ছিল।
জরিসহ লাল পেড়ের সুতি শাড়ি এবং লম্বা হাতওয়ালা ব্লাউজ পরে ছিলেন তিনি। থেকে
থেকে, তার কাঁচের চুড়ি খুব সাবধানতার সাথে ঠুং-ঠাং বাজছিল। তবে মিসেস চ্যাটার্জী
তার চুড়ির মতো সাবধানী ছিলেন না, একেবারেই উল্টো। অসন্তোষজনকভাবে সরব।
দোষারোপের বাঁশি বাজিয়ে স্বামীকে উত্তেজিত করতে চাইছিলেন তিনি।
“ধাড়ি মেয়ে! এখন পর্যন্ত বাইরে আছে সে। তুমি কি পরচ্ছিদ্রান্বেষী প্রতিবেশীদের
গসিপ থামাতে পারবে?” চিন্তিত সুরে বললেন তিনি, এবং আরো সংযোজন করলেন,
“তাছাড়া দেশের পরিস্থিতি মোটেই ভালো না। একটি কালো মেঘ আকাশে উঁকি দিচ্ছে।
কে জানে কী হতে যাচ্ছে!”
তাদের কথোপকথন অবিশ্বাস্যভাবে রাত্রি’র মনোযোগ কেড়ে নিল। সে তার কান
সতর্ক রাখল নিবিড়ভাবে।
মি. চ্যাটার্জী তার স্ত্রী’র ভ্রুকুটিত মুখ দেখলেন। তবে তিনি ঘাবড়ালেন না। বরং
স্ত্রীকে টেনশনমুক্ত করতে বললেন, “কিছুই হবে না। সে আমাদের লক্ষ্মী মেয়ে। রাত্রি’র
চেয়ে অনেক অনেক বাস্তববাদী।”
রাত্রি অবশ্যই মায়ের প্রশ্ন শোনেনি, তবে বাবার উত্তর। তার কী হলো, হঠাৎ
দিদির প্রতি ভয়ঙ্করভাবে ঈর্ষাকাতর হয়ে উঠল সে। তার মনে হলো বাবা তার দিদিকে
অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তাকে গুরুত্বের অন্ধকার কোণে ঠেলে দিচ্ছে। এ থেকে
পরিত্রাণের আশায় তার দিদির প্রতি তার যে উপচানো দরদ, আবর্জনার মতো তা ছুঁড়ে
ফেলল। বাবার কাছে এসে অপরিণত মেয়ের মতো ভূত-ভবিষ্যৎ না ভেবে, তড়বড়িয়ে
বলল সে, “বাবা, তোমার ধারণা একদম ভুল। দিদি, সম্ভবত কোনো মুসলিম ছেলের
প্রেমে পড়েছে।”
থলের বেড়াল বেড়িয়ে পড়ায় মি. চ্যাটার্জী যতটা বিস্মিত তারচে’ বেশি ক্ষুব্ধ। এটি
তার আত্মাভিমানী অন্ত্রকে স্পর্শ এবং কুল চিহ্নকে আঘাত করল। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে
স্মরণাতীতকাল থেকে যে জাতিগত দ্বন্দ্ব চলে আসছিল তার অভিঘাত তাকে নাড়িয়ে দিল
প্রবলভাবে। একজন ন্যাড়া মুসলমানের প্রতি মেয়ের টান ও পারিবারিক সম্মান হারানোর
ভয়ের মিশেলে তৈরি হলো এক ভয়াবহ আতঙ্ক এবং সেই আতঙ্কে তিনি যেন ভূপাতিত
হলেন। কিছুক্ষণ পরে আতঙ্ক কাটিয়ে ভূপাতিত অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। মনটা
শক্ত করলেন। তারপর কড়া মেজাজে রাত্রিকে চেপে ধরলেন, “তুমি কি তাকে চিনতে?”
“সে দিদির সহপাঠী,” উত্তর দিল সে, মাথা নিচু করে।
মেজাজ হারিয়ে তার গালে চড় মারলেন, হঠাৎ এবং মনস্তাপে। “আগে বলোনি
কেন?” রাগের পারদ তার বেশ উপরে।
রাত্রি প্রথম হতবাক, তারপর গেঁয়ো ভুতের মতো কাঁদতে লাগল সে। মা পাশে টেনে
নিলেন তাকে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে, তিরিক্ষি মেজাজে, “ওর দোষ কী? বড় মেয়ে ভুল
করেছে ফিরে এলে তাকে শাস্তি দাও!” এবার তিনি তার বৈচিত্র্যময় সুতির শাড়ির আঁচল
কোমরে জড়িয়ে নিলেন। তার মেজাজও সপ্তমে, “মেয়েটার অধঃপতনের জন্য তুমি দায়ী!
সর্বদা তাকে বিরক্তিকরভাবে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছ!”
স্ত্রীর তিরস্কার হজম করে কিংবা তার নিজের ভুল যখন ভুল শুধরে দিল, তখন তার
রাগের পারদ নিচে নামল। মুখ লুকানোর ভঙ্গিতে বললেন, “ঠিক আছে! আমি দেখছি!”
পরক্ষণে, মুখ উঁচিয়ে, “যাই হোক, সম্মান জলে ডোবার আগেই তাকে ফেরাতে হবে।”
মেয়ের ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন তিনি। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়ি
ফিরলেই তাকে এ বিষয়ে কঠিন ভর্ৎসনা করবেন।
হঠাৎ ডোরবেল ভুতুড়ে শব্দ করে বেজে উঠল।
মা এসে দরজা খুললেন। সাবিত্রী আলুথালুভাবে বাড়িতে ঢুকল; তারপর সরাসরি
তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। পুরো দিনটি কাটিয়েছিল সে একই পোশাকে,
ফলে তার অস্বস্তিবোধ হচ্ছিল। মেলা থেকে কেনা তার পোড়ামাটির অলঙ্কার খুলল এক
এক করে, তারপর চেইন টেনে যেমন তার পোশাক খুলল তেমনি শুভ্র ও মসৃণ দেহে
আঁকড়ে থাকা তার প্যাডযুক্ত ব্রা’র আঁকড়ি খুলে ফেলল। এটা ঘামের দুর্গন্ধে হাঁপাচ্ছিল।
নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ শুকল, তারপর নাক-মুখ বিকৃত করে ঠিক জায়গায় না রেখে
ছুঁড়ে মারল মেঝেয়।
হঠাৎ দরজায় নক।
“পোশাক বদল করে আসছি,” সাবিত্রী বলল, ভেতর থেকে।
বাবা একটি বাহুহীন চেয়ারে বসেছিলেন ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং দিয়ে এবং তার চোখ ছিল
অর্ধনিমীলিত। যখন তার চোখ অর্ধনিমীলিত থাকে, বাড়ির সবাই ভয়ে ভয়ে থাকে।
একটু পরে সাবিত্রী সেখানে এল। কিন্তু তার কলিজায় কোনো ভয়-ডর ছিলনা; বরং
একটি আত্মবিশ্বাসী মনোভাব। বঙ্গবন্ধু’র বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে টগবগ করছিল সে।
বাবার সামনে বসার জন্য বাধ্যবাধকতা বোধ করল না। বাবা কী ভাবছিলেন সে-সবের
তোয়াক্কা না করে, বলল সে, “বাবা, তুমি জেনে খুশি হবে, আজ আমরা বঙ্গবন্ধু’র
বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।”
বঙ্গবন্ধু’র নাম শুনে তিনি তার অর্ধনিমীলিত চোখ প্রসারিত করে তাকালেন, যেন
অন্ধকারে হঠাৎ দুটো নেভানো তারা জ্বলে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়ের
বসার জন্য পাতলা আস্তরণ দেওয়া একটা কাঠের চেয়ার খুঁজে নিয়ে নিজেই তার দিকে
এগিয়ে দিলেন। ততক্ষণে তার আক্রমণাত্মক মেজাজ শীতল থেকে শীতলতর। উচ্চবাচ্য
তো দূরে থাক, এমন ভাব করলেন যেন তিনি তার মেয়ের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে
কিছু শোনার জন্য অধীর আগ্রহে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। এর আগে এই বাড়িতে যা
ঘটেছিল এবং পরে যা ঘটার সম্ভাবনা ছিল তা কেবল একটি গুরুতপূর্ণ ও মাধুর্যময় নামের
কারণে সব অনুচ্চারিত থেকে গেল।
মি. চ্যাটার্জী মুক্ত মনে বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করতেন এবং বিশ্বাস করতেন এই দেশ
কেবলমাত্র তাঁর ম্যাকিয়াভেলিয়ান নেতৃত্বে এবং ব্যক্তিগত ক্যারিশমেটিক গুণের কারণে
একদিন স্বাধীনতা অর্জন করবে। তদুপরি, তারা, বিশেষত হিন্দুরা, তার অসাম্প্রদায়িক
কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে তাদের ত্রাণকর্তা বলে মনে করে। যেহেতু তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন
এদেশে বাঙালিদের মধ্যে, এখানকার মাটি ও জনগণই তার রাজনৈতিক অনুশীলনের মূল
উপাদান। তার লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন সমাজ—যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং
খ্রিস্টান সম্প্রদায় নিরাপদ। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর যে-সমস্ত হিন্দু এদেশ ছেড়ে চলে
যায়নি—নদীকে ভালোবেসে—বনকে ভালোবেসে— জনগণকে ভালোবেসে—সংস্কৃতিকে
ভালোবেসে, তারা শাসিত হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা। এবং
তারা কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত ছিল। এমনকি, পাকিস্তানি শাসকরা বাতিল করেছিল
রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান তার হিন্দু পরিচয়ের কারণে। সংখ্যালঘুরা
তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। সুতরাং তারা ভাবত, বঙ্গবন্ধু একমাত্র,
যিনি স্বাধীনতা আনতে পারবেন এবং পারবেন ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে অসামঞ্জস্য,
ধর্মীয় অনুসারীদের মধ্যে বৈষম্য এবং শ্রমিকদের মধ্যে মজুরির বৈষম্য দূর করতে। পৌর
ও সম্মুখসারীর পুরুষদের মধ্যে পার্থক্য কমাতে। এদেশ একদিন স্বর্গরাজ্য হবে।
“তোমার সাথে আর কে কে ছিল এবং তোমাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন?”
জিজ্ঞাসা করলেন তিনি, বেশ কৌতূহলী হয়ে।
“ভার্সিটির বন্ধুরা ছাড়া কেউ ছিল না। বাইরের বলতে শুধু একজন, তোফায়েল
স্যার। তাকে স্পেশাল ধন্যবাদ, এটি সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র তার কারণে।” তার কণ্ঠে
কৃতজ্ঞতার সুর। “মানুষ হিসাবে তিনি অতুলনীয়। এক কথায়, তিনি একজন এক্সট্রা
অর্ডিনারি ম্যান।”
“তোফায়েল আহমেদ তো?” তিনি ক্যাচ করলেন। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “যদিও
তিনি অন্ধকার ছায়ায় রয়ে গেছেন; তবে তার মধ্যে রাজনৈতিক ওয়ান-আপম্যানশিপ
রয়েছে একজন মহান নেতার মতো। সেই হিসাবে আমি বলতে পারি কোনো একদিন
তিনিও একজন দুর্দান্ত নেতা হিসাবে আবির্ভূত হবেন।”
মিসেস চ্যাটার্জী স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে অন্য সুরে গাইতে দেখে ভিরমি
খেলেন। বেশ জোরেই কনুয়ের গুতো দিলেন তাকে, “ওম-মা! এতক্ষণ তোমার তবলা
বাজছিল ভৈরবী তালে, এখন বাজছে পূরবী তালে। কারণটা কী?”
মি. চ্যাটার্জী ভুলো মনের মানুষের মতো আচরণ করলেন। মেয়ের বিরুদ্ধে আনীত
ভঙ্গুর অভিযোগ হেসে ওড়ালেন। বঙ্গবন্ধু’র আলোচনায় নিজেকে জড়াতে বেশি তৎপর
তিনি।
“বাদ দাও পচা কথা! চলো খেতে বসি! রাত হয়েছে।” সবাইকে ডাকলেন।
এটি ছিল একটি টাইট ডাইনিং রুম এবং এখানে ছিল একটি আয়তক্ষেত্রীয় টেবিল
যার উপর তাদের সাধারণ খাবার (ভাত, মসুরের ডাইল, ছোট মাছের চচ্চড়ি, মশলা
সহকারে আলুভর্তা এবং শসা সালাদ) সাজানো ছিল। গৃহিণীকে বাদ দিয়ে তারা খাবার
খেতে সেই টেবিলের চারপাশে বসল। গৃহিণী তাদের প্লেটে তাদের খাবার পরিবেশন
করলেন।
তারা খেতে শুরু করল।
খেতে খেতে, মি. চ্যাটার্জী সাবিত্রী’র দিকে তাকালেন, “যদি আবার কখনো
বঙ্গবন্ধু’র বাড়িতে যাও, আমাকে সঙ্গে নেবে। তার পবিত্র পায়ের ধুলো আমি নিতে চাই।
আমি এখন পর্যন্ত যাদের দেখেছি তাদের মধ্যে তিনি একজন দুর্দান্ত মানুষ এবং আলোকিত
তারকা।”
তৎক্ষণাৎ একটি টিকটিকি হঠাৎ ডেকে উঠল—টিক-টিক-টিক-
“আমি আমার কথায় ঠিক আছি,” হাসলেন তিনি, ”টিকটিকিও আমার সাথে
সহমত।”
“তিনি কেবল একজন মহান ব্যক্তি নন, তিনি কেবল এক আলোকিত নক্ষত্রই
নন; আমার ধারণা তিনি রক্ত-মাংসের দেবতা, অন্তত আমার কাছে। আমি তাকে খুব
বেশি ভালোবাসি!” সাবিত্রী বলল জোরালো কণ্ঠে। এবার বাবার দিকে তির্যক তাকিয়ে,
“যে বাঙালি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত, তাকে মানসিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ মানুষ হিসাবে
বিবেচনা করা উচিত।”
“ঠিক বলেছ!” সমর্থন করলেন তিনি, দারুণভাবে, “আমারও তাই মনে হয়!”
“যাদের শেকড় এই দেশের মাটিতে প্রোথিত, তারা পারেনা পারবে না। যারা
অন্য গ্রহের মানুষ তারা হয়ত পারে বা পারবে।” সাবিত্রী সেই সমস্ত কূপমণ্ডূক বাঙালি
যারা বঙ্গবন্ধুকে অকারণে খাটো করতে চায়, তাদের বিভ্রম চূর্ণ-বিচূর্ণ করে চূড়ান্ত সত্য
উপস্থাপন করল। “বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধুই। কেউ তার জায়গা দখল করতে পারবে না। আমি
মোটেও তার সম্পর্কে বাড়িয়ে বলছি না। যা বলছি তা সাদার মতো সত্য।”
রাত্রি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল বঙ্গবন্ধুর মতো মহান মানুষ সম্পর্কে। তার প্রশংসিত
ইমেজ তার মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল হয়ত, হঠাৎ সে খেয়ালি আবদারে তাড়িত হলো।
বলল, “বাবা, আমিও তোমার সাথে যাব। টিচারদের কাছ থেকে তার সম্পর্কে অনেক
কিছু শুনেছি। এ-ও শুনেছি, তিনি বাচ্চাদের অনেক আদর করেন।”
‘‘যদি সেখানে যেতে পারতাম, তবে অন্যের চেয়ে নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান
মনে করতাম,” বললেন তিনি, হতাশ সুরে।
“এটি একটি চমৎকার আবেদন!” সাবিত্রী হালকাভাবে বলল, “সময় মানুষকে দূরে
ঠেলে রাখে আবার কাছেও ডাকে। উপযুক্ত সময় আসুক!”
খাওয়ার পরে তারা ঘুমাতে গেল।
সাবিত্রী ও রাত্রি, দু’বোন একই ঘরে ঘুমাত। একটি লম্বা ঘর, স্যাঁতসেঁতে মেঝে
(শীতকালে তাদের চপ্পল এবং গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা মোজা পরতে হত)। দু’পাশে দুটো
সিংগেল খাট। খাটের পাশাপাশি দুটো পড়ার টেবিল, বইয়ে গাদাগাদি। কোথাও কোথাও
সস্তা আসবাব নার্সিংয়ের অভাবে বিষণ্নভাবে ঘুমিয়ে। গাঢ় হলদে-বাদামি রঙের ফ্রেমে বাঁধা
বিভিন্ন দেব-দেবীর ছবি দেয়ালে ঝুলানো। ভেতরে আলো-বায়ু প্রবেশের জন্য কেবল দুটি
ধনুকাকৃতি জানালা। যখন সূর্য অধিকতর ভালো বোধ করত তখন তার রশ্মি ভেতরে
পাঠাত, নচেৎ নয়। ঝুলকালি ও রহস্যময় অন্ধকারের সঙ্গে মাকড়সা ও টিকটিকির সখ্যতা
দেখার মতো।
দু’ধারে পুরনো আমলের এবং প্রায় অচল দুটো সিলিংফ্যান অযাচিতভাবে ঘর্ঘর শব্দ
করছিল যেন দুই বোন তাদের পিত্তি জ্বালিয়ে দিয়েছে। তারা ঘুমানোর চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ ফোস্কাপড়া গরম সেই রাতকে নাকাল করছিল। ফ্যানের বাতাস মশারির ফাঁক দিয়ে
ভেতরে ঢুকতে এক প্রকার যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল; ফলে দু’জনেই ঘামছিল। সাবিত্রী যতটা
গরমে নাকাল ছিল তারচে’ বেশি মাত্রায় ক্লান্ত ছিল। ঘুমের কাছে দ্রুত নিজেকে সঁপে দিল
সে। আর রাত্রি! ঘুমকে ডাকছিল খুব আদর করে; কিন্তু হারামি ঘুম বেহায়াভাবে তাকে
অগ্রাহ্য করে যাচ্ছিল। ফলে, বিশ্রীভাবে, আজেবাজে চিন্তা তার মনে উদয় হচ্ছিল। বাধ্য
হয়ে বিছানা থেকে উঠে বসল সে, কিন্তু নিচে নামল না।
মশারি সরিয়ে পা নিচে ঝুলিয়ে বসল এবং দীর্ঘক্ষণ ভাবল তার দিদির কাছে
গিয়ে তার ঘুম ভাঙানো ঠিক হবে কিনা? ভাবনার অনেক দোলাচলের পর, শেষ পর্যন্ত,
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না সে। দিদির ঘুম ভাঙানোর কথা ভাবল। নিচে নামল
এবং চুপিসারে হাঁটতে লাগল। কিন্তু যখন সে তার দিদির বিছানার কাছাকাছি পৌঁছুল,
দারুণভাবে হতাশ হতে হলো তাকে। কারণটা সহজেই অনুমেয়, তার দিদি ঘুমের মধ্যে
গভীর নাক ডাকছিল। এমন বেঘোর ঘুম ভাঙাতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। অগত্যা
আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছিল সে। ঘন অন্ধকার ঘরটিকে শাসন করছিল বলে হঠাৎ করে
ড্রেসারের সঙ্গে ধাক্কা খেল এবং তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুদ্র মনোহারী সামগ্রী, কাঠের গামলা,
ক্রোকারিজ, সস্তা অলঙ্কার, স্টেইনলেস ছুরি, কাঁটা চামচ এবং আজেবাজে কিছু জিনিস
যেন একসাথে চিৎকার করে উঠল।
এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল, হঠাৎ এলোপাতাড়ি চিৎকারে সাবিত্রী’র ঘুম ভেঙে গেল।
“কে রে?” পাশ ফিরল সে।
“দিদি, আমি,” রাত্রি দ্রুত উত্তর দিল।
তার বাধ্য ঘুম অবাধ্যের মতো পালিয়ে গেলে রাত্রিকে দেখে অবাক হলো সে। “তুই!
এখানে কী করছিস?” জিজ্ঞাসা করল, বালিশ থেকে অর্ধেক মাথা তুলে।
“কথা বলতে এসেছিলাম,” রাত্রি উত্তর দিল, কাঁপা স্বরে।
“চিন্তা করিস না! কী বলতে চাস, বল।” আগ্রহ নিয়ে উঠে বসল সে।
রাত্রি জবাব না দিয়ে সহজেই চিরপরিচিত সুইচ বোর্ডে গিয়ে সুইচ অন করল। বাদাইমা
অন্ধকার দূর হলে আস্তে আস্তে দিদির কাছে এসে মশারি সরিয়ে তার পাশে বসল সে।
“এক গ্লাস জল,” বলল সাবিত্রী, ঘুমজড়ানো কণ্ঠে।
রাত্রি জল আনতে গেল। কলস ছিল ডাইনিং রুমে। দরজার ফাঁক দিয়ে ধূর্ত চোরের
মতো আসা আলোয় কলসটা আবছা দেখা যাচ্ছিল, গ্লাসে জল ঢেলে নিয়ে আবার ফিরে
এল সে। সাবিত্রী তাড়াতাড়ি জল গলায় ঢালল এবং তারপর শিথিল ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল
রাত্রি’র দিকে।
রাত্রি সাহস পাচ্ছিল না তার দিদিকে জিজ্ঞাসা করবে কিনা! খুকখুক করে কাশছিল
সে।
“কী বলবি, বল?” সাবিত্রী জিজ্ঞাসা করল।
রাত্রি কী কারণে এত ভীতুর ডিম হলো বলা মুশকিল। সে যে-কথা বলতে চেয়েছিল
তা না বলতে পেরে হাস্যকর কথা বলল।
“দিদি, জল কেমন লাগল?”
“ধুর পাগলি! জল জলের মতো, আবার কেমন লাগবে?”
“না, ঠান্ডা না গরম, তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম।”
“আমরা মানুষই গলে যাচ্ছি, আর জল…”
সাবিত্রী’র হঠাৎ মনে হলো সে অন্যকিছু বলতে চায়। অভয় দিল সে, “কী বলতে
চাস, বল? জল পানের পর মুড ভালো আছে।”
রাত্রি দুনু-মুনু না করে এবার তার মনের কথা বলে ফেলল। “মানুষ হিসাবে তোমার
বন্ধুটি কেমন?”
“আমার অনেক বন্ধু আছে। কাকে বাদ দিয়ে কার নাম বলব?” বলল সাবিত্রী,
“যাকে সন্দেহ করছিস তার নাম ডাইরেক্ট বল।”
অহেতুক বা আনাড়ি ভয়ের কারণে ‘রাসেল’ নামটি তার মুখ থেকে বারবার ছুটে
যাচ্ছিল, একসময় থিতু হলে বলল, “রাসেল ভাই।”
যদি অন্য সময় হত, সাবিত্রী তার গালে কষে চড় মারত; তবে এবার তা করল না।
শীতলভাবে জবাব দিল, “আচ্ছা, বলছি। উদার, মানবতাবাদী, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সুদর্শন।
মোটের উপর এইরকম!”
“আপাতত ওকে ত্যাগ করো,” বলল রাত্রি, দুর্বল গলায়।
“কেন? কেউ কি কিছু বলেছে?” সাবিত্রী’র শিথিল ভাব কেটে গেল।
রাত্রি চারদিকে তাকাল, তারপর সতর্কতার সাথে বলল, “না, বাবা সন্দেহ করছে।”
“সন্দেহ করা আর সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়। কেউ কি তার মনে
সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছে?” সাবিত্রী ভ্রু কোঁচকাল।
“কীভাবে বলব? আমি কি শার্লক হোমস? গোয়েন্দাগিরি করি?” রাত্রি নিজের
অজান্তেই কিছুটা ধরা গলায় বলল। “বাবা সন্দেহ করছে, তাই বললাম। বলাটা কি
অন্যায়?”
নার্ভাসনেসের চাবুক সপাং করে সাবিত্রীর মনকে আঘাত করলেও সামলে নিতে তার
বেশি সময় লাগল না। ড্যামকেয়ার ভাব দেখাতে সামান্য কুণ্ঠিত হলো না সে; বলল,
“তার সন্দেহ যদি সত্য হয়, তবে কী হবে?”
“আমি ঠিক জানি না।” রাত্রি’র নির্লিপ্ত ভাব। “দিদি, তোমার কাছে তার কোনো
ছবি আছে?”
“কী করবি?” সাবিত্রী জিজ্ঞাসা করল।
“আমিও দেখতে চাই,” বলল রাত্রি, তার শরীর দুলিয়ে।
তার কুমারী শরীরের ভাঁজে ভাঁজে এমন আগ্রহ ফুটে উঠল তা দেখে সাবিত্রী মোমের
মতো গলে গেল। সে এবার তার বালিশের নিচ থেকে রাসেলের ভিউকার্ড সাইজের একটি
সাদাকালো ছবি বের করল। হয়ত অনেকদিন আগে তোলা। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চোখে
পড়ুয়া ছাত্রদের মতো গোলগোল চশমা। সিলেটের কোনো এক পাথরের টিলার উপরে
পা ছড়িয়ে বসে গুস্তাভ ফ্লোবের ‘মাদাম বোভারি’ পড়ছিল। ব্যাকগ্রাউন্ডে সূর্যাস্তের প্রকৃতি
দাঁতকপাটি দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়েছিল। রাত্রি ছবিটি ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “সুদর্শন!
ভালোছাত্রের মতো। আমার মনে হয় আমি তাকে কোথাও দেখেছি। আমার পরিচিত।”
“রাত্রি, নাবালিকার মতো আচরণ করবি না,” বলল সে, তিরস্কারের সুরে, “তুই
তাকে কখনো দেখিসনি।”
তার তিরস্কারে কাজ হলো না। সামনে এগিয়ে, রাত্রি বোকার মতো জিজ্ঞাসা করল,
“দিদি, সে কি গরু খায়? হান্টার বিফ? বিহারী কাবাব? রান রোস্ট? বিফ স্টেক? হাম
বার্গার? মীট বল? মানে, সে কি গরু-খেকো?”
তার অদ্ভুত আচরণ সাবিত্রীকে বোকামির এক নতুন অনুভূতির স্বাদ দিল। সে এটি
ইতিবাচক ভাবে উপভোগ করল এবং বলল, “অবশ্যই সে গরুর মাংস খায়; কারণ, সে
একজন খাঁটি মুসলিম।”
“ছিঃ! লজ্জা হয় না তোমার! আমি তাদের ঘৃণা করি, যারা গরুর মাংস খায়,” রাত্রি
বলল অবজ্ঞার সাথে।
“আমিও তোর মতো ওদের ঘৃণা করি, যারা গরুর মাংস খায়,” সে তাৎক্ষণিক বলল,
তার সুরে।
“তাহলে, কেন তুমি তাকে ভালোবাসো?” রাত্রি বালখিল্যতার সাথে বলল, “তুমি
নিশ্চয় জানো গরু আমাদের কাছে কী শ্রদ্ধাস্পদ প্রাণী! প্রত্যেক হিন্দু একে মা বলে
ডাকে। এটি আমাদের কাছে মায়ের মতো পবিত্র। আমরা এর দুধ পান করি। এছাড়া
শুনেছি, অনেক অসুস্থ হিন্দু সুস্থ হওয়ার প্রত্যাশায় তার প্রশ্র্রাব পান করে থাকে।”
সাবিত্রী তার খোঁপার বাঁধন খুলে দিয়ে মাথা ডাইনে-বাঁয়ে ঝাঁকিয়ে, রাত্রিকে খুশি
করতে বলল, “আমি ওকে ভালোবাসতে যাব কোন দুঃখে? সে আমার জাস্ট ফ্রেন্ড।”
এবার রাত্রি’র চোখের দিকে তাকিয়ে, “তুই তোর সব বন্ধুদের সমান চোখে দেখিস? কেউ
না কেউ তোর খুব কাছের, তাই না? রাসেল আমার কাছে সে-রকম।”
“আমি তোমাকে বার বার প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে চাই না। তবে মনে করি সে তোমার
জন্য ফিট নয়। তার সাথে তোমার খুব বেশি মাখামাখি করা উচিত নয়,” বলল রাত্রি,
অভিভাবকের মতো।
একজন অভিভাবকের মতো রাত্রি’র পরামর্শ তার কাছে মনে হলো মাছের চে’ লেজ
বড় এবং তাকে অনেকটা ক্ষিপ্ত করে তুলল। ধমক দিল তাকে, “ভ্যাজর ভ্যাজর করবি
না! ঘুমাতে যা! আজেবাজে কথা! তোর এডভোকেসির কথা শুনেছি অনেক! গরুর
মাংসের কথাই যখন হচ্ছে, শোন, হিন্দু বাদে বিশ্বের সমস্ত মানুষ গরুর মাংস খায়।”
রাত্রি তার মুখ ছোট করে সুইচ বোর্ডের দিকে গেল। সুইচটি বন্ধ করার পরে, সে
তার বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করল।
রাতে শিলাবৃষ্টি হলো।
বাড়ির পেছনে বেড়া দিয়ে ঘেরা খুব ছোট একটা বাগান ছিল। বিভিন্ন ধরনের
ফুলগাছ ছিল—যেমন চিনা গোলাপ, গার্ডেনিয়া, মেরিগোল্ড, রোডোডেনড্রন এবং টিউব
রোজ ছাড়া আরো গোলাপ। বাগানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো একপাশে একটা দোলনা।
দু’বোন মাঝেমাঝে বোরিং লাগলে সেখানে দুলত। অথবা গ্রীষ্মে, যখন ঘূর্ণি বাতাস শহরের
আনাচেকানাচে ভবঘুরের মতো ঘোরাফেরা করত অথবা যখন বাবা-মা তাদের ধমক
দিয়ে মন খারাপ করে দিতেন অথবা যখন তারা সামান্য বিষয় নিয়ে একে অপরের সাথে
ঝগড়া করত।
সাবিত্রী রোজ সকালে সেখানে ফুল সংগ্রহ করত এবং সেই ফুল দিয়ে উপাসনা
করত। সেই সকালে, বাগানের লণ্ডভণ্ড অবস্থা দেখে তার মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু তার
কিছুই করার ছিল না। লণ্ডভণ্ড বাগানের দিকে অপলক তাকিয়ে ভাবল সে, খুব শিগগিরই
এই জাতীয় শিলাবৃষ্টি আসবে বাঙালি জাতির উপরে। হঠাৎ একটা অপরিচিত দীর্ঘশ্বাস
তাকে ত্যাগ করে চলে গেল অচেনা উদ্দেশে।
তারপর ঝরাফুল কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে ফিরল সে। স্নান সেরে, শিউলি ফুলের পবিত্রতা
মনে ধারণ করে উপাসনায় বসল।
ঘরের কোণে উপাসনা করার জায়গা ছিল। সেখানে ছোট আকারের কাঠের একটা
মন্দির। তার ভেতরে রাখা ছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি, দেবী লক্ষ্মী এবং স্বরস্বতীর মূর্তি।
বিশেষ ধরনের কিছু কাপ, মোমবাতি, ধূপ এবং একটি দেয়াশলাইয়ের বাক্সও ছিল।
কিছুক্ষণ উপাসনা করে নৈবেদ্য হিসাবে ফুল দিল। যখন শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করছিল সে,
বিস্ময়করভাবে, তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল রাসেলের মায়াভরা মুখ। এরপর যেন
কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে গেল; ফলে তার প্রতি সে অনুভব করল অসম্ভব
চৌম্বকীয় টান। তার মন কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল! বাইরে যাওয়ার জন্য অস্থির
হয়ে উঠল সে।
রাত্রি’র স্কুল সকালে, আগেভাগেই চলে গিয়েছিল সে। ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট
প্রস্তুত ছিল; সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে, সেখানে ব্রেকফাস্ট খেতে বসল। কাউকে না
দেখে মাকে ডাকল। তার অবগুন্ঠিত মা, চন্দনের মালা পরিহিত, তার পেছনে আবির্ভূত
হয়ে খুকখুক করে কাশতে লাগলেন। পেছনে মুখ ঘুরিয়ে, জিজ্ঞাসা করল সে, “মা, বাবা
কোথায়?”
“ঘুমাচ্ছে। রাতে শিলাবৃষ্টি হয়েছিল তো। চারদিক কী ঘুমের আমেজ! তাই তার ঘুম
ভাঙতে দেরি হচ্ছে। কোনো কথা আছে?” মা উত্তর দিলেন এবং সেসঙ্গে প্রশ্নও জুড়িয়ে
দিলেন।
“না,” মাথা দোলাল সে, “আজ ফিরতে দেরি হতে পারে। বাবাকে বলো।”
“কেন? কোনো কাজ আছে?”
“না, তেমন কিছু না।”
“দেশের অবস্থা তেমন ভালো না। বিপদ আমাদের মতো মধ্যবিত্তের পেছন ছাড়ে
না। আমরা মানুষ সবচেয়ে আশ্চর্য জীব। কাজেই সাবধান!”
প্রাতঃরাশের পর সাবিত্রী আবার নিজের ঘরে ঢুকল। ঘর থেকে বেরোনোর আগে
শ্রীকৃষ্ণের সামনে মাথা নোয়াল এবং হাত জোড় করে প্রণাম করল। (চলবে)

আরো পড়ুন