তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতির এক ভিন্ন ব্যাকরণ

দেশে ফিরেই ১ম ওভারে ছয় ছক্কা

by sondeshbd.com
38 views

আলভি হায়াত রাজ

ইতিহাসে কিছু প্রত্যাবর্তন শব্দে ভারী হয়, আর কিছু প্রত্যাবর্তন নীরবতায়। কিছু ফিরে আসা হয় বিজয়ের উল্লাসে মুখর, আর কিছু ফিরে আসা মানুষের হৃদয়ের খুব গভীরে, নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা ঠিক সেই দ্বিতীয় ধারার, যেখানে উচ্চস্বরে কিছু না বলেও অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।
রাজনীতি যেখানে বহুদিন ধরে কণ্ঠের জোরে চলে, সেখানে এই প্রত্যাবর্তন যেন আচরণের ভাষায় লেখা এক দীর্ঘ কবিতা।

১ম ছক্কা-
দেশে পা রাখার আগেই তিনি জানিয়ে দিলেন, এটি কোনো একক বিজয়ের গল্প নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের শালীনতার পরীক্ষাও। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই প্রধান উপদেষ্টাকে ফোন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ-এই একটি ফোনকলেই যেন রাজনীতির বহু বছরের চেনা রুক্ষতা ভেঙে পড়ল। কৃতজ্ঞতা এখানে কেবল সৌজন্য নয়, এটি রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যেখানে ক্ষমতার পালাবদল মানেই প্রতিহিংসা, সেখানে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নিজেই এক নৈতিক অবস্থান।

২য় ছক্কা –
এরপর যা ঘটল, তা রাজনীতির মঞ্চে খুব কমই দেখা যায়। তিনি জুতা-মোজা খুলে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেন। এ কোনো পূর্বপরিকল্পিত দৃশ্যায়ন নয়, কোনো মঞ্চনির্ভর অভিনয়ও নয়। বরং এটি ছিল দীর্ঘ নির্বাসনের পর শিকড়ের কাছে ফিরে আসার এক মানবিক মুহূর্ত। যেন তিনি বলতে চাইলেন, আমি এসেছি ক্ষমতার জন্য নয়, এসেছি এই মাটির কাছে মাথা নত করতে। এই মাটি আমাকে গড়েছে, আমিও এই মাটিরই মানুষ।
এই দৃশ্য রাজনীতির ভাষায় নয়, সংস্কৃতির ভাষায় কথা বলে। যেখানে নেতৃত্ব মানে শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, বরং আগে নত হওয়া শেখা।

৩য় ছক্কা-
তারপর এল আরেকটি দৃশ্য, যা নিছক একটি সিদ্ধান্ত হলেও বহন করে গভীর গুরুত্ব। বুলেটপ্রুফ গাড়ি অপেক্ষায় ছিল, নিরাপত্তার বলয় প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তিনি তাতে উঠলেন না। উঠলেন দলের সিনিয়র নেতাদের বহন করা বাসে। এই সিদ্ধান্তে কোনো বীরত্ব দেখানোর তাগিদ ছিল না, ছিল না অহংকার। ছিল একটি বার্তা, নেতৃত্ব মানে আলাদা হয়ে থাকা নয়, নেতৃত্ব মানে সঙ্গে থাকা।
আজকের রাজনীতিতে যেখানে নেতারা মানুষের ভিড় থেকে দূরে থাকেন, নিরাপত্তার কাচের আড়ালে নিজেকে আলাদা করে নেন, সেখানে এই বাসে ওঠা যেন সেই দেয়াল ভাঙার একটি নীরব ঘোষণা।

৪র্থ ছক্কা-
চার ঘণ্টার পথচলা, কেবল সময়ের হিসাব নয়, এটি ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। বাসের সামনের সিটে বসে, একটানা হাত নাড়িয়ে, চোখে চোখ রেখে মানুষের অভিবাদন গ্রহণ, এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি ক্লান্তিহীন শ্রদ্ধা বিনিময়। এখানে নেতা ক্লান্ত হননি, মানুষও নয়। যেন দুই পক্ষই বুঝেছিল-এই মুহূর্ত কেবল দেখা হওয়ার নয়, বোঝাপড়ার।
এই চার ঘণ্টায় কোনো ভাষণ হয়নি, কোনো মাইক্রোফোন ছিল না। তবুও অনেক কিছু বলা হয়ে গেছে। কারণ রাজনীতিতে কখনো কখনো নীরব হাত নাড়ানোই সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তৃতা হয়ে ওঠে।

৫ম ছক্কা –
মঞ্চে পৌঁছে তিনি আরও একবার চেনা স্ক্রিপ্ট ভাঙলেন। তার জন্য রাখা রাজকীয় চেয়ার সরিয়ে তিনি বেছে নিলেন একটি সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ার-মূল্য মাত্র ৪৬০ টাকা। এই সংখ্যা নিয়ে কেউ কেউ তর্ক করবেন, কেউ উপহাস করবেন। কিন্তু বিষয়টি টাকার অঙ্কে নয়, মানসিকতার উচ্চতায়। যখন দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতারা পাশে বসে, তখন নিচু চেয়ারে বসে তিনি জানিয়ে দিলেন, পদমর্যাদা নয়, সম্মানই আসল।
এটি ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, ক্ষমতার সংযম।

৬য় ছক্কা-
সবশেষে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই প্রত্যাবর্তনের ভাষা। এত দীর্ঘ সময় পর দেশে ফিরে, এত সমর্থন, এত আবেগের ঢেউ-এর পরও তিনি প্রতিশোধের কথা বলেননি, শত্রু খোঁজেননি, বিভাজনের আগুন জ্বালাননি। বরং তিনি বললেন, সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার কথা। এই কথাটি শুনতে সহজ, কিন্তু বলতে সবচেয়ে কঠিন। কারণ রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হিংসা নয়, বরং সংযম।
এই সংযমই তাকে আলাদা করে।

তারুণ্যের কাছে এই প্রত্যাবর্তন একটি ভিন্ন পাঠ রেখে যায়। আজকের তরুণরা রাজনীতিকে দেখে সন্দেহের চোখে, ক্লান্তির চোখে। তারা দেখে ক্ষমতার লড়াই, দেখে অসহিষ্ণুতা, দেখে অহংকার। তারেক রহমানের এই ফিরে আসা যেন তাদের সামনে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়-রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতার খেলা, নাকি এটি মূল্যবোধের চর্চাও হতে পারে?

এই ছয়টি ‘ছক্কা’ আসলে কোনো ক্রিকেটীয় রূপক নয়; এটি ছয়টি নৈতিক অবস্থান। কৃতজ্ঞতা, শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা, সহযাত্রা, ধৈর্য, বিনয় ও সংযম, এই ছয়টি গুণই একজন রাষ্ট্রনায়কের ভিত্তি হতে পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়। একজন কলামিস্ট এর কলামের দায়িত্ব কেবল প্রশংসা নয়, প্রশ্ন তোলাও। প্রশ্ন একটাই-এই ভাষা কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? এই আচরণ কি কেবল প্রত্যাবর্তনের দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি ভবিষ্যতের রাজনীতির দিশা হয়ে উঠবে?

বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে রাজনীতির নতুন ব্যাকরণ প্রয়োজন। সেই ব্যাকরণে শব্দ কম, আচরণ বেশি; স্লোগান কম, সংযম বেশি; প্রতিহিংসা কম, দায়িত্ববোধ বেশি।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের দিনটি দেখিয়ে দিল, রাজনীতি চাইলে ভিন্নরকমও হতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই ভিন্নতাকে টিকিয়ে রাখতে পারব?
কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মনে রাখে না কে কত জোরে বলেছিল, ইতিহাস মনে রাখে-কে কতটা নীরবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছিল।
আর সেই জায়গাটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা।

আলভি হায়াত রাজ, সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যাক্তিত

আরো পড়ুন