আমাদের তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ কি আসলে কয়েকশ বছরের পুরনো এক ঐতিহাসিক স্ক্যাম? কেন আমাদের ইসলামিক একাডেমিয়া আজও উমাইয়া রাজনীতি আর ব্রিটিশ কলোনিয়াল ডিজাইনের খাঁচায় বন্দি? ২০২৬ থেকে ২০৩৮—আসন্ন ১২ বছরের এই ‘কার্মিক লুপ’ কি আমাদের বাধ্য করবে এক বড় ধরণের আধ্যাত্মিক বিপ্লবের দিকে? ইসলামের নন্দনতত্ত্ব, জ্যোতিষশাস্ত্রীয় প্রেক্ষাপট এবং আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্যরেখা নিয়ে একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্ম ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্বটি যতটা না বিশ্বাসের, তার চেয়ে বেশি কৃপ্তিম বয়ান বা ন্যারোটিভের। যদি আজ মূলধারার ইসলামিস্টরা ঘোষণা দেয় যে—আর্ট, কালচার বা নন্দনতত্ত্বের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আসলে একটি ‘স্ক্যাম’ বা ঐতিহাসিক ভুল ছিল, তবে তথাকথিত ‘ইসলামোফোবিক’ গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ন্যাকা কান্নার আর কোনো ভ্যালিড গ্রাউন্ড থাকবে না। এই ন্যারোটিভ শিফট হলে সাধারণ মানুষের জন্য ইসলামের প্রতি সাবস্ক্রিপশন বা দায়বদ্ধতা অনেক সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হতো।
কিন্তু এই কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা আমাদের বর্তমান ইসলামিক একাডেমিয়া। তারা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে যে, ইসলামের আদি ও শুদ্ধ আধ্যাত্মিক ধারায় ‘চুনা’ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছিল মূলত উমাইয়া ও মারওয়ানীয় যুগে। ক্ষমতার বৈধতা নিশ্চিত করতে তখন থেকেই একধরণের কঠোর রাজনৈতিক ফিকহী বয়ান তৈরি করা হয়, যা আব্বাসীয় আমলে গ্রিক দর্শনের অপপ্রয়োগের ফলে আরও জটিল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ক্রুসেড পরবর্তী মুসলিম বিশ্বের রক্ষণশীলতা এবং ১৮০০ সালের পর ব্রিটিশ কলোনিয়াল ডিজাইনে তৈরি হওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা মুসলমানদের সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেয়। আজকের বহুধাবিভক্ত ইসলামিস্ট গোষ্ঠী আসলে সেই ‘জায়ানিস্ট ইসলামিক ডিজাইন’ বা ঔপনিবেশিক প্রভাবে তৈরি হওয়া এক সংকীর্ণ কাঠামোর উত্তরাধিকারী মাত্র।
এই ঐতিহাসিক সংকটের সমান্তরালে আমাদের জাতীয় জীবনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে জোতিষশাস্ত্রীয় হিসাব অনুযায়ী গ্রহ-নক্ষত্রের এক গভীর সংকেত পাওয়া যায়। ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময়টি জ্যোতিষশাস্ত্রে ‘রাহু-শনির সংযোগ’ বা কার্মিক রিটার্নের কাল হিসেবে চিহ্নিত। ২০২৬ সালে শনি মীন রাশিতে প্রবেশ করে রাহুর সাথে যে সহাবস্থান তৈরি করবে, তাতে সমাজে এক প্রচণ্ড বিদ্রোহী বা বিপ্লবী এনার্জি তৈরি হবে। এটি হবে সংঘাত ও প্রচুর রক্তক্ষয়ী ত্যাগের সময়, যার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে শুদ্ধ চিন্তার উন্মেষ ঘটবে।
এরপর ২০৩০ থেকে ২০৩৭ সাল পর্যন্ত সময়টি হবে ‘শনির সাড়ে সাতি’ বা প্ল্যানেটারি পিউরিফিকেশনের কাল। এই দীর্ঘ সময় ইসলামিস্টদের প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকতে হবে, যা আসলে তাদের চিন্তার জড়তা কাটানোর এক মহাজাগতিক প্রক্রিয়া। সবশেষে ২০৩৮ সালে যখন বৃহস্পতি তার উচ্চ রাশিতে অবস্থান নিয়ে ইউরেনাসের সাথে শুভ দৃষ্টি তৈরি করবে, তখনই ঘটবে সেই আকাঙ্ক্ষিত দ্বিতীয় বিপ্লব—একটি প্রকৃত আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক রেনেসাঁ।
এই যে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ পর্যন্ত চক্র, একে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের এক অনিবার্য ‘কার্মিক লুপ’। এই লুপ থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো একটি সর্বাত্মক অ্যাকশন প্ল্যান। আমাদের মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা কারিকুলাম থেকে ব্রিটিশ আমলের ‘ডিফেন্সিভ’ মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে নন্দনতত্ত্ব ও সূক্ষ্ম দর্শন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর্ট ও কালচারকে ফতোয়ার শিকল থেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভিন্নমতকে শত্রু মনে না করে ‘ইখতিলাফ’ বা মতভেদের সৌন্দর্যকে গ্রহণ করার মনস্তত্ত্ব তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
সর্বোপরি, রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহের চেয়ে ব্যক্তিগত ‘তাযকিয়া’ বা আত্মশুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যতক্ষণ না প্রতিটি মানুষ মন থেকে কলুষমুক্ত হয়ে এই দেশের আত্মাকে শুদ্ধ করার শপথ নিচ্ছে, ততক্ষণ আমরা এই ঘাত-প্রতিঘাতের লুপে ঘুরপাক খেতেই থাকব। রাজনীতির উপরিভাগের পরিবর্তন নয়, বরং ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কারেকশনের মাধ্যমেই কেবল ২০৩৮-এর সেই আলোকোজ্জ্বল ভোরের প্রস্তুতি সফল হতে পারে।
মোঃ মেহেদী হাসান রকি
কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, রাজনীতি ও সমাজ চিন্তক এবং সাহিত্য সমালোচক

