অশুভযাত্রা পথে সাংবাদিকরা

গোলাম মওলা

by sondeshbd.com
117 views

সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পণ বলা হয়। পৃথিবীর সব সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা, দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ ও মানবাধিকার সংরক্ষণে এই সাংবাদিকতার রয়েছে সাহসী ভূমিকা। আমরা কম বেশী সবাই জানি, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতা ইথিক্যাল জার্নালিজমের বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা অনুসরণ করা হলেও বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা এখন পর্যন্ত কোনও নীতিমালা অনুসরণ করেন না। মূলত দেশজুড়ে গড়ে উঠা কয়েক লাখ সাংবাদিক তাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে সাংবাদিকতা করছেন। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, প্রত্যেকে তাদের পেশাগত নীতি ও চর্চারমান হিসেবে নিজেদের নির্ভর যোগ্যতার ভিত্তিতে সাংবাদিকতা করে চলেছেন।
শুধু ঢাকাতেই এভাবে লক্ষাধিক মানুষ সাংবাদিকতা করছেন। টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন, অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারে সাংবাদিকতার ধরণ বা ধ্যান-ধারণাও প্যাল্টে গিয়েছে। আগের দিনে যেখানে মানুষ সত্য, সুন্দর বা শান্তির অন্বেষণে ছাপাখানা কেন্দ্রিক গণমাধ্যম সাংবাদিকতায় নাম লেখাতেন, এখন এই সময়ে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতিতে স্যাটেলাইট টিভি, অনলাইন টিভি, এফএম রেডিও, কমিউনিটি ও সিটিজেন রেডিও এবং ব্যক্তিগত ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার বা অপরাপর যোগাযোগ মাধ্যমে আপামর সাংবাদিকের নামটি যখন তখন যত্রতত্রই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে দৈনিক পত্রিকা ছাড়াও সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকাত আছেই। বর্তমানে এমন আধুনিক শহুরে বা গ্রামীণ সাংবাদিকতা দেশ বা দেশের অধিবাসীদের ভেতর-গত চেতনার জায়গাটিও আমূল পালটে দিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। অবশ্য সমাজের খারাপ দিকগুলোকে ভাল করার ব্রত নিয়ে সাংবাদিকরা দিনরাত পরিশ্রম করলেও নিজেদের মধ্যেকার বিভেদ কিন্তু কমছে না। ঢাকার সাংবাদিকদের মতোই মফস্বলের সাংবাদিকরাও একাধিক গ্রুপে বিভক্ত। হয়ত এমনও উপজেলা পাওয়া যাবে, যেখানে সাংবাদিক আছেন ২০ জন, অথচ প্রেসক্লাব হয়েছে ৩ থেকে ৫টি। এরা সারাদিন এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সমালোচনা আর নিন্দা করতেই ব্যস্ত থাকেন। ৬৪ জেলার মধ্যে হয়ত এমন কোনও একটি জেলাও পাওয়া যাবে না, যেখানকার সব সাংবাদিক একই ছাতার তলে বসে সাংবাদিকতা করছেন। শুধু এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সমালোচনা করতে গড়ে তুলেছেন নানা নামের, নানা রং এর প্রেসক্লাব, সংগঠন ও সমিতি।
প্রেসক্লাব, সংগঠন বা সমিতি গড়ে তোলাকে আমি খারাপভাবে দেখছি না৷ আমি দেখছি, এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের বিষয়ে নোংরামি করছে সেইটি। আর এভাবে চলতে গিয়ে সাংবাদিকদের অনেক সময় প্রভাবশালীদের রোষানলেও পড়তে হচ্ছে। অনেক সাংবাদিককে মারা যেতেও হচ্ছে। তাদের রোষানল থেকে রেহাই পাচ্ছেনা রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি মফস্বলের সাংবাদিকেরাও। তবে লাভ লোকসানের করপোরেট গরাদে মফস্বল সাংবাদিকতা আজ খুব বেশী অবহেলিত। আমাদেরকে এই খারাপ জায়গা থেকে দ্রুত বের হয়ে আসতে হবে। ইংরেজি জার্নাল এবং ইজম নিয়ে যে জার্নালিজম বা সাংবাদিকতার উৎপত্তি; সেখানেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। বের হতে হবে মফস্বলের বিভিন্ন গ্রুপের অসুভ রাজনীতি থেকেও। আমাদের নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন ও ঐক্য রাখতে হবে। এর পাশাপাশি কেবল দৃঢ় অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংবাদিকতার মৌলিক কিছু নীতিমালাও সবাইকে মেনে চলতে হবে। সাংবাদিকতায় ঝুঁকি কমাতে হলে অন্তত ১৬টি বিষয়কে মানতেই হবে। এগুলো হলো-
(১) সব সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের যথার্থতা পরীক্ষা করা এবং অনিচ্ছাকৃত ভুল এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতার চর্চা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে কখনোই সচেতনভাবে তথ্য বিকৃতি করা যাবে না।
(২) যে কোন সংবাদের ক্ষেত্রে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দিতে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌছাতে হবে, যতটা দরকার ততটা। এর সঙ্গে জরুরী হলো – যে কোনও সংবাদ লেখার ক্ষেত্রে অধ্যবসায়ের সঙ্গে পরিশ্রম।
(৩) সংবাদ লিখতে হলে সূত্রের পরিচয় আগে সনাক্ত করতে হবে। ভুয়া সূত্র ডে কোন সময় সাংবাদিকতায় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
(৪) কোনও সূত্রকে তার পরিচয় গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে তার অভিপ্রায় যাচাই করতে হবে। তথ্যের বিনিময়ে সূত্রকে দেওয়া যে কোন প্রতিশ্রুতির শর্তগুলো স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দিতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রতিশ্রুতিও পালন করতে হবে।

(৫) খবরের শিরোনাম, টিজার, প্রমোশনাল, ছবি, ভিডিও, অডিও, গ্রাফিক্স, সাউন্ড বাইটস এবং উদ্ধৃতি যাতে বিভ্রান্তি তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো বেশী সরলীকৃত না করাই ভাল। এগুলো যাতে প্রেক্ষাপটের বাইরের কোন তথ্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে না ধরে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
(৬) ছবি ও ভিডিওর বিষয়বস্তু বিকৃত করা কখনোই উচিৎ হবে নয়।
(৭) কারিগরি স্পষ্টতার স্বার্থে ছবির এনহান্সমেন্ট হতে পারে। মন্টেজ ও ইলাস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
(৮) বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এমন রিএনাক্টমেন্ট ও স্টেজড নিউজ ইভেন্ট না করা। কোনো ঘটনা তুলে ধরতে একান্তই রিএনাক্টমেন্টের দরকার পড়লে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা।
(৯) প্রচলিত প্রত্যক্ষ পদ্ধতিতে জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য সংগ্রহ অসম্ভব হয়ে পড়ার ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন করে বা ডে কোন পরোক্ষ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা না করা। পরিচয় গোপন করে তথ্য সংগ্রহ করলে তা কাহিনীতে উল্লেখ করা।
(১০) কখনোই অনুকৃতি না করা।
(১১) কাহিনীতে মানুষের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো স্পষ্ট করা এবং সেসব মূল্যবোধ অন্যদের ওপর না চাপানো।
(১২) যদি অর্জন প্রিয়ও হয়, তারপরও মানুষের অভিজ্ঞতার বৈচিত্র‍্য ও ব্যাপ্তির বিশাল তার কাহিনী তুলে ধরা।
(১৩) জাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, নৃতত্ত্ব, বয়স, ভূগোল, প্রতিবন্ধিত্ব, শরীর ও সামাজিক মর্যাদা ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ব্যাপারে গৎবাঁধা বক্তব্য না দেওয়া।
(১৪) মতের মুক্ত বিনিময় সমর্থন করা, যদি তা মানুষের অপছন্দেরও হয়।
(১৫) যাদের কথা বলবার সুযোগ নাই, তাদের কথা বলতে দেওয়া।
(১৬) সমর্থন মূলক লেখা ও সংবাদ প্রতিবেদনের মধ্যে স্বাতন্ত্র‍্য বজায় রাখা। বিশ্লেষণ ও মন্তব্যের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা; এসবে যাতে প্রকৃত অবস্থা, তথ্য ও প্রেক্ষিতের বিকৃতি না ঘটে তা নিশ্চিত করা।
লেখক: গোলাম মওলা, সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলা ট্রিবিউন
সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, রাজশাহী বিভাগ সাংবাদিক সমিতি ঢাকা

আরো পড়ুন