কাকডাকা ভোর। কেবল পাখিরা কিচিরমিচির করে ডাকতে শুরু করেছিল। বিশেষত
লেজ-নাড়ানো পাখিরা গলায় সুরের ঢেউ তুলছিল। সাবিত্রী তখনো ঘুমিয়ে। তার ঘুম
ভাঙার আগেই রাসেল ইকবাল হলে এল তার পোশাক, যাবতীয় বইপত্র এবং পবিত্র
কোরআন শরীফ সঙ্গে নিয়ে যেতে। ইকবাল হল তখন ইকবাল হল ছিল না, ছাত্রশূন্য হয়ে
ধ্কছিল। সর্বত্র খাঁ খাঁ ভাব বিরাজ করছিল। গলিত লাশের গন্ধ এবং রক্তের চিহ্ন তখনো
সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা তাকে নগ্নভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ক্রমশ বেসামাল হয়ে
পড়ছিল সে। যখন রুমে ঢুকল রুমের বিশ্রী অবস্থা তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলল।
তার মনে হচ্ছিল কয়েকজন জারজ সন্তান লুট করতে এসেছিল এখানে। তবে বিশৃঙ্খলা
করা ছাড়া তারা তেমন কিছু নেয়নি। তার castorless স্যুটকেস ঠিক জায়গায় ছিল।
কেউ এটি স্পর্শ করেনি। তবে ক্ষুধার্ত স্যুটকেস তার পেটে কিছু ভরানোর জন্য লোলুপ
দৃষ্টিতে ঘনঘন তাকাচ্ছিল। রাসেল তার নোংরা কাপড়-চোপড় দিয়ে এর খিদে মেটাল।
আর বইপত্র নিল ক্যাম্বিসের ব্যাগে। কোরআন শরীফ হাতে নিল যত্ন সহকারে। হল ছেড়ে
আসতে তার খারাপ লাগছিল, কিন্তু উপায় ছিল না। গভীর শ্বাস নিয়ে একজন পোর্টারের
সহায়তায় বেরিয়ে এল সে।
রিকশায় চড়ল। রিকশা চলতে শুরু করল।
যুদ্ধের ডামাডোলে শহর উৎকণ্ঠায় কাঁপছিল। রাস্তা ছিল প্রায় খালি। মানুষের চলাফেরা
তেমন ছিল না। যানবাহন চলছিল, তবে অন্যদিনের চাইতে তুলনামূলক কম। সর্বত্র ছিল
ভুতুড়ে ইঙ্গিত। কতকগুলো বেওয়ারিশ লাশ পড়েছিল রাস্তার পাশে। লাশগুলো সরানোর
ব্যবস্থা কেউ নেয়নি। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। ভয়ঙ্কর শকুনের ঝাঁক আকাশে উড়ছিল; তাদের
তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছিল লাশগুলোর উপর। এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ যেন নেমে এসেছিল নগরীতে।
গলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সুবিধাবাদী গুণ্ডারা। ভয়ের এক বিধ্বংসী রূপ পুরো
শহরকে গ্রাস করেছিল এবং ধীরে ধীরে এটি একটি বাসযোগ্য হীন শহরে পরিণত হচ্ছিল।
যখন সে পলাশীর মোড় ক্রস করছিল, তখন তার সাথে কোঁকড়ানো চুলের এবং
গর্বিত অভিব্যক্তির এক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের সাথে আচমকা দেখা। পাণ্ডিত্যের কচকচানিতে
অভ্যস্ত তিনি। রাসেলকে প্রায়শ ’বার্ট্রান্ড রাসেল’ বলে ডাকতেন। পরিবারের জন্য
খাবারদাবার কিনতে সেখানে চুপিচুপি এসেছিলেন।
রাসেল রিকশাঅলাকে রিকশা থামাতে বলল। রিকশা থেকে নেমে পঙ্গু মানুষের
মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে।
ঢাকায় সাম্প্রতিক যা ঘটেছে তার জন্য ভয়ে ভয়ে ছিলেন তিনি। চারদিক তাকিয়ে
ফিসফিস করে বললেন, “বার্ট্রান্ড রাসেল, যদি অক্ষত থাকতে চাও, পালিয়ে যাও!”
“স্যার, আমি অক্ষত নই। আমার গোড়ালি ইতোমধ্যে ভেঙে গেছে। আমার উপর
যুদ্ধের প্রভাব পড়ে গেছে,” রাসেল বলল, “তবে আমি আপনার সাথে একমত। ঢাকা
শহরে থাকাটাই এখন রিস্ক।”
“আমাদের কী দুর্দান্ত দিন ছিল, তাই না?” বিষণ্ন মুখে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি,
“দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই দিন কোথায় যেন হারিয়ে গেল!”
“ভাববেন না স্যার। সেই দিনগুলো আবার ফিরে আসবে,” রাসেল বলল, বিপদের
মুহূর্তে ধৈর্যশীল ব্যক্তির মতো।
“কিন্তু কবে আসবে?”
“স্যার, দিন-তারিখ দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা যায়না। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে
একটি যুদ্ধ প্রায় ১০০ বছর ধরে চলেছিল।”
“যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে প্রাণহানি তত বাড়বে।”
“বলা মুশকিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিক মিলে প্রায় পাঁচ কোটির
উপরে মানুষ নিহত হয়েছিল।”
“আমরা আর রক্তপাত চাই না। তুমি ফিরে যাও। আপাতত দেখা হচ্ছে না। আবার
হবে কিনা তা-ও জানি না।”
“হতাশ হবেন না স্যার। বিপ্লব যেখানে ঘটে বিজয় সেখানে আসেই আসে—দুদিন
আগে কিংবা পরে।”
“বাঙালিরা বর্ণশঙ্কর জাতি। এদের গৌরবের ইতিহাস খুব কম। তারা চিরদিন
পরাধীন থেকেছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠি দ্বারা শাসিত হয়েছে। ঐক্যের চাইতে
আমাদের মধ্যে ফাটল বেশি। তবুও তোমার মতো সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে রইলাম।”
তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাসেল CHATTERJEES’ HOUSE-এ ফিরে এল।
প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গেল, সাবিত্রী তার সাথে দেখা করতে এল না। মাঝারি ধরনের
টেনশনে পড়ল সে। সাবিত্রী কি রাগ করেছে? না অভিমান? ব্ল্যাক ডায়াল-এর কব্জিঘড়ি
দেখল। এগারোটা বাজতে এগারো মিনিট বাকি। সূর্যমামা ক্রমশ ক্ষেপে উঠছিল।
ধীরে ধীরে উত্তেজনা তাকে আঁচড় কাটতে লাগল। বেতাল ভাব নিয়ে নিচে নামল
সে। সিঁড়ির নিচে রাত্রি’র সঙ্গে তার দেখা হলো।
রাত্রি তাকে বিচলিত মনে করে ঠাট্টার সুরে জিজ্ঞাসা করল, “ঠিক আছেন তো
দাদা?”
“হ্যাঁ,” বলল সে, মাথা নিচু করে; তবে তার চোখ নিবিড়ভাবে খুঁজছিল কাউকে।
“দিদিকে খুঁজে পাচ্ছেন না? পাবেন, একটু মন দিয়ে খোঁজেন।” মুচকি হাসল সে।
রাসেলকে ঠোঁট কামড়াতে দেখে আবার বলল সে, ”বলতে পারি, তবে তার আগে একটা
প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।”
“আই শ্যাল ট্রাই মাই বেস্ট।” রাসেল সম্মত হলো।
“এমন একটা শহরের নাম বলুন যে নামের সঙ্গে দুটো বিস্ময় চিহ্ন আছে।”
“অঁ-হো!”
“পারলেন না! শহরটির নাম Saint-Louis-du-Ha! Ha!”
“ইন্টারেস্টিং! কোথায় অবস্থিত?”
রাত্রি ঠোঁট বাঁকাল, “তা জানি না।”
“আমিও পারিনি, তুমিও পারলে না। সমানে সমান। এখন বাতাসের মতো ফুরফুরে
মেজাজে বলো।”
রাত্রি কথা না বলে ইশারায় তাকে দিদি’র কাছাকাছি নিয়ে গেল।
সাবিত্রী দোলনায় বসেছিল আনমনে এবং তার এলোমেলো লম্বা চুল বাতাসে উড়ছিল।
হঠাৎ মনে হলো বনলতা সেন; চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশা! পেছন থেকে তার
চেহারা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল না বিধায় চুলের মাহাত্ম তাকে বিভ্রান্ত করছিল। বিভ্রান্ত
হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সে। আর রাত্রি? তার দায়িত্ব এ পর্যন্তই, এরকম মনোভাব নিয়ে,
নিঃশব্দে সেখান থেকে কেটে পড়ল সে।
কী করবে, রাসেল ভেবে পাচ্ছিল না!
নিজেকে বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করে, কাঁকড়ার মতো একটু একটু করে, সাবিত্রী’র
কাছাকাছি গেল। নিঃশব্দে তার পেছনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর গলাখাঁকারি দিল
সে। তার উপস্থিতি সাবিত্রী টের পেলেও পেছন ফিরে তাকাল না। কঠিন অভিমানে কঠিন
হয়ে ছিল। তাকে নরম করার জন্য, রাসেল কীভাবে শুরু করবে, বুঝতেও পারছিল না।
অস্থিরতার কারণে বা অসচেতনতার কারণে ভুলভাবে শুরু করল সে। হঠাৎ সাবিত্রী’র
কাঁধে হাত রাখল সে, যা তাকে অপমানের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিল।
সাবিত্রী হট মেজাজে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে দিল এবং অপ্রত্যাশিতভাবে
খেঁকিয়ে উঠল সে, “ডোন্ট টাচ মি!”
রাসেল বিস্মিত ও বোকা হয়ে গেল। তাৎক্ষণিকভাবে সে বিভ্রমে নিক্ষিপ্ত হলো;
অন্ধকার জঙ্গলে যেমন কোনো ভ্রমণকারী পথ হারায়। পথ খুঁজছিল সে। খুঁজে না পাওয়ায়
ব্রহ্মতালু মরুভূমি হয়ে উঠছিল। আবার মরুভূমিতে যেন পথ না হারায় সেজন্য সে ধৈর্য
ধরার চেষ্টা করছিল। তবে সাবিত্রী’র নীরবতায় তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়ল। মুখ গোমড়া
করে সেখান থেকে চলে আসতে বাধ্য হলো সে।
গ্যারেটে ফিরে এল ভেজা বেড়ালের মতো।
তার মন চঞ্চল ছিল। প্রকৃতপক্ষে ছটফট করছিল সে। অস্থিরতা যেন চাবুক হয়ে
চাপড়াচ্ছিল তাকে। যন্ত্রণার ভার কমাতে, জায়নামাজ বিছিয়ে পবিত্র কোরআন শরীফ
নিয়ে বসল। অতঃপর সুর করে পড়তে লাগল।
তখন দুপুর। সূর্যের উত্তাপ বাড়ছিল, এবং প্রকৃতি ছিল নিশ্চল। পবিত্র কোরআন
তেলাওয়াত করার সুর ভিন্ন মাত্রা তৈরি করছিল যা এর আগে কখনো শোনা যায়নি। এই
সময়, মি. চ্যাটার্জী, কী উদ্দেশ্যে, ছাদে এসেছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
তেলাওয়াত শুনলেন। বেজায় মনঃক্ষুণ্ন হলেন। মনে মনে বললেন, দু¹া—দু¹া! তবে
কোনো বাধা সৃষ্টি করলেন না। নিচে নামলেন গটগট করে।
সাবিত্রী মায়ের সঙ্গে কিচেনে ছিল, মি. চ্যাটার্জী’র সামনে তাকে ডেকে আনা হলো।
“তাকে এই বাড়িতে কে এনেছে?” মি. চ্যাটার্জী রাগে ফুঁসছিলেন।
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞাসা করল সে, ভেজা হাত মুছতে মুছতে।
“কী হতে বাকি আছে?” নেকড়ের মতো গর্জে উঠলেন তিনি, ”পুরোপুরি গোঁড়া
মুসলিম সে! ইতর পাকিস্তানি সৈন্যের চেয়ে কোনো অংশে কম না! গলা ফাটিয়ে তাদের
ধর্মগ্রন্থ কোরআন পড়ছে। সে ভুলে গেছে এই বাড়িটি হিন্দুর, এই অঞ্চলটি হিন্দুদের।
ইচ্ছে করে প্রতিবেশীদের ঘুম হারাম করছে।”
সাবিত্রী তৎক্ষণাৎ ছাদে এল। রাসেল তখনো পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করছিল।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করার সুরে যেমন মন্ত্রমুগ্ধতা ছিল তেমনি ছিল পারলৌকিক
শান্তির স্পর্শ। ফলে তার চড়ানো মেজাজ ঠান্ডা হতে সময় নিল না। দরজার সামনে
দাঁড়িয়ে তেলাওয়াত শোনার জন্য বাড়তি মনোযোগ দিল সে।
কিছুক্ষণ বাদে রাসেলের দৃষ্টি হঠাৎ তার দিকে ছুটে গেল। অবাক চোখে জিজ্ঞাসা
করল, “তুমি?” সাবিত্রী এবার ঘরে ঢুকল। ইতস্তত তাকিয়ে, বিনীতভাবে বলে উঠল,
“তুমি যা পাঠ করছ তার সুর খুব সুন্দর। তবে মনে রাখতে হবে এই বাড়িটি একজন
হিন্দুর। শুধু তাই নয় এই অঞ্চলটিও। প্রতিবেশীরা যদি শুনতে পান, কী হবে, তা কল্পনা
করতে পারো?”
“কী হবে?” জিজ্ঞাসা করল সে, তবে একটু ভ্যাবাচাকা।
“বলপ্রয়োগ করে তারা আমাদের একঘরা করবে,” সাবিত্রী বলল, “আমাদের তখন
কিছু করার থাকবে না।” একটু পর, উদাসভাবে আবার বলল সে, “হিন্দুদের সম্পর্কে
তোমার ধারণা কম। মুসলমানরা সকালে একে ওপরের সাথে মারামারি করবে, মাথা
ফাটাবে, রক্ত ঝরাবে, বিকেলে এসে তারা সব ভুলে যাবে। একে ওপরের কাঁধে হাত
রেখে ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু হিন্দুরা? একবার যদি সম্পর্কের অবনতি ঘটে, এই দ্বন্দ্ব চলতে
থাকে বংশ পরম্পরায়।”
“হিন্দুদের সম্পর্কে আমার ধারণা কম। আমাদের এলাকা হিন্দু প্রধান নয়। তবে
তুমি যা ভাবছ তা ততটা সহজ নয়,” মন্তব্য করল সে।
“জলের মতো সহজ,” সাবিত্রী বলল, “যেহেতু তুমি আমাদের ভগবদ গীতা পড়ছ
না।”
পবিত্র কোরআন কাপড়ে ঢাকল সে। তারপর এতে চুম্বন করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে
রাখল।
ঠিক সন্ধ্যা’র আগে আগে এসে কোরআন শরীফের গুরুত্ব হঠাৎ বেড়ে গেল।
সামরিক পোশাক পরিহিত একদল পাকিস্তানি সেনা প্রাণঘাতী অস্ত্র নিয়ে সেই এলাকায়
নজর রাখছিল। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল না এবং তাদের গতিবিধি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। মি.
চ্যাটার্জী ভীতিকর টেনশনে পড়লেন। তার দু’মেয়েই সোমত্ত হয়েছে। ভাবলেন, এই
বাড়িটার উপর থেকে শত্রুদের দৃষ্টি ফেরাতে কিছু একটা করা দরকার। বিরসবদনে
রাসেলের সঙ্গে দেখা করলেন এবং তার সাহায্য চাইলেন।
রাসেল রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “চিন্তা করবেন না! দক্ষ ঘোড়সওয়ার উত্তম
সেনাপতি হতে পারেন কিন্তু উত্তম রাজা নন। বিপদ থেকে জনগণকে যিনি উদ্ধার করতে
পারেন তিনিই উত্তম রাজা।”
“উত্তম রাজার মতোই কিছু একটা করো,” বললেন তিনি, কাতর স্বরে।
রাসেল পবিত্র কোরআন ও জায়নামাজ নিয়ে নিচে নামল। দরজার বাঁদিকে ইট
এবং সিমেন্টের তৈরি বর্গাকার ঢিবি ছিল; তার উপর জায়নামাজ বিছিয়ে ফেজ ক্যাপ
পরে সেখানে বসল এবং উচ্চস্বরে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত শুরু করল। আতঙ্কিত
প্রতিবেশী হিন্দুরা সবাই বাড়িতে ছিল। শ্মশানঘাটের নীরবতা বিরাজ করছিল চারদিকে,
তবে কেবল উদ্ধত সৈন্যদের বুটের শব্দ ছাড়া। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করার সুর
ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করছিল এবং গৃহবন্দি হিন্দুদের মনে ঘৃণার পরিবর্তে তৈরি করছিল
অলৌকিক ঘোর যা তাদের বাধ্য করছিল বাড়ির ফাঁক-ফোকর গলিয়ে পবিত্র কোরআন
তেলাওয়াত করার উৎসস্থল সম্পর্কে জানতে।
তবে তারা কেউ বাড়ির বাইরে এল না। তেলাওয়াত আরো জোরেশোরে চলল।
সৈন্যরাও খুশি হলো। তাদের মধ্যে একজন, অত্যন্ত লম্বা এবং শক্তসামর্থ, তার উচ্চতা’র
কাছে প্রত্যেক বাঙালি গড়পড়তায় বামন বলে গণ্য হবে, রাসেলের কাছে এসে জিজ্ঞাসা
করল, “তোমার নাম কি?” সে তার চিবুক সৈন্যটির বুক বরাবর না তুলে, একটু ঝুলিয়ে,
বিনীতভাবে জবাব দিল, “রাসেল আহমেদ।”
সৈনিকটি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারল না। অসন্তোষের সুরে বলল সে, “অর্ধেক খ্রিস্টান
অর্ধেক মুসলিম। ‘খান’ টাইটেল কোথায়?” যাইহোক, সে অপেক্ষারত সৈন্যদের কাছে
ফিরে এল এবং সাফাই গাইল, “এই বাড়িটি মুসলমানদের।”
তারপর তারা বাড়িটির উপর থেকে তাদের সন্দেহমূলক পাহারা সরিয়ে নিল।
খুব দ্রুতই রাসেল মি. চ্যাটার্জী’র কাছের মানুষ হয়ে গেল।
মি. চ্যাটার্জী কোনোভাবেই টেনশন মুক্ত হতে পারছিলেন না। মুখোশ পরা সময় তাকে
এবং তাদেরকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছিল। একজন সন্দেহপোষণকারী ব্যক্তির মতো
বললেন তিনি, “বিপদ ধেয়ে আসছে।”
কী রকম বিপদ, সে আলোচনায় না গিয়ে স্ত্রীকে নির্দেশ দিলেন মেয়েদের প্রস্তুত
করতে। কার সাধ্য আছে তার কথা অমান্য করার। তবুও সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কোথায় পাঠাতে চাও?”
“কেরানিগঞ্জ।” শুধু এটুকুই।
কেরানিগঞ্জ বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে অবস্থিত। এটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল। বিভিন্ন
পেশার হিন্দুরা সেখানে বাস করে—কামার, কুমার, কাটলার, তাঁতি, স্বর্ণকার, কাপড়ের
ব্যবসায়ী এবং ভূস্বামী—যাদের ফসলের গোলা ছিল। অনেক অবস্থাসম্পন্ন আত্মীয়স্বজন
ও বন্ধুবান্ধব সেখানে থাকতেন। তার এক বন্ধু যিনি ভূস্বামী এবং বাগান বাড়ির মালিক,
হঠাৎ তার নাম মনে ভাসল ।
“নিখিলেশ ব্যানার্জী। ওর বাগানবাড়িতে পাঠাতে চাই। মাত্র এক মাস আগে সেখানে
গিয়েছিলাম। সুন্দর জায়গা! সব কিছু সুশৃঙ্খল। মূল বিষয়টি সুরক্ষা, তা-ও মজবুত।
আমি তাই মনে করি। তোমার আপত্তি আছে?”
“আপত্তি থাকবে কেন? যদি জায়গাটা সেফ মনে করো তাহলে তোমার মেয়েদের
বলো এবং রাসেলের সঙ্গেও কথা বলো। ছেলেটা বুদ্ধি করে শয়তানদের তাড়িয়েছে।”
স্ত্রী’র পরামর্শ অনুসারে, তিনি রাসেল এবং মেয়েদের কাছে ডাকলেন। অভিভাবক
হিসাবে তার চোখে-মুখে আতঙ্কের ছায়া। তিনি তাদের আরো কাছাকাছি আসার জন্য
প্ররোচিত করলেন, যেন দেয়ালও শুনতে না পায়। সুবোধ বালক-বালিকার মতো তারা
তার খুব কাছাকাছি হলো যেমনটা তিনি চাচ্ছিলেন। তাদের লক্ষ করে, খুব নিচু স্বরে
বললেন তিনি, “শোনো, আমি তোমাদের যা বলব সে-ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করবে না।
সাপ ছোবল মারার আগেই পা সরিয়ে নিতে হয়। তোমাদের এক্ষুনি নদীর ওপারে যেতে
হবে।”
“কেন?” সাবিত্রী প্রশ্ন করল।
“আগেই বলেছি প্রশ্ন করা যাবে না।” অসন্তোষ প্রকাশ করলেন তিনি।
“আমরা তো গরু না। প্রশ্ন করবই। বলো নদীর ওপারে কোথায়?” রাত্রি বলল।
“কেরানিগঞ্জ,” বললেন তিনি, “ওই অঞ্চলটি নিরাপদ। আজকের রাতটা শুধু।
বুঝতে পেরেছ?”
সাবিত্রী ও রাত্রি, দু’জনই গররাজি। বিরক্তিকরভাবে তারা তাদের ঠোঁট বাঁকাচ্ছিল।
“তোমাদের নিয়ে বড় বিপদে পড়েছি,” বললেন তিনি।
“তুমি কি আমাদের ভালোবাসো না, বাবা?” মায়াভরা চোখে রাত্রি বাবার দিকে
তাকিয়ে বলল।
মি. চ্যাটার্জী মেয়ের কথায় দুর্বল হয়ে পড়লেন, কিন্তু তার চোখে সরষে ফুল।
রাসেল এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, আর যাতে সরষে ফুল দেখতে না হয় সেজন্য কাকাকে
সমর্থন করে ধমকের সুরে বলল সে, “তোমরা কেমন মেয়ে? কাকার কথার বিরোধিতা
করো। তোমাদের বকব, সে ভাষাও আমার জানা নেই। তোমরা স্টুপিড!”
রাসেলের কথা ‘সতেজ বাতাস’-এর মতো মি. চ্যাটার্জী’র মনে দোলা দিল।
যৎপরোনাস্তি খুশি হয়ে বললেন তিনি, “তোমার মতো ছেলে যে বাবার, আমি যদি তার
মতো বাবা হতে পারতাম, তাহলে এই দুটো নাদানের সঙ্গে এত কথা বলতে হত না।”
অবশেষে কেরানিগঞ্জ যেতে রাজি হলো তারা।
মি. চ্যাটার্জী তাদের দ্রুত প্রস্তুতি নিতে বললেন।
স্বামীর মতো মিসেস চ্যাটার্জীও রাসেলের প্রতি সন্তুষ্ট। এই প্রথম, হিন্দু-মুসলমানের
পার্থক্য ভুলে তিনি তার মেয়েদের সাথে খাওয়ার জন্য রাসেলকে ডাকলেন।
তারা এক সাথে খেতে বসল। কুমড়োর ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছিল তারা, মিসেস
চ্যাটার্জী হঠাৎ বললেন, “রাসেল, তোমাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই, উত্তর দেবে?”
“অবশ্যই, কেন নয়,” তৎক্ষণাৎ বলল সে, “আপনি আমার মায়ের মতো। ছেলের
কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। বলেন।”
“আমি একজন হিন্দু মহিলা। আমার রান্নাকরা খাবার খেতে তোমার অসুবিধা
হচ্ছে?” প্রশ্ন করলেন তিনি।
উত্তর দেয়ার অধিকার রাসেলের। উত্তর দিল সে, “না, একদম না।” এখানেই থেমে
না থেকে আবার বলল, “মায়েদের কোনো ধর্ম নেই, বর্ণ নেই এবং তাদের চোখে ঘৃণা
নেই। সারা বিশ্ব জুড়ে মা সর্বদা মা-ই থাকেন। বাঘ খিদে ফেলে তার নিজ বাচ্চাদের
খেয়ে ফেলে, আর বাঘিনী চেষ্টা করে তাদের রক্ষা করার। এই হলো মা। মা জাতিকে
আমি সম্মান করি।”
মায়ের প্রতি অসীম ভক্তি ও মানবতাবোধে জাগ্রত তার কথা মিসেস চ্যাটার্জীকে
আলোড়িত করল। খুব খুশি হলেন তিনি এবং তার জন্য আশীর্বাদ করলেন প্রাণখুলে।
স্ত্রীকে খুশি হতে দেখে মি. চ্যাটার্জীও খুশি হলেন এবং রাসেলকে লক্ষ করে বললেন,
“তুমি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মতো সব ধর্মের মানুষের মন জয় করতে চাও। এটা ভালো
লক্ষণ। তার একটি বিখ্যাত উক্তি: ‘নিজেকে ক্যাথলিক বানানোর মাধ্যমে আমি ব্রিটানি ও
ভ্যান্ডিতে শান্তি এনেছি, নিজেকে ইতালীয় বানানোর মাধ্যমে আমি ইতালিতে সবার মন
জয় করেছি। নিজেকে মুসলিম বানিয়ে আমি মিশরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। আমি
যদি ইহুদিদের শাসক হতাম, তবে আমি সলোমনের মন্দিরকে পুনঃপ্রষ্ঠিত করতাম।’ যদি
নিরপেক্ষভাবে বলি তিনি ক্যাথলিক খৃস্টান হয়েও ইসলাম ধর্মকে বিশেষ পছন্দ করতেন।
এক জায়গায় বলেছেন, আমি মুহাম্মদীয় ধর্মটাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। এতে অল্প
হলেও কিছু জিনিস আছে যা আমাদের ধর্মের থেকে অধিক শক্তিশালী।”
মানুষটাকে নিয়ে সাবিত্রী যে ধারণা দিয়েছিল সেখান থেকে তাকে অনেক দূর মনে
হলো রাসেলের। ইসলাম সম্পর্কে তার জ্ঞান তাকে উজ্জীবিত করল। বলতে দ্বিধা করল
না সে, “ঐতিহাসিক গিবনের মতে টুরসের যুদ্ধে যদি মুসলমানরা ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে
বিজয়লাভ করত তাহলে প্যারিস ও লন্ডনে যেখানে গির্জা রয়েছে সেখানে মসজিদ থাকত
এবং অক্সফোর্ড ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনে বাইবেলের স্থলে কোরআন তেলাওয়াত শোনা
যেত। যদি তাই হতো ভলতেয়ার সাহস করতেন না মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে
কাল্পনিক নাটক ‘মাহোমেট’ লিখতে।”
“অ্যাবসলিউটলি ইউ আর রাইট!” মি. চ্যাটার্জী মাথা ঝাঁকালেন।
ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে নেওয়ার পরে, বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে, তাদের সুখী যাত্রার জন্য
মিসেস চ্যাটার্জী হিন্দু রীতিতে কন্যাদ্বয়কে বিদায় দিলেন।
বিদায় নেবার আগে, রাত্রি তার খেলার সাথি মড়ষষরড়িম সঙ্গে নিল। মা বেশ
কয়েকবার তার কপালে চুমু দিয়ে আশীর্বাদ করলেন, “ভালো থেকো, মামণি!”
মেয়েকে ছেড়ে দিয়ে বিষণ্ন, গভীর বেদনার চোখে তাকিয়ে রইলেন তাদের দিকে।
দরজার উপরে এসেই রাত্রি হঠাৎ হোঁচট খেল, তার বাঁ পায়ের চটি খসে ছিটকে গেল।
মা দৌড়ে এসে চটি কুড়িয়ে নিয়ে অমঙ্গলের কথা ভেবে মেয়েকে টেনে নিলেন ভেতরে।
“একটু বসো মা,” চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন তিনি। কী এক গভীর শঙ্কায় ঘামছিলেন
তিনি।
মি. চ্যাটার্জী দরজার বাইরে দু’পা চলে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে ফিরে এলেন।
স্ত্রী’র মুখে তার দেরি হওয়ার কারণ শুনে, বললেন তিনি, “এসব কুসংস্কার। চল মা!”
কুসংস্কারের অণ্ডকোষ কেটে ফেলে মেয়েকে নিয়ে বেরোলেন তিনি। তারপর
অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। সড়কে এসে ভাবলেন, যানবাহনে যাওয়াটা নিরাপদ হবে
কিনা! জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এবং সাঁজোয়া যান পুরনো শহর জুড়ে টহল দিচ্ছিল, আতঙ্ক
ছড়াচ্ছিল নিরীহ মানুষদের মাঝে। শত্রুর চোখে ছাই দিতে, তাদের সকলকে সঙ্গে নিয়ে
হাঁটতে শুরু করলেন পুরনো শহরের অলিগলির অবিন্যস্ত, অবিশ্বস্ত বুক মাড়িয়ে।
একের পর এক ঘিঞ্জি গলিপথ, উদ্ভ্রান্ত মানুষের জটলা এবং আলো-ছায়ার
পারস্পরিক ক্রিয়া পেরিয়ে অবশেষে তারা বুড়িগঙ্গার তীরে পৌঁছে গেল।
নদীতে দাঁড়ের নৌকা কম ছিল। বুড়িগঙ্গার ওপারে যাওয়ার জন্য রাসেল অদ্ভুত কিন্তু
আকর্ষক পোশাক পরিহিত একজন মধ্যবয়স্ক নৌকা চালককে ডাকলেন। তারা নৌকায়
চড়ল কিন্তু সাবিত্রী উঠল না। তীরে একা একা রয়ে গেল সে। আসলে সে রাসেলের হাত
ধরার ফন্দিতে ছিল। নৌকা যখন প্রায় ঘাট ছাড়ছিল, তখন সে রাসেলের দিকে হাত
বাড়িয়ে বলল, “প্লিজ, আমার হাত ধরো! নৌকায় উঠতে সাহায্য করো।” রাসেল তার
হাত শক্ত করে ধরে নৌকায় উঠতে সাহায্য করল তাকে। মি. চ্যাটার্জী মেয়ের অদ্ভুত
আচরণে ভেতরে ভেতরে রেগে যাচ্ছিলেন, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না।
নৌকা যখন নদীর মাঝামাঝি, হাড়ভাঙা খাটুনির পর মায়ের হাতে তালপাখার
বাতাসে প্রাণ যেমন জুড়িয়ে যায় তেমনি নদীর বাতাসে তাদের প্রাণ জুড়িয়ে গেল। ভেতর
থেকে অনাবিল উচ্ছ্বাস উপচে উঠলে, রাত্রি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “বাহ! কত সুন্দর
বাতাস!”
মি. চ্যাটার্জী এবার ধৈর্য হারালেন। রাগান্বিত স্বরে বললেন, “চেঁচামেচি করো না,
বিরক্তিকর মেয়ে!”
রাত্রি’র উচ্ছ্বাস হিম জলে পরিণত হলো।
নৌকা নদী পেরিয়ে ওপারের ঘাটে ভিড়ল এবং তারা একে একে নৌকা থেকে
নামল, নামল না শুধু রাত্রি। যুবককে খুশি করার জন্য দিদি’র সাথে যেন পাল্লা দিতে
চাইছিল সে। “নিচে নামো! নামো!” সবাই ডাকছিল তাকে, কিন্তু সে অযথাই কালক্ষেপণ
করছিল। মাঝি লঘু পরিহাসের হাসি দিয়ে তাকে নামতে অনুরোধ করল। কিন্তু রাত্রি তার
জায়গায় অনড়। বাধ্য হয়ে রাসেল তার দিদির হাত যেভাবে শক্ত করে ধরেছিল, সেভাবে
ধরল। এবং তাকে নৌকা থেকে নামতে সাহায্য করল।
মি. চ্যাটার্জী’র হঠাৎ মনে পড়ল মহাভারতের খলচরিত্র শকুনির কথা। তিনি
বলেছিলেন, অরণ্যের লতা বৃক্ষের শরণ নেয়, তারপর সে-ই বৃক্ষকেই গ্রাস করে ফেলে।
রাসেল কি লতাসদৃশ? ভেতরে ভেতরে অবিশ্বাসের আগুন এতটাই জ্বলে উঠল তার হাতে
বন্দুক থাকলে মেয়েদের গুলি করে মারতেন। অসহায়ত্ব তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
তখন রাত কেবল দশটা’র মতো হবে। কিছু চতুষ্পদ প্রাণী ছাড়া লোকেরা ভয়ে
ঘরবন্দি ছিল। ভয়ঙ্কর গা ছমছম এবং অন্ধকার পরিবেশের ভেতর দিয়ে তারা হাঁটছিল।
কেরানিগঞ্জ রাসেলের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। এর আগে এখানে আসেনি সে। তারা যখন
জলকাদায় ভরা একটা অচেনা জায়গায় পৌঁছুল, রাসেল জিজ্ঞাসা করল, “কাকা, আর
কত দূর?”
কন্যাদ্বয়ের বেলেল্লাপনার কারণে তার কাকা রাগে-ক্ষোভে ফুটন্ত পানির মতো
ফুটছিলেন, শেষ পর্যন্ত ক্ষোভটা ঝাড়লেন তার উপর। দ্রুত এবং অস্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর
দিলেন—জানি না!
রাসেল তার জবাবে হতবাক। এটা কি তার অভিমান? ক্ষোভ? নাকি ঘটনাক্রমে বলে
ফেলেছেন? নাকি তিনি অন্যকিছু অনুমান করছেন? কেন তিনি এমনভাবে উত্তর দিলেন?
বুঝতে পারল সে কোথাও একটা ভুল হয়েছে বা হচ্ছে। তাকে স্বাভাবিক করতে প্রশংসার
সুরে বলল, সংক্ষিপ্তভাবে, “আপনি আমাদের পথপ্রদর্শক।”
মি. চ্যাটার্জী ক্লান্ত ছিলেন; পা টেনে টেনে হাঁটছিলেন। হঠাৎ থামলেন, চারদিক
তাকালেন কিন্তু শব্দ করলেন না। কিছুক্ষণ পর বিষণ্ন সুরে বললেন, “বাবা হলে অনেক
কিছু সহ্য করতে হয়, আমি তাই করছি।”
রাসেল তার ক্ষোভের কারণ কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারল, তবে কোনো কথা
বলল না। নীরব থাকা-ই শ্রেয় মনে করল।
অবশেষে তারা একটি asymmetric ভবনের সামনে পৌঁছুল। দরজায় নক করার পরে এটি
হাট হয়ে খুলল। একজন অনুগত গৃহকর্মী তাদের Chippendale এবং China closetসজ্জিত একটি লম্বা ড্রয়িংরুমে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর plus- foursপরিহিত বাড়ির
মালিক প্রবেশ করলেন এবং তিনি একটি বিশেষ চেয়ারে হাঁটুর উপর হাঁটু রেখে বসলেন।
তার মধ্যমায় জ্বলজ্বল করছিল নীলকান্তমণি। বিলাসিতায় গা ভাসালেও নিরামিষভোজী
এবং চেইন স্মোকার ছিলেন তিনি। অভ্যাসবশত সিগারেট ধরালেন। সিগারেটের ধোঁয়া
মাথার উপরে কুণ্ডলী পাকিয়ে বাইরে বেরুনোর পথ খুঁজছিল।
সাবিত্রী ও রাত্রি’র দিকে তাকিয়ে, নরম সুরে বললেন তিনি, “মেয়েরা, তোমরা
অস্বস্তিবোধ করছ না তো? স্মোকিং না করে আমি চলতে পারি না। তোমরা এটা অন্যভাবে
নিয়ো না।”
আপত্তি নেই বলে তারা স্মিত হাস্যে জানাল।
“থ্যাঙ্কস বোথ অফ ইউ!” তিনি হেসে আবার বললেন, “এই জিনিসটি কে আবিষ্কার
করেছে (তার হাতের সিগারেট দেখিয়ে) জানি না। তবে এটি আসলেই কাজের কাজ
করে। মাথা থেকে যে-কোনো ধরনের উদ্বেগ দূরে সরায়, তাজা করে এবং নতুন কিছু
শুরু করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এর সবচেয়ে বড় গুণটা হলো বিপদের সময় সবাই ছেড়ে
যেতে পারে, কিন্তু এটি কাউকে ছেড়ে যায় না। আগের মতোই এনার্জি ক্রিয়েট করে।’’
এবার তিনি মি. চ্যাটার্জী’র দিকে তাকালেন, “বলো, তোমার জন্য কী করতে পারি?
মেয়েদের নিয়ে হঠাৎ এলেই বা কেন?”
“মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শোনো,” মি. চ্যাটার্জী বলতে শুরু করলেন, “মেয়েরা
বাসায় নিরাপদ নয়। হানাদার বাহিনী আমাদের উপর নজর রাখছে। তাদের অদ্ভুত
আচরণে আমি আতঙ্কিত। তারা আজ রাতেই কিছু একটা করতে পারে। আমি অনুমান
করছি। তুমি যদি চেঙ্গিস খানের ইতিহাস শোনো তাহলেই বুঝবে আমি কেন আতঙ্কিত?
১২ শতকে তার দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী মানবতা ভূলুণ্ঠিত করে পৃথিবীর সমস্ত নৈতিকতা
সমাহিত করে মধ্য এশিয়ায় মুসলিমদের উপর জঘন্য গণহত্যা চালিয়েছিল। পুরুষদের
পিছমোড়া করে বেঁধে তাদের সামনেই মদের উৎসব করতে করতে তাদের মা-বোনদের
ধর্ষণ করেছিল। অতঃপর হত্যা, হত্যা এবং হত্যা। রক্তের চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল
বোখারা, সমরখন্দ। হানাদার বাহিনী তাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তারা ছিল
মুসলিম বিদ্বেষী, আর এরা চরম হিন্দু বিদ্বেষী। মেয়েরা এই সংকটময় রাতের জন্য এখানে
থাকবে। আমি আর সে (রাসেলক দেখিয়ে দিয়ে) এখনই চলে যাচ্ছি। আমরা পুরুষ,
লড়াই করে মরব।”
রক্তের অক্ষরে লেখা মর্মবিদীর্ণ ইতিহাস মি. ব্যানার্জীকে সত্যিই আহত করল।
কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না। চুপ থাকলেন। স্বাভাবিক হওয়ার পর, বললেন
তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে, “মশা উপদ্রুত এলাকা, অন্যথায় এত সমস্যা নেই। আমাদের
বাগানবাড়ি খালি। গত রাতে, কিছু অতিথি ছিল, তারা চলে গেছে। মেঝে ধোয়ামোছা
করে এখন প্রস্তুত। রাত গভীর হচ্ছে। তুমি যেতে পারো। চিন্তা করো না!”
“বাবা হিসাবে আমি উদ্বিগ্নহীন থাকতে চাই, বন্ধু! তবে কে পারে? কারণ, ভগবান
তো উভয় সংকটে।”
“কী রকম?”
“যারা উদ্বিগ্নহীন থাকতে চায় ভগবান তাদের পক্ষে যেমন আছেন যারা তোমাকে
উদ্বিগ্ন করতে চায় তাদের পক্ষেও আছেন।”
“দারুণ বলেছ তো! এ রকম দু’মুখো সাপের বিচার হওয়া উচিত।”
“কে বিচার করবে? মানুষের আদালতের রায় চ্যালেঞ্জ করা যায়, কিন্তু তার
আদালতের রায়ের চ্যালেঞ্জ কেউ করে না।”
“তা ঠিক,” মি. চ্যাটার্জী’র দিকে তাকিয়ে এবার বললেন, ”তুমি মেয়েদের সঙ্গে
থাকতে পারো। বাগানবাড়িতে অনেক রুম আছে।”
“ওদের বাবার দায়িত্বটা আজ রাতের জন্য তোমাকেই দিলাম।”
“আরে…তুমি হলে ওদের বায়োলজিক্যাল বাবা।”
“যে পুরুষ সন্তান জন্ম দেন তাকে বায়োলজিক্যাল বাবা বলা যেতে পারে, কিন্তু তাই
বলে পূর্ণাঙ্গ বাবা হওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট পরিচয় নয়। একজন পূর্ণাঙ্গ বাবার অনেক
দায়িত্ব রয়েছে। যিনি তার সন্তানের যত্ন নেবেন এবং হাতে কলমে শেখাবেন কীভাবে
সে চলবে, কীভাবে জ্ঞান অর্জন করবে, প্রবীণ ব্যক্তিকে কীভাবে সম্মান করবে, কীভাবে
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবে। এছাড়া, একাগ্রতা থাকতে
হবে। এটাই বাবার মোটামুটি সংজ্ঞা। সময় স্বল্পতার কারণে ধর্মীয় ব্যাখ্যার দিকে গেলাম
না।”
মি. ব্যানার্জী তার কথায় মুগ্ধ হলেন। সিগারেটে কষে টান দিয়ে মজা করে বললেন
তিনি, “এখন থেকে তোমার মতো ভালো বক্তা হওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব। তুমি
বিস্তর জ্ঞান রাখো।”
মি. চ্যাটার্জীও মজা করে বললেন, “আর আমিও চেষ্টা করব ধূমপান থেকে চিরতরে
বিরত থাকতে।”
মি. ব্যানার্জী হাসলেন, হা-হা-হা গৃহকর্মী তাদের জন্য চা নিয়ে এসে পরিবেশন করল। চা পান করার পর, মি.
চ্যাটার্জী তার মেয়েদের সতর্ক থাকতে বললেন এবং তারপর রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে চলে
গেলেন।
গৃহকর্মী তাদের বাগান বাড়িতে নিয়ে এল।
চারপাশ সবুজ বেষ্টন পরিবেষ্টিত একটি ছোট্ট বাগানবাড়ি—ওয়ার্ক আউট সুবিধা ছিল না,
তবে হাঁটার পথ ছিল। ছিল একটি আমগাছ, একটি পাতকুয়া এবং নড়বড়ে আস্তাবল।
যেটুকু জায়গা খালি ছিল তা দ্রুত বর্ধনশীল ঘাসে পরিপূর্ণ। আমের মুকুল ফুটেছিল। দরজা
দিয়ে ঢোকার সময় তারা টের পেয়েছিল। খই ফোটানো মুগ্ধতা ছিল উঠোন জুড়ে।
দোতলা ভবন। উপরে ওঠার জন্য ভবনের দু’পাশে দুটো কাঠের সিঁড়ি। প্রতিটি
শোবার ঘরে দুটো করে বিছানা ছিল। তারা যে-ঘরে প্রবেশ করল তা ছিল সুবিন্যস্ত এবং
সম্মোহনকর। সাদা বালিশ এবং সাদা শুজনি। বিভিন্ন বই ও ম্যাগাজিনে ঠাসা একটি
বুকশেলফ ছিল। তার গা ঘেঁষে একটি টেবিল। মদের কয়েকটি খালি বোতল এবং একটি
ছাইদানি এর উপর শোভা পাচ্ছিল। টেবিলে ব্যাকপ্যাক রেখে, সাবিত্রী একটি ফিল্ম
ম্যাগাজিন হাতে নিল এবং চোখ বুলাল। একটু পরে, এটিকে আগের জায়গায় রেখে,
কৌতূহলবশত জানালার কাছে গেল এবং পর্দা একপাশে সরাল সে।
পহেলা এপ্রিল, দিবাগত রাত। ক্রান্তদর্শী চাঁদ-তারা কয়েক রাত থেকেই লোকচক্ষু’র
অন্তরালে। রহস্যজনকভাবে জটিল অন্ধকার ঘনীকরণের দিকে হাঁটছিল। হঠাৎ তার মনে
হচ্ছিল কোনো গোপন স্থান থেকে তৃণ নয়, ভয়ের তূণ ঝাঁকে ঝাঁকে তার দিকে ছুটে
আসছে। দ্রুত পর্দা টেনে দিয়ে লম্বা শ্বাস নিল সে।
সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ দুই বোনকে অস্বস্তির বেড়াজালে আটকে ফেলছিল, বেড়াজাল
ছিন্ন করতে, তারা নিজেদের মধ্যে গল্প বলা শুরু করল।
“জানিস? আমার কিচ্ছু ভালোøাগছে না,” সাবিত্রী বলল।
“কেন?” রাত্রি জিজ্ঞাসা করল।
“এখানে রাসেল নেই,” সাবিত্রী উত্তর দিল।
“আমিও ভালো নেই,” রাত্রি বলল।
“ভালো নেই কেন?” সাবিত্রী জিজ্ঞাসা করল।
“এখানে রাসেল দাদা নেই,” রাত্রি উত্তর দিল।
“তুই কি ওকে ভালোবাসিস?” সাবিত্রী জিজ্ঞাসা করল গম্ভীরভাবে।
“হ্যাঁ, আমি ওকে ভালোবাসি,” রাত্রি জবাব দিল গম্ভীর সুরে।
এক আকস্মিক হতাশা সাবিত্রী’র মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশির করে নিচে নেমে গেল।
সে মুখ কালো করল। রাত্রি এবার তার কাছে এসে দাঁড়াল এবং তার অদ্ভুত সুন্দর চিবুক
ধরে হাসি দিয়ে বলল, “আমি ওকে ভালোবাসি, এটি সত্য; কারণ, তিনি তোমাকে
ভালোবাসেন। যিনি আমার দিদিকে ভালোবাসবেন, আমি অবশ্যই তাকে ভালোবাসব;
কারণ, আমি আমার দিদিকে খুব ভালোবাসি।”
ধোঁয়াশা কাটলে সাবিত্রী হাসল। রাত্রি’র দিকে মড়ষষরড়িম ছুঁড়ে দিয়ে বলল,
“ফাজলামি করবি না, যা!”
হঠাৎ বেতাল ঘুম হাতির শুঁড়ের মতো রাত্রিকে টানছিল। এড়ষষরড়িম সঙ্গে নিয়ে
সঙ্গে সঙ্গে ঘুমোতে গেল সে। সাবিত্রী জেগে রইল। বারান্দায় এসে ইজি চেয়ারে বসল সে।
নিঝুম, নিস্তব্ধ বাগানবাড়ি তার একাকিত্বকে উসকে দিল অতীত ভাবনার দিকে। সেই
কবে বাবা-মায়ের সঙ্গে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিল! তখন রাত্রি এত্তোটুকুন মেয়ে। তার হাত
ধরেই বালিয়াড়ির স্রোতে পা ভিজে ভিজে হাঁটছিল সে। বাবা-মা কখনো সতর্ক করছিলেন,
খুব দূরে যাবে না। ডুবে যাবে। সেই একবারই সমুদ্র দেখতে কক্সবাজার গিয়েছিল সে,
আর যাওয়া হয়নি। এখন যদি রাসেলের সঙ্গে যেতে পারতাম! ঝুম বৃষ্টির মধ্যে তার
হাত ধরে ঘুরে বেড়াতাম। সমুদ্র বিরহের যন্ত্রণায় কাতরাবে, গাঙচিলের ঝাঁক ডানা মেলে
বৃষ্টিসুখ উপভোগ করবে, এমন সময় তার হাত থেকে ছুটে গেলেই সে-ও কি বাবা-মায়ের
মতো বলবে, দূরে যাবে না! ডুবে যাবে! মুচকি হেসে আপন মনে বলল সে, আরে বাবা
ডুবলামই। তোমার জন্য ডুবতেও রাজি। পরক্ষণে রাসেলের শূন্যতা তাকে হাড়ে হাড়ে
বুঝিয়ে দিল, এসবই কল্পনা। মনটা কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল! বেদনার অন্ধকারে
ডুবে গিয়ে অন্ধকারের দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে, “রাত, তুমি
কারো কাছে শান্তির প্রপাত কারো কাছে যন্ত্রণার আগ্নেয়গিরি। রাত, তুমি কেন আসো
দুঃখের পেয়ালা হাতে? কেন ভালোবাসা নয়? যে নক্ষত্র পথ হারিয়েছে কেন আসো তার
মতো করে মৃত্যুর পেয়ালা হাতে?” (চলবে)

