আকাশে মেঘ জমলে যেমন বৃষ্টির আভাস পাওয়া যায়, তেমনি বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাতাসে এক ধরণের ভারী অস্বস্তি দানা বেঁধেছে বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে থেকেই। এখন তা ঘনিভূত হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি কিংবা এই দল বনাম ওই দল— বিভাজনের দেয়ালগুলো যেন হঠাৎ করেই আরও উঁচু করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই দাবার বোর্ডে যারা ঘুঁটি চালছে, তারা কারা? আর যারা বলি হচ্ছে, তারাই বা কারা?
রক্ত ও কান্নায় কোনো ভিন্নতা নেই
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, প্রতিটি দাঙ্গা বা বড় সংঘাতের আগে ঠিক একইভাবে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল। যখন সাধারণ মানুষ একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাই বা প্রতিবেশীকে না দেখে কেবল ‘শত্রু’ দেখতে শুরু করে, ঠিক তখনই স্বার্থান্বেষী মহলের জয় হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, দাঙ্গার আগুনে যখন একটি বস্তি বা মহল্লা জ্বলে, তখন আগুন এটি বিচার করে না যে ঘরটি কার। ধোঁয়ায় যখন আকাশ কালো হয়, তখন সবার নিঃশ্বাসই বন্ধ হয়ে আসে।
জায়ানিস্ট এলিট বা অদৃশ্য শক্তির নীল নকশা?
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এক ধরণের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের খেলা চলে, যেখানে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে ব্যবসা করা হয়। একে বলা হয় ‘ম্যানুফ্যাকচারড ডিসেন্ট’ বা কৃত্রিম অসন্তোষ। আপনাকে বোঝানো হবে আপনার পাশের মানুষটিই আপনার অভাবের কারণ, আপনার বিপদের কারণ। অথচ আসল সত্য হলো, যখন আমরা নিজেদের মধ্যে লড়ছি, তখন ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা এলিটরা আমাদের সম্পদ আর শ্রমের ফায়দা লুটছে। আমাদের বিভক্তিই তাদের শক্তির উৎস।
যেভাবে আমরা ফাঁদে পা দিচ্ছি:
১. সোশ্যাল মিডিয়া ল্যাবরেটরি: আপনার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে আসা উসকানিমূলক ভিডিওটি হয়তো কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে কোনো এক ল্যাবে বসে বানানো হয়েছে আপনার রক্ত গরম করার জন্য।
২. গুজবের সংক্রমণ: সত্য প্রকাশ পাওয়ার আগেই গুজব সারা দেশ জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
৩. আবেগ বনাম বিবেক: আমরা আমাদের বিবেককে বন্ধক রেখে আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন সব কাজ করে ফেলি, যার মাশুল দিতে হয় আগামী প্রজন্মকে।
বাঁচার পথ কী?
বাঁচতে হলে আমাদের ‘অপ্রতিরোধ্য সাধারণ মানুষ’ হতে হবে। আমাদের হাতিয়ার হতে হবে তিনটি:
সন্দেহ করুন: যেকোনো ঘৃণা ছড়ানো সংবাদকে আগে প্রশ্ন করুন— “এটি বিশ্বাস করলে কার লাভ আর কার ক্ষতি?”
প্রতিবেশীর হাত ধরুন:মন্দিরে হামলা হলে মুসলিম ভাই পাহারা দেবেন, আর মসজিদে বিপদে হিন্দু ভাই এগিয়ে আসবেন— এই চিরায়ত বাংলার সম্প্রীতিই হতে পারে ষড়যন্ত্রকারীদের গালে সবচেয়ে বড় চড়।
অর্থনৈতিক প্রতিরোধ:বড় কর্পোরেট বা স্বার্থান্বেষী মহলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের স্থানীয় ঐক্য গড়ে তুলুন।
শেষ কথা
দিনশেষে আমরা সবাই সাধারণ মানুষ। আমাদের সবার পেটের খিদে এক, সন্তানের ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা এক। যারা আমাদের লড়াতে চায়, তারা আমাদের বন্ধু নয়। আসুন, দাবার ঘুঁটি হওয়া বন্ধ করি। দাঙ্গা নয়, সংঘাত নয়; আমাদের লড়াই হোক দারিদ্র্য, অশিক্ষা আর এই বিভেদের কারিগরদের বিরুদ্ধে।
মনে রাখবেন, আমরা যদি একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকি, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তিই আমাদের ভাঙতে পারবে না। সতর্ক থাকুন, সজাগ থাকুন। মরতে নয়, বাঁচতে শিখুন।
মোঃ মেহেদী হাসান রকি
কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, রাজনীতি ও সমাজ চিন্তক এবং সাহিত্য সমালোচক

