শিষ্টাচারের রাজনীতি: ছোট আচরণে বড় বার্তা

আলভি হায়াত রাজ

by sondeshbd.com
7 views

রাজনীতিতে অনেক সময় বড় বড় বক্তব্য, স্লোগান কিংবা ক্ষমতার হিসাবই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। অথচ একটি সভার ভেতরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি নীরব মুহূর্ত-কথা না বলেও-নেতৃত্বের প্রকৃত চরিত্র উন্মোচিত করতে পারে। সংসদ ভবনের সামনে বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় তেমনই কিছু দৃশ্য চোখে পড়েছে, যা সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও মানবিকতার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

অনুষ্ঠান চলাকালে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সামনে আসা মুহূর্তে তারেক রহমানের আচরণ ছিল তাৎক্ষণিক, স্বাভাবিক এবং গভীর অর্থবহ। নজরে আসামাত্রই তিনি দাঁড়িয়ে সম্মান জানান-কোনো ক্যামেরার জন্য নয়, কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শনের জন্যও নয়। বরং এটি ছিল একজন সিনিয়র নেতার প্রতি দলিয় প্রধান এর ন্যায্য স্বীকৃতি। ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই সময়ের সাক্ষী, যখন বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ এবং তারেক রহমান নির্বাসিত। দেশি-বিদেশি নানা চাপে, ষড়যন্ত্রে যখন দল ভাঙনের মুখোমুখি, তখন ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও আত্মত্যাগ দিয়ে তিনি বিএনপিকে আগলে রেখেছিলেন। সেই ভূমিকার প্রতি সম্মান জানানো রাজনীতিতে কৃতজ্ঞতার এক বিরল উদাহরণ।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তারেক রহমানের বক্তব্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। নাগরিক সমাজের আয়োজনে নিজেকে সংযত রেখে তিনি স্পষ্ট করে বলেন-এখানে নাগরিকরাই কথা বলবেন। বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে, যেখানে প্রায় প্রতিটি মঞ্চ দখলের প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে এই ‘না বলা’র সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিপক্বতারই ইঙ্গিত দেয়।

এই সভায় আরেকটি দৃশ্য বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করা আবদুস সাত্তার দুলালকে হুইলচেয়ারে নিয়ে যাওয়ার সময় তারেক রহমান নিজ আসন ছেড়ে উঠে এসে নুয়ে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করেন, খোঁজখবর নেন। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সৌজন্য নয়-এটি ক্ষমতাবান একজন রাজনীতিকের পক্ষ থেকে প্রান্তিক মানুষের প্রতি সম্মানের স্পষ্ট বার্তা।

রাজনীতিকে অনেকেই কৌশল আর শক্তির খেলা হিসেবে দেখেন। কিন্তু এসব ছোট ছোট আচরণ মনে করিয়ে দেয়-রাজনীতি আসলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। শিষ্টাচার, বিনয় ও সহমর্মিতা এখানে দুর্বলতা নয়; বরং নেতৃত্বের শক্তি।
ছোটবেলায় শোনা কথাটি-মানুষ আদবকায়দা শেখে ঘর থেকে-এখানে নতুন করে অর্থ পায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির একটি বড় গুণ ছিল মানুষের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলা, সম্মান ও বিনয়ের ভাষায় কথা বলা। তারেক রহমানের আচরণে সেই উত্তরাধিকার স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ গভীরভাবে আস্থার সংকটে। এই সংকট শুধু নীতি বা নির্বাচনী ব্যবস্থার নয়, আচরণ ও ভাষারও। সেই বাস্তবতায়, ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনৈতিক শিষ্টাচারকে গুরুত্ব দেওয়ার এই উদাহরণগুলো দেখায়-রাজনীতির ভাষা বদলানো সম্ভব। আর অনেক সময় সেই পরিবর্তন শুরু হয় খুব সাধারণ, নীরব একটি আচরণ থেকেই।

আলভি হায়াত রাজ, সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব।

আরো পড়ুন