চন্দ্রদাহ পর্ব- ৮

জিল্লু র রহমান শুভ্র

by sondeshbd.com
325 views

অল্প সময়ের মধ্যেই ঘোড়ার গাড়িটি CHATTERJEES’ HOUSE-এর সামনে এসে পৌঁছুল। ঘোড়াটি সম্ভবত অনাহারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল। মিঃ চ্যাটার্জীর কোষ্ঠবদ্ধতার সমস্যা ছিল তাই বেলের শরবত বানিয়ে জুসপাত্রে ঢালছিলেন,
হ্রেষাধ্বনি এবং খুরের খটখট আওয়াজ শুনে, আংশিক ভরানো জুসপাত্রটি টেবিলে রেখে
দ্রুত বাড়ির বাইরে এলেন।

কিচেনে, মিসেস চ্যাটার্জী রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন; তিনিও ঘোড়ার ডাক শুনতে
পেলেন এবং চুলার আগুন কমিয়ে দিয়ে স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন। একটু পরে,
রাত্রিও। সাবিত্রী’র সাথে একজন তরতাজা যুবক দেখে মি. চ্যাটার্জী’র মাথা খারাপ হয়ে
গেল। বংশপরিচয়ে যেন ঢিল না পড়ে সে ভয়ে যথাসম্ভব নিজেকে সংযত রাখলেন; গাড়ি
থেকে নামতে তাদের সাহায্য করলেন। গাড়ি থেকে নামার পরে রাসেল মি. চ্যাটার্জীকে
হিন্দু রীতিতে কদমবুসি করতে গেল, তবে এবার বংশপরিচয়কে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তিনি
তার পা সরিয়ে নিলেন। হয়ত অনুমান করতে পেরেছিলেন এই সেই ছেলে, রাত্রি যার
কথা বলেছিল।
কাউকে কদমবুসি করতে গিয়ে এই প্রথম ব্যর্থ হলো রাসেল যা তাকে মানসিকভাবে
পীড়া দিল। আগের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল সে এবং অস্বস্তিতে দাঁতে নখ কাটতে
লাগল। তার অস্বস্তিকর অবস্থা সাবিত্রী’র চোখে ধরা পড়ল নগ্নভাবে এবং সে নিজেও লজ্জা
পেল ভীষণ। তবে পরিস্থিতি ঘোলাটে না করে যথারীতি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বাবার
সাথে রাসেলের পরিচয় করিয়ে দিল।
“বাবা, এই হলো রাসেল,” বলল সে, “পুরো নাম রাসেল আহমেদ। সিলেট জোনের
মানুষ।”
মি. চ্যাটার্জী গোমড়া মুখে তার স্ত্রী’র চোখের দিকে তাকালেন এবং রাত্রি’র চোখের
দিকেও একই ভাবে। কিন্তু রাত্রি তার দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নিল। কারণ, সে বাবার গোঁড়া
মনোভাবের ধার ধারে না। পরিবর্তে, তাকে নগ্ন ইঙ্গিত দিল সে আগে থেকেই তাকে
চেনে এবং ধর্ম যাই হোক না কেন তার সাথে মেলামেশা করতে কোনো সমস্যা নেই তার।
বাড়িতে ঢোকার পরে সাবিত্রী রাসেলকে তাদের হলঘরে বসতে দিল। টেনশন
কাটছিল না তার। বুক ধুকপুক করছিল। বাবা তাকে উল্টাপাল্টা বকবে, তাতে কোনো
সন্দেহ নেই। আর যদি বাবার সামনে যেতে না হত, এমন ভাবনার দোলাচলে দুলছিল
সে। কিন্তু শেষমেষ রক্ষা হলো না। কিছুক্ষণ পরই বাবার হায়দরি হাঁক। সঙ্গে সঙ্গে
নরকের সমান অস্বস্তি এসে গ্রাস করল তাকে। বাবার সঙ্গে দেখা না করে উপায়ও ছিল না,
না গেলে আবারও ডাকবেন তিনি। অতএব ডাকাবুকো মেয়ে থেকে একেবারে লক্ষ¥ীমেয়ে
সে।
মি. চ্যাটার্জী একটি লাউঞ্জ চেয়ারে হেলান দিয়ে ছিলেন, এবং তার চোখ আধবোজা
ছিল যা অশনি সঙ্কেত হিসাবে বিবেচিত। তিনি অস্থির ভাবে পা ঝাঁকাচ্ছিলেন। মিসেস
চ্যাটার্জী দেহরক্ষীর মতো তার চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে আর রাত্রি বাবার ঠিক সামনে
একজন অনুগত সাক্ষীর মতো।
সাবিত্রী সারা ঘরে একবার চোখ বুলাল, এরপর রাত্রি’র পাশে গিয়ে বেত যে কুব্জভার
অবলম্বন করে সেভাবে কুব্জ হয়ে দাঁড়াল। গলায় কী যেন আটকাচ্ছিল, কাশতে গিয়েও
কাশল না, খুকখুক করল।
আর তাতেই মি. চ্যাটার্জী তার উপস্থিতি টের পেলেন। এবার আধবোজা চোখ
খুললেন, পা ঝাঁকানো থামালেন এবং বললেন ক্ষোভের সাথে, “তুমি আমাদের পরিবারকে
লজ্জায় ফেলে দিয়েছ! যদি এত স্থূল বুদ্ধির না হতে, কোনো মুসলিম ছেলের সাথে
বন্ধুত্ব তৈরি করতে না। এই জীবন ঠাট্টা-তামাশার নয়। তোমার ধর্মের প্রতি, পিতা
মাতার প্রতি, পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মানবোধ এবং সর্বোপরি তোমার ছোটবোনের প্রতি
দায়বদ্ধতা’র একটা জায়গা থাকা উচিত ছিল। যদি কোনো হিন্দু পাত্র একবার শুনতে
পায় কোনো মুসলিম ছেলে এই বাড়িতে বাস করত, তবে সে আর তাকে বিয়ে করতে
চাইবে না। এছাড়া, আমি মনে করি একজন মুসলমান ছদ্মবেশী শত্রু। তুমি তাদের
বিশ্বাস করতে পারো না।” সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরো যোগ করলেন, “ধার্মিকতা, সম্পদ,
আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা এবং আত্মার মুক্তি—এই চারটি মূল লক্ষ্য অর্জনের জন্য তোমাকে
নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল থাকতে হবে। বিচ্যুতি দেখা দিলে পতন অনিবার্য।”
স্বামীকে সমর্থন করে এবং তার নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস দ্বারা চালিত হয়ে, মিসেস
চ্যাটার্জী বললেন, অন্ধকার মুখে, “তাকে এখানে নিয়ে আসার কী দরকার ছিল? যদি
আমি সঠিকভাবে শুনে থাকি, সে একজন মুসলিম। আমাদের সাথে মেলামেশা করতে
পারে না। তারা অপবিত্র। এছাড়া যুদ্ধের ডামাডোলে এই কয়েকদিনেই খাবারের দামও
বেড়ে গেছে। একজনের জন্য খরচ কম না।”
“কে অপবিত্র, মা?” সাবিত্রী তার কুব্জভার অগ্রাহ্য করে এবার সোজা সটান হয়ে
দাঁড়াল। তার কণ্ঠের উপকণ্ঠে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ উঠল। “সে অপবিত্র নয়! আমাদের
মতো মানুষ। সে কুকুর বা শূকর নয়। সে ইঁদুর বা বাদুড় নয়। আমাদের মতো মাথা,
আমাদের মতো দুটি কান, আমাদের মতো দুটি চোখ, আমাদের মতো দুটি হাত,
আমাদের মতো দুটি পা, আমাদের মতো মুখ, এবং সর্বোপরি সে আমাদের মতো
হাঁটাচলা করে— খায়, পান করে, ঘুমায়। আমরা ভগবদ গীতা পড়ি, সে কুরআন পড়ে,
আর এইটাই তফাত! তবে এই দুটি ধর্মগ্রন্থ আমাদের ভাগ করতে পারে না। গীতা, কে
পবিত্র এবং কে নন, সে সম্পর্কে কোনো লেবেল লাগানোর অনুমতি দেয় না। এটি গীতার
সারাংশ নয়। আর একজন সিঙ্গেল মানুষ একটা পরিবারের উপর বোঝা হতে পারেনা।”
এবার বাবাকে উদ্দেশ্য করে, বলল সে, “কে বলেছে যে একজন মুসলমান ছদ্মবেশী
শত্রু? তোমার কথায় তিলমাত্র সত্যতা নেই। নিশ্চয়ই জানো বিভীষণ কে ছিলেন? রামের
কাছে রাবণের মৃত্যু’র গোপন রহস্য কে প্রকাশ করেছিলেন? কে রামকে বলেছিলেন যে
রাবণ তার পেটে অমরত্বের অমৃত সঞ্চার করেছেন এবং এটি শুকানো দরকার। রাম
রাবণকে হত্যা করেছিলেন কার কুমন্ত্রণায়? বিভীষণ অবশ্যই একজন মুসলমান ছিলেন
না।” দম ফুরাচ্ছিল না তার; আরো যোগ করল সে, “বাবা, তোমাকে কে বলেছে,
ধার্মিকতা, সম্পদ, আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা ও আত্মার মুক্তি—এই চারটি মূল লক্ষ্য অর্জনের
জন্য নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে অবিচল থাকতে হবে? এটি তোমার ভ্রান্ত এবং উদ্ভট ধারণা।
যদি সত্যিকারের মানুষ না হই, যদি সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন না করি, যদি মানবতা
বোধে তাড়িত না হই এবং ইতিহাস থেকে প্রকৃত শিক্ষা না নিই, জীবনের মূল চারটি লক্ষ্য
অর্জন করেই বা কী লাভ?”
সাবিত্রী’র দাঁতভাঙা জবাব কার্যকরভাবে তার বাবা-মায়ের অহঙ্কারী আস্ফালনকে
বিচূর্ণ করে একেবারে গুঁড়ো মশলা বানিয়ে দিল; তাদেরকে সহজ মানুষে পরিণত করল
এবং মঙ্গলময় বোধের দিকে তাড়িত করল।
রাত্রি মনে মনে হাসছিল দিদি কীভাবে বাবা-মায়ের থোতা মুখ ভোঁতা করছিল,
এই ভেবে। যখন দেখল, বাবা-মা একটু শান্ত, তখন সে কিছু একটা করার জন্য ছটফট
করল। ঘর থেকে চুপিসারে বেরিয়ে ডাইনিংয়ে গেল এবং বেলের শরবত নিয়ে ফিরে এল।
বাবার সামনে জুসপাত্র বাড়িয়ে ধরে, বলল সে, “বাবা, তোমার জন্য। টেবিলে রেখে
এসেছিলে।”
মি. চ্যাটার্জী শুষ্ক হাসি দিলেন এবং জুসপাত্র অমনোযোগীভাবে হাতে নিলেন।
বাবাকে জুসপাত্র দিতে পারায় মনে মনে সন্তুষ্ট সে। তার চেরি রং ঠোঁটে হাসি ফুটল।
মেয়ের হাসিতে তিনি খুশি হলেন কিনা বোঝা গেল না, তবে তিনি শরবতে চুমুক দিলেন
সশব্দে। আর তাতেই রাত্রি’র বুকে সাহস দাপুটে হয়ে উঠল। বাবার দিকে ঝুঁকে পড়ে,
বলল সে, “বাবা, ওই দাদা একা। ঢাকায় তার পরিচিত কেউ নেই। ছাত্ররা ভয়ে হল
ছেড়ে পালিয়েছে। সে আহত, এবং মৃত্যু’র কাছ থেকে ফিরে এসেছে। এখন বলো এই
অবস্থায় কোথায় যাবে সে? তাছাড়া, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। পৃথিবীতে এমন
কোনো ধর্ম নেই যা বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে বলে না। আমরা কি একটু
মানবিক হতে পারিনা?”
মি. চ্যাটার্জী’র পাথর হৃদয় অবশেষে গলল। তার মধ্যে প্রশংসনীয় পরিবর্তন লক্ষ
করা গেল। বললেন তিনি, তবে কিছুটা আপত্তির সুরে, “খুব ভালো! আমি তোমার
প্রস্তাবকে খোলা মনে স্বাগত জানাচ্ছি। যেহেতু তোমরা দু’জনেই বলছ। তবে একটি শর্তে,
সে গ্যারেটে থাকবে এবং নিচে নামতে পারবে না। আমি তার খাবার যথাসময়ে পৌঁছে
দেব যাতে কেউ তোমাদের নিয়ে বদনাম করার সুযোগ না পায়।”
এবার তিনি স্ত্রী’র দিকে তাকালেন। তার চোখের তারায় জিজ্ঞাসা, “তোমার মতামত
কী?”
মিসেস চ্যাটার্জী তার স্বামী’র সাথে তাল মেলালেন, তবে আরো শর্ত জুড়িয়ে
দিয়ে, “তোমার সাথে পুরোপুরি একমত। সে নিচে নামতে পারবে না, আমাদের রান্নার
জিনিসপত্র ছুঁতে পারবে না। মুসলমান ছেলে যদি হাঁড়িপাতিল, থালাবাসন স্পর্শ করে তবে
ওই খাবারগুলো অপবিত্র হবে এবং আমার গলায় নামবে না।”
তাদের শর্ত সহনীয় ছিল। কোনো প্রশ্ন না তুলে সাবিত্রী তা গ্রহণ করল। ফলে,
ঘরের আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হলো। বাবা-মায়ের প্রতি খুশির পাল্লাটা এতটাই ভারী
হয়ে উঠেছিল তার মন বন্যভাবে নাচতে চাইছিল; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অনুকূল নয়
বিধায় পারল না সে। পরিবর্তে, তার বাবার গালে শব্দ করে চুম্বন করল সে এবং তারপর
মায়ের গালে। তারপর তার দেহের ভাঁজে রাজহংসীর বৈপ্লবিক ঢং ফুটিয়ে তুলে দ্রুত
হলঘরে ফিরে এল। অভিভূত রাত্রি; সে-ও এল দিদির পেছনে পেছনে।
রাসেল খাপছাড়া মানুষের মতো সোফায় চুপচাপ বসেছিল এতক্ষণ, তাদের দেখে
তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল। বিনয় দেখিয়ে, বলল সে, “মনে হচ্ছে তোমাকে বিপদে ফেলেছি।”
“না, তা নয়,” বলল সাবিত্রী, তার মুখে হাসির দ্যুতি ছড়িয়ে। পরক্ষণে তার সঙ্গে
আঠার মতো লেপ্টে থাকা গোলগাল হাসিখুশির বালিকা দেখিয়ে দিয়ে, আবার বলল সে,
“এই আমার ছোট—রাত্রি। তুমি বেশ কয়েকবার ওর নাম শুনেছ।”
রাত্রি তাকে প্রণাম করল এবং বলল, “আমিও বেশ কয়েকবার দিদি’র কাছ থেকে
আপনার নাম শুনেছি।”
“নিশ্চয়ই শুনেছ যে আমি খুব পচা, তাই না?” রাসেল মজা করল।
“দিদি’র মুখে আপনার প্রশংসা ছাড়া এযাবৎ কিছুই শুনিনি,” সোজাসাপ্টা জবাব
দিল সে।
“তোমার কথা শুনে খুশি হলাম। অন্তত, আমার নামে গালিগালাজ করেনি,” রাসেল
হেসে উঠল, “বাঙালিরা জাতি হিসাবে আবেগপ্রবণ মানুষ হিসাবে বিভিন্ন দোষে দুষ্ট।
কাউকে আকাশে তুলতে যেমন সময় নেয় না তেমনি মাটিতে ধপাস করে ফেলতেও সময়
নেয় না।”
“এই তোমাকে মাটিতে ফেলতে যাব কেন? তুমি এখনো মাটিতেই আছ,” সাবিত্রীও
হাসল, “শোনো, তোমাকে এখানে রাখার জন্য, সত্যি বলতে কী, তোমার পক্ষে কঠিন
এডভোকেসি করেছে সে।”
রাত্রি লজ্জায় সঙ্কুচিত হলো। কিছু না বলে সে দিদি’র দিকে পিটপিট করে তাকাল।
সাবিত্রী এটাকে মজা হিসাবে নিয়ে আবার বলল, “একারণেই তার ধন্যবাদ প্রাপ্য।”
লাল কেল্লা আছে কিন্তু শাজাহান নেই। একদিন আগেও সাবিত্রী’র মুখ ছিল কিন্তু
সেখানে হাসি ছিল না। আসলে সে হাসতেই ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু ওই দিন, রাসেলকে
কাছে পেয়ে তার মুখে শুধু হাসিই ফুটল না, অন্যরকম অনুভূতিও তার মধ্যে জাগ্রত
হলো। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা উড়িয়ে গেল হাওয়ায়। বৈকালিক বাতাসে সর্ষে ফুলের মতো
চনমনে হয়ে তুড়ি মেরে বলল সে, “এখন যা বলব তুমি তাই শুনবে। এখানে তোমার
মতামত খাটবে না। আমি ডিক্টেটর ইয়াহিয়া খান।”
“ইয়েস ম্যাডাম, তথাস্তু!” রাসেল মাথা দোলাল, “আমার মতামতের সব অস্ত্র
তোমার কাছে জমা দিলাম।”
“চলো যাই!” সাবিত্রী বলল।
“কোথায়?”
“ছাদের উপরে আমাদের গ্যারেট।”
“গ্যারেট! আমি কি কবুতর?”
“সমস্যা কী? গ্যারেট, তবে সুন্দর! উন্মুক্ত আকাশ, অবারিত দিবালোক,
মনোমুগ্ধকর চাঁদের আলো, দখিনা বাতাস এবং স্নানের ব্যবস্থা আছে,” বলল সে, ফ্ল্যাট
বিক্রির দালালের মতো।
এই মুহূর্তে ঘরহীন চুলোহীন একজন মানুষ সে। সাবিত্রী’র প্রস্তাবে রাজি না হয়ে
তার উপায়ও ছিল না। ছড়া কেটে বলল, “দুধে-ভাতে উৎপাত, যেখানে রাত সেখানেই
কাত।”
“তুমি কোনো অসুবিধা ফিল করছ?” সাবিত্রী, যেতে যেতে, জিজ্ঞাসা করল।
ছাদে পৌঁছে রাসেল চারদিক তাকিয়ে, বলল, “বাহ, বেশ ভালো! সূর্যাস্তের পর যখন
রাত নামবে এবং আকাশ নক্ষত্ররাজিতে ভরে যাবে, তখন এই জায়গাটা—”
“তখন এই জায়গাটা কী?” সাবিত্রী উৎসুক নেত্রে তাকাল।
“বলব?” রাসেলের চোখে-মুখে দুষ্টুমি।
“বলো, আমি তো শুনতেই চাচ্ছি,” বলল সে, আন্তরিকভাবে।
“এই জায়গাটা তোমার মতো অদ্ভুত সুন্দর দেখাবে,” বলল রাসেল, একটু লজ্জা
জড়ানো কণ্ঠে।
“যাক, এত সমস্যার মধ্যেও তুমি রং-তামাশায় আছ, শুনে ভালো লাগল,” বলল
সে, হাসতে হাসতে।
গ্যারেটটি ছিল আঁটোসাঁটো। আলো ও বাতাস প্রবেশের জন্য কেবলমাত্র একটি
ভগ্নপ্রায় জানালা ছিল। মেঝেতে কার্পেট বিছানো ছিল ঠিক, তবে ধূলোবালিতে তার অবস্থা
হাঁপানি রুগির মতো সঙ্গীন। এক কোণে একটি বেতের চেয়ার অনাহারী এতিম বাচ্চার
মতো ন্যাতনেতে পড়ে ছিল; রাসেল তাতে হাত বুলিয়ে বসল। মুক্তভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে,
বলল সে, “দারুণ! আসলে এই ঘরটি কোনো শিল্পী বা কবির জন্য ফিট। নিরিবিলিতে
ছবি আঁকত কিংবা কবিতা লিখত। তাদের মনের বারান্দায় প্রজাপতি সারাক্ষণ উড়ে
বেড়াত। হা হা হা!’’
“হেসো না, সাবধানে থেকো,” বলল সাবিত্রী।
“সাবধানে! তবে কেন?” রাসেল জিজ্ঞাসা করল অবাক হয়ে।
“বাবার মুসলিম বিরোধী সেন্টিমেন্ট রয়েছে। সে কিন্তু তোমার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলবে।
সুতরাং, শালীনতা বজায় রাখবে। আমি বলতে চাইনি, তবে উপায় কী? আগেই বলা
ভালো,” বলল সে, গুরুত্ব সহকারে, এবং ট্যাগ করল, ”সে তোমার কাছ থেকে আমাদের
দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।”
“আপনিই শুধু পারবেন বাবাকে সাইজ করতে,” বলল রাত্রি।
“তোমার কেন এরকম মনে হচ্ছে?” রাসেল তির্যক চোখে তাকাল তার দিকে।
“একজন মানুষকে দেখলে তার সম্পর্কে অনেক কিছু আন্দাজ করা যায়,” বলল
রাত্রি।
“রাত্রি’র কথায় অতি উৎসাহী হয়ে এমন কিছু করো না যা হিতে বিপরীত হয়। আমি
যা বলেছি তাই মনে রেখো। জানো তো বিপদ অতিমারির মতো। কখন আসে বলা যায়
না!” সাবিত্রী আবারো তাকে সাবধান করে দিল।
তারপর সে রাত্রিকে ডেকে নিয়ে গ্যারেট থেকে বেরিয়ে গেল।
ফ্রেস হওয়ার পর রাসেল বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিল। তখন লাঞ্চ পিরিয়ড। অসহ্য খিদের
যন্ত্রণায় তার পেট হাম্বা হাম্বা করে ডাকছিল। ঠিক তখনই মি. চ্যাটার্জী পিঙ্গল বর্ণের
খাবারের ডিশ নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি এটি দরজার সামনে রেখে কুকুর
ডাকার মতো অদ্ভুত শব্দ করলেন।
রাসেল অন্যদিকে তাকিয়ে উদাস ভাবে বসে ছিল; শোনামাত্র তার উদাস ভাব
রামদৌড় দিল। মি. চ্যাটার্জী’র সদম্ভ উপস্থিতি তাকে টের পাইয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে তার
ভেতরে একটা বিধ্বংসী খিঁচুনি দিল। বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে
তাকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা আঁটল। যদিও তার পেটে তখন নেকড়ের খিদে।
আস্তে আস্তে, দরজার দিকে মুখ ঘুরাল সে। তারপর কাতর কণ্ঠে বলল, “কাকা,
আমি খুব অসুস্থ। হাঁটতে পারি না। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন।”
মি. চ্যাটার্জী ফিরে যাচ্ছিলেন, তার কাতর কণ্ঠ তাকে থামতে বাধ্য করল। তাকে
উপেক্ষা করতে পারতেন তিনি, তবে কী কারণে ফিরে এলেন। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে,
কর্কশভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী করতে পারি? তাড়াতাড়ি বলো! আমার হাতে একদম
সময় নেই!”
রাসেল তাকে ডিশটি তার কাছে এনে দিতে অনুরোধ করল। মি. চ্যাটার্জী তাই
করলেন এবং তারপর ফিরে যাচ্ছিলেন, রাসেল আবার তাকে পেছন থেকে ডাকল।
ইচ্ছাকৃতভাবে, সে একের পর এক অর্ডার করে যাচ্ছিল। অন্য কথায়, তার পর্বত-উঁচু
অহঙ্কার এবং উন্নাসিক আচরণকে ছিন্নভিন্ন করার চেষ্টা করছিল সে।
“কাকা, খেতে পারছি না। আমার ডান হাত অবশ। এক সময় বাবা আমাকে
খাওয়াতেন। আমার বাবা ছিলেন একজন সুখী-ভাবনামুক্ত-দয়ালু ব্যক্তি। আপনি অবশ্যই
তার মতো। অনুগ্রহ করে—”
মি. চ্যাটার্জী রাসেলের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন ওকে চিবিয়ে খাবেন।
একটা বাচ্চা ছেলে! কত সাহস! আমাকে নাচাতে চায়! তার অহঙ্কারের বেলুন তখনো
আকাশে উড়ছিল। মনে মনে বললেন—আমার নাম নিত্যানন্দ। এর অর্থ “চিরন্তন সুখ”।
আমি কাউকে পাত্তা দিইনা। দাসত্ব আমার রক্তে নেই। আমি নীল রক্তের উত্তরাধিকারী।
আমি আদেশ দিই, মানি না।
তার দিকে তাকিয়ে রাসেল হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, “কাকা, আপনি কিছু ভাবছেন
বোধ হয়?” তার হঠাৎ প্রশ্নে মি. চ্যাটার্জী ভেবাচেকা খেলেন। ধরা গলায় বললেন, “না,
তেমন কিছু ভাবছি না।” তার বিমূঢ় ও হাস্যকর অবস্থা দেখে রাসেল মনে মনে হাসল এবং
তাকে প্রশংসার সাগরে ভাসিয়ে দিল (পরোক্ষভাবে খোঁচা দিল), “কাকা, শুনেছি আপনি
অসম্ভব বড় মনের মানুষ, এবং মানবতাবোধে বিশ্বাসী। আপনি কাউকে ঘৃণা করেন না,
সে যাই হোক! মুসলিম বা ইতরজন! আপনার ছাত্র জীবনের গল্প শুনেছি। যখন আপনি
প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করতেন, কুমারী মেয়েদের মধ্যে তখন শোরগোল পড়ে যেত;
এবং সর্বোপরি, আপনি ছাত্রজীবন থেকে মানবহিতৈষী। অসুস্থ মানুষের মুখে খাবার তুলে
না দিয়ে আপনি নিজে কিছু খান না, তাই না? আপনি প্লুটোক্রেসি ঘৃণা করেন, গান্ধী’র
অহিংস নীতিতে বিস্বাসী এবং আর্নেস্তো চে’গুয়েভারা আপনার আইডল, তাই না? ”
“কে বলল?” ভ্রু কোঁচকালেন মি. চ্যাটার্জী।
“সাবিত্রী বা অন্য কেউ,” রাসেল কৌশলে উত্তর দিল, এবং তার কৌশলটি ছিল
অসাধারণ।
প্রথম তিনি অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যখন ভাবলেন যদি সরাসরি অস্বীকার
করেন, তবে এটি হবে আনপ্রোফেশনাল আচরণ, এবং ছেলেটি কী ভাববে? তাছাড়া তার
ইগো প্রশংসায় মোলায়েম হয়ে চিকন করে হাসছিল। বিগলিতভাবে মাথা ঝাঁকালেন তিনি,
“হ্যাঁ, তা ঠিক!”
রাসেল এবার ঝোপ বুঝে কোপ মারল। “প্লিজ আমাকে খাইয়ে দিন,” বলল সে,
নাছোড়বান্দার ভঙ্গিতে।
মি. চ্যাটার্জী ইতস্তত করলেন। রাসেল তাকে কথার মুগুর দিয়ে পেটাল—“কাকা,
আপনি কেন ইতস্তত করছেন?” বাধ্য হয়ে কিংবা বোকা হয়ে তিনি একটি চামচ তুলে
নিলেন এবং এদিক-ওদিক তাকালেন যেন কেউ দেখতে না পায়। লোকে বলে, যেখানে
রাত সেখানে বাঘের ভয়। সাবিত্রী এবং রাত্রি আবার সেখানে ফিরে এসেছিল; কারণ,
বাবার প্রতি তারা আস্থা রাখতে পারছিল না।
যখন তারা দেখল বাবা রাসেলকে তুলে খাওয়াচ্ছেন, তারা ঘরে ঢুকল না, থামল
দরজার সামনে; একে অপরের দিকে বিস্ময়ে তাকাল এবং হাসল বাবার তামাশা দেখে।
যখন মি. চ্যাটার্জী তার কাজ শেষ করলেন, রাসেল স্পেশাল ধন্যবাদ দিল তাকে,
“কাকা, মনে করি আপনি একজন মহান। তবে আপনার কাজ এখনো শেষ হয়নি।”
মি. চ্যাটার্জী অসহায়ের মতো তাকালেন।
রাসেল তার ঠোঁটে লেগে থাকা ময়লার স্তুপ দেখিয়ে দিল।
মি. চ্যাটার্জী একেবারে অগ্নিশর্মা। বারবার আদেশ করার কারণে ছেলেটাকে পিটিয়ে
ধরাশায়ী করতে মন চাইছিল তার; কিন্তু করলেন না কিংবা পারলেন না। রাগ নিয়ন্ত্রণ
করে, অবশেষে, নিজের পৈতা দিয়ে তার মুখ পরিষ্কার করলেন।
সাবিত্রী এবং রাত্রি, মোটকথা, তাদের বাবার অবিশ্বাস্য কাজ দেখে যুগপৎ আনন্দিত
এবং বিস্মিত। তারা স্থির থাকতে পারল না; অস্থিরতায় প্রতিধ্বনিত হলো। কোনো সময়
নষ্ট না করে তারা হাততালি দিতে দিতে ভেতরে ঢুকল। প্রশংসা করে, সাবিত্রী বলল,
“ধন্যবাদ বাবা, তোমাকে ধন্যবাদ!”
মেয়েদের হঠাৎ উপস্থিতিতে মুহূর্তে লজ্জার ভারে তিনি যেন কুঁজো হয়ে গেলেন।
স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললেন তিনি, “এই বালক আমাকে বাঁদর-নাচন নাচিয়েছে।
আমার শিক্ষা হয়েছে। এখন থেকে তোমরা এর খাবার পৌঁছে দেবে। আমি যাচ্ছি, তবে
দুঃখিত।”
তার চলে যাওয়ার পর সবাই একসাথে হাসল।
রাসেলের প্রশংসা করে, রাত্রি উচ্ছ্বাসের সাথে বলল, “দাদা, আপনি সত্যিই লা-লা
ল্যান্ডের অ্যাকশন হিরো। প্রতিপক্ষকে কীভাবে সাইজ করতে হয় আপনি তা ভালোই
জানেন।” তারপর হাসল সে চিত্তাকর্ষকভাবে। ঘটনাটি সাবিত্রী’র মনকেও আলোড়িত
করেছে। সে তার ছোটবোনের উচ্ছ্বাস অভিভাবক সুলভ দৃষ্টিতে উপভোগ করল বটে,
কিন্তু তা সীমারেখার ভেতর। রাসেলকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে জিজ্ঞাসা করল সে,
“এখন কেমন ফিল করছ?”
হঠাৎ জানালা বাতাসে খুলে গেল।
রাসেল জানালা’র দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করল অনেক দূর। উঁচু
দালান এবং দুর্গবৎ বাড়ির ফাঁক দিয়ে দুপুরের সূর্য, মেঘের জাদুকরী রেখা, ফুলের ছাদ
এবং বোকা পাখিদের ঝাঁক দেখল। ভালোলাগার মতো দুপুর জীবনে আরও এসেছিল,
তবে আজকের মতো নয়। তার অনুভূতি’র স্তর উপরের দিকে, “দুর্দান্ত!”
“শুধুই দুর্দান্ত?” সাবিত্রী ভ্রু কোঁচকাল।
রাসেল তার দৃষ্টি সাবিত্রী’র দিকে ফেরাল এবং আবেগমথিত হয়ে বলল, “ব্যাখ্যাতীত!
একজন কবির মতো আমি বলতে চাই, উদার আকাশ এখানে পিং-পং খেলে, কোমল
বাতাসের নদী এখানে প্রবাহিত হয়, এখানে পাখির বসন্ত উৎসব বসে, রাতের তারারা
নেমে এসে এখানে ভোজ করে। আকাশ জুড়ে তোমার মায়া। কখনো নেমে আসে বৃষ্টির
মতো, কখনো চাঁদের আলোয়। আর আমি নিজেকে হারাতে চাই সেই মায়ার ভেতর,
অবলীলায়।”
“ভগবানকে ধন্যবাদ! কী সাংঘাতিক প্রকাশভঙ্গি! মনে হচ্ছে তুমি প্রকৃতির জলজ্যান্ত
ডিকশনারি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তোমার কাছে কিছুই নয়,” সাবিত্রী বলল, হাসতে হাসতে।
রাসেলও হাসল, যেন দ্যুলোক-ভূলোক কাঁপিয়ে; এবং তারপর শান্ত ও আত্মতৃপ্তির
হাসি দিয়ে বলল সে, “আমি ওয়ার্ডসওয়ার্থের নখের যোগ্য নই। মনে করি তিনি তার
সময়ে এবং সর্বকালের প্রকৃতিপ্রেমিক কবিদের কবি। আমরা প্রকৃতির সন্তান। তাই আমরা
সবাই প্রকৃতি ভালোবাসি। তার মতো করে কে কবিতায় ‘প্রকৃতি’ তুলে ধরতে পেরেছেন?
ব্যক্তিগতভাবে আমি তার কবিতাগুলো খুব উপভোগ করি। সাহিত্যের ছাত্রী হিসাবে
তোমারও কবি হওয়া উচিত। হয়ত একদিন আমরা একজন মহিলা কবি পেয়েও যেতে
পারি। প্রেম, ভালোবাসা, মানবতা ও দ্রোহের কবি সাবিত্রী চ্যাটার্জী। হা হা হা!”
“হাসছ কেন? কবি কবিই। একজন কবি কেন পুরুষ বা মহিলা?” তাৎক্ষণিকভাবে
বিতর্ক জুড়ে দিল সে। “এছাড়া, এখনকার দিনে পুরুষতন্ত্র ও নারীত্ববাদের এই ধারণাকে
প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। নারীরা এখন সম-অধিকারের জন্য লড়াই করছে। কতকাল
আগে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা বাতিল করেছেন নারীদের সম্মান করতেন
বলেই!”
“লর্ড বেন্টিঙ্কেরই বা কী দোষ? তার অবদান অস্বীকার করলে পাপ হবে,” রাসেল
বলল, “তবে নারীত্ববাদের সুফল পেতে হলে পৃথিবীকে আরো অপেক্ষা করতে হবে।
পুরুষতন্ত্র ও নারীত্ববাদের ঠেলায় পৃথিবী যেন অশান্তিময় না হয় সে বিষয়েও আমাদের
খেয়াল রাখতে হবে।”
“নারীত্ববাদকে ভয় পাচ্ছ কেন?” সাবিত্রী বলল।
“ভয় পাচ্ছি না,” বলল রাসেল, দৃঢ়ভাবে, “ভোগবাদী পাশ্চাত্যের দিকে তাকাও।
অত্যধিক গণতান্ত্রিক চর্চা, উদারনীতি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ এবং নারীত্ববাদের নামে
স্বেচ্ছাচারিতায় পাশ্চাত্য এখন রীতিমতো ধুঁকছে। সেখানে হু হু করে ঘর ভাঙছে। তারা
ক্রমশ একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে যাচ্ছে। পুঁজিবাদের পূঁজ তারা নিংড়ে নিংড়ে খাচ্ছে।
ফলে সমকামিতা, বিবাহবহির্ভূত দৈহিক সম্পর্ক ও গর্ভপাতের মতো ধর্মীয় মূল্যবোধবিরোধী
সংস্কৃতি সম্প্রসারিত হচ্ছে। মাদকের ভয়াল থাবা, নীল ছবি এবং মানসিক বিকারগ্রস্ততা
তাদেরকে নরকের শেষপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। পুরুষ পুরুষকে এবং নারী নারীকে জীবনসঙ্গী
হিসাবে বেছে নিচ্ছে। এটা মানবজাতির জন্য অশনি সঙ্কেত।”
“এ থেকে পরিত্রাণের উপায়?” সাবিত্রী’র জিজ্ঞাসা।
“আমি ফ্যানাটিক নই। তবুও বলতে পারি একমাত্র ইসলামি অনুশাসন পৃথিবীকে
রক্ষা করতে পারে,” বলল সে, “কারণ ইসলামি অনুশাসনে ব্যভিচারিতা বা বেলেল্লাপনার
স্থান নেই। আছে অদ্ভুতভাবে নিয়ন্ত্রণ। আর এই নিয়ন্ত্রণ মানবজাতির জন্য কল্যাণময়।”
একটু গলা চড়িয়ে, “এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড টিকে আছে কেন? কারণ এর উপর ঈশ্বরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
আছে বলেই। যেদিন তিনি তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন সেদিন এই ব্রহ্মাণ্ডের পরিণাম
হবে ভয়াবহ। নিয়ন্ত্রণ হলো সকল মঙ্গলের প্রতিভূ।”
“আর হিন্দু অনুশাসন?” সাবিত্রী’র ফের জিজ্ঞাসা।
“হিন্দু অনুশাসনও খারাপ নয়। আমি বলতে চাচ্ছি এশিয়ান মূল্যবোধ। আমাদের
মূল্যবোধের কারণে আমরা পৃথিবীতে টিকে থাকব। সাদারা চলে যাবে জাদুঘরে। হাজার
বছর পর কিংবা তার আগেই তাদের জন্মহার নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়। সত্যি বলতে
কী, এ পৃথিবী একদিন শাসন করবে এশিয়ানরা। আর স্বয়ং ঈশ্বর এদের পেছনে থেকে
বাহবা দেবেন। ঈশ্বর পছন্দ করেন নিয়মের সুশৃঙ্খলতা। অনিয়মের খেসারত দিতে গিয়ে
বিশেষ করে সমকামিতার কারণে পৃথিবী থেকে অনেক জাতির বিলুপ্তি ঘটে গেছে। অবাধ
যৌনাচার ও সমকামিতার পাপে পম্পেই নগরীর জীবন্ত কবর রচিত হয়েছিল। আমাদের
কোরআন শরীফেও এরকম অনেক অধঃপতিত জাতির কথা উল্লেখ আছে।”
“শুধু কোরআন শরীফেই আছে, অন্য ধর্মে নেই?” সাবিত্রী’র কণ্ঠে একদিকে আগ্রহ
অন্যদিকে খোঁচার সুর।
“যার যা ধর্ম সেই ধর্মের প্রতি বায়াস্ট হবে, এটাই স্বাভাবিক। নষ্ট পাশ্চাত্য সমাজে
যারা চার্চ বা গির্জায় একদম যায় না, তারাও তাদের ধর্মের প্রতি ভয়ঙ্কর বায়াস্ট। যদি
তাই না হত সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে আমেরিকানরা অ্যাটম বোমা ফেলত জার্মানি কিংবা
ইটালিতে। যুদ্ধটা শুরুই করেছিল হিটলারের জার্মানি, কিন্তু তারা তা করেনি। কারণ,
তারা খৃস্টান বা ইহুদি। ফেলেছে কোথায়? জাপানে। কারণ, তারা বুদ্ধিস্ট। বুদ্ধিস্টদের
মারতে তাদের বিবেক এতটুকু কাঁপেনি। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
“কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্নকথা। জার্মানি, ইটালি মিত্রশক্তির কাছে সারেন্ডার করলেও
জাপানি সম্রাট হিরোহিতো করছিলেন না,” সাবিত্রী বলল।
“তাই বলে নিরীহ ঘুমন্ত মানুষদের উপর বোমাবর্ষণ করবে? তাই বলে হিরোসিমা
ও নাগাসাকির মতো দুটো আধুনিক শহর ধুলোয় মিশিয়ে দেবে? তাই বলে শিশুদের
পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেবে? তাই বলে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মরণব্যাধি ক্যান্সারের দিকে
ঠেলে দেবে? এটাই আমেরিকান হিউম্যান রাইটস, তাই না?” পরক্ষণে বলল, ”আসলে
আমেরিকানরা নিজেদের মনে করেন সুপিরিয়র জাতি। অন্যদের ভাবেন গিনিপিগ।”
এরপর হঠাৎ ধৈর্য় হারিয়ে ফেলল সে। বিরক্তির সুরে বলল, “দোহাই লাগে, আমাকে
এখন একা থাকতে দাও!”
“আমরা ঝামেলা করব না। এখনই যাচ্ছি, তবে আমাকে না জানিয়ে এই ঘর ছাড়বে
না,” সাবিত্রী স্পষ্ট করে বলল। তার হাতের তালু হঠাৎ চুলকাচ্ছিল। চুলকাতে চুলকাতে,
চিকিৎসকের মতো পরামর্শের সুরে বলল সে, “তোমার পুরো বিশ্রাম দরকার এবং টাইমলি
খাওয়াদাওয়া।”
তারপর রাত্রি’র কাঁধে টোকা দিল সে—“চল!”
রাসেল একা রয়ে গেল।
দিনটি দুর্দান্ত ছিল কিন্তু রাত! ভাতারছাড়ি মহিলার মতো খ্যাপা। ভয়াবহ অস্বস্তিতে পড়ল
সে। নতুন জায়গা, নতুন বিছানা। সর্বোপরি, দমবন্ধ করা ঘর। ঘুম তাকে এড়িয়ে
চলছিল ছলনাময়ী নারীর মতো। তাকে বাগে আনতে পারছিল না। অবশেষে বিছানা
থেকে উঠে স্কেট বালিশটি সুডোল করল, এবং তারপর তাতে মাথা ঠেকাল; তবুও তার
করুণা লাভে ব্যর্থ হলো। অগত্যা, আবার উঠে পড়ল সে। বালিশটি দেয়ালে উল্লম্বভাবে
রেখে তাতে হেলান দিয়ে বসল পা ছড়িয়ে। বিভিন্নচিন্তা তাকে করাত কলের মতো
কাটছিল। অতীতের একটি তুচ্ছ ঘটনা বেশি করে মনে পড়ল। প্রায় দশ বছর আগে,
মায়ের সাথে নানির বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিল সে। তাদের গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দূরে।
গ্রামটি ছিল ছোট্ট তবে চারদিক টিলা এবং চাবাগান পরিবেষ্টিত। পথিমধ্যে একটি বিশাল
আকারের ট্রাক ফাটা রাস্তায় আটকে গিয়ে বিকট শব্দে ভটভট করছিল। হয়ত রাসেলের
সাউন্ডফোবিয়া ছিল, ভটভট শব্দ তার কানে এতটাই বিরক্তকর লাগছিল, বেসামাল হয়ে
ড্রাইভারকে অশ্লীল ভাষায় গাল দিতে থাকে সে। আর তখুনি ঘটে অপ্রীতিকর ঘটনাটি।
বিশালদেহি ট্রাক ড্রাইভার তার গাল শুনতে পায়। অপমান হজম করতে না পেরে এন্টি
হিরোর মতো ট্রাক থেকে নামে। মোটাসোটা হাভানা সাইজের সিগারেট ফুঁকছিল সে,
ডলা দিয়ে আগুন নেভায়। সিগারেটের গোড়া মাটিতে ফেলে দিয়ে রাসেলকে গালি দিতে
দিতে তেড়ে আসে; তারপর পাগল ষাঁড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপর। শক্তিসামর্থে
ড্রাইভারের সমকক্ষ ছিল না বলে অনেক প্যাদানি হজম করতে হয়েছিল তাকে।
সেদিন রাসেল প্রচুর ব্যথা পেয়েছিল, অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং তীব্র ব্যথায়
রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছিল না। বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছিল এবং কাতরাচ্ছিল। মা
তার শরীরের ব্যথা কমাতে গরম পানির ছেঁকা দিয়ে সর্বাত্মক সাহায্য করছিলেন যাতে
ছেলে ঘুমাতে পারে। তবে এই রাতে, তার মায়ের মতো যত্ন নেওয়ার কেউ নেই পাশে।
তাছাড়া, তার ঘুম না এলে মা তাকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন।
কোরআন শরীফের কথা মনে পড়ায় হঠাৎ ভাবল সে আগামীকাল হলে যাবে পবিত্র
কোরআনটা আনতে, যা তার বইয়ের স্তূপের উপর আছে। সে-ও কোরআন তেলাওয়াত
করতে পছন্দ করে। পবিত্র কোরআনের কথা স্মরণ করে তার মন অলৌকিকভাবে শান্ত
হয়ে এল এবং ঘুমিয়ে পড়ল সে। (চলবে)

আরো পড়ুন